মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো এখন ইরানের হামলার ‘শিকারের লক্ষ্যবস্তুতে’ পরিণত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ। শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে মার্কিন সামরিক বিমানের ক্ষয়ক্ষতির একটি তালিকা প্রকাশ করে তিনি এ মন্তব্য করেন।
গালিবাফ লেখেন, ‘এমন এক যুগ শুরু হয়েছে, যখন আপনাদের এফ-৩৫ ও এফ-১৫ যুদ্ধবিমান শিকার করা হচ্ছে এবং ক্ষয়ক্ষতির হিসাব দিতে হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যা একসময় ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন ছিল, সেটিই এখন প্রতিদিনের বাস্তবতা।’
গালিবাফের এই বক্তব্য মূলত মার্কিন সামরিক বাহিনীর সাম্প্রতিক ক্ষয়ক্ষতিকে ঘিরে। তার প্রকাশিত তালিকায় এফ-৩৫ ও এফ-১৫ যুদ্ধবিমান, জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান, হেলিকপ্টার এবং বিভিন্ন ধরনের নজরদারি ড্রোনের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তালিকাটির সব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
জর্ডানে আট এফ-১৫ ক্ষতিগ্রস্ত
গালিবাফের মন্তব্যের পেছনে সাম্প্রতিক সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি হলো জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা।
১০ সেপ্টেম্বর সিবিএস নিউজ জানায়, ওই হামলায় প্রায় আটটি মার্কিন এফ-১৫ যুদ্ধবিমান সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে সেগুলো আবার ব্যবহারের উপযোগী করা হয়। একই হামলায় একটি এ-১০ থান্ডারবোল্ট-২ যুদ্ধবিমান গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে একটি ডানা হারায়। মার্কিন কর্মকর্তারাও পরে রয়টার্সকে এই ক্ষয়ক্ষতির তথ্য নিশ্চিত করেন।
ইরানের হামলা প্রতিহত করতে মার্কিন বাহিনী প্রায় ৩০টি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করেছিল বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছিল—এমনটি নয়। জর্ডানের সামরিক বাহিনীর দাবি, ওই দফায় ছোড়া ২০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১৮টি প্রতিহত করা হয় এবং দুটি উন্মুক্ত এলাকায় পড়ে। এরপরও কিছু হামলায় মার্কিন সামরিক বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য সামনে এসেছে।
ইরানের পাল্টা হামলার দাবি
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ইরানি জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকার আক্রান্ত হওয়ার জবাবে জর্ডানের আল-আজরাক বা মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়।
আইআরজিসির ভাষ্য অনুযায়ী, ‘ইয়া হায়দার আল-কাররার’ সংকেতনামে পরিচালিত অভিযানে এফ-৩৫, এফ-১৬ ও এফ-১৫ যুদ্ধবিমানের রক্ষণাবেক্ষণ, প্রস্তুতি ও মোতায়েনস্থল এবং বিমান আশ্রয়কেন্দ্র লক্ষ্য করা হয়েছিল। তবে ওই হামলায় ইরান যে মাত্রার ক্ষয়ক্ষতির দাবি করেছে, তার সবটাই স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
শুধু জর্ডান নয়, ক্ষয়ক্ষতি আরও বিস্তৃত
সম্প্রতি প্রকাশিত মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের মহাপরিদর্শকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের প্রথম কয়েক মাসেই মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানি হামলায় কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরাক, ওমান ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটির শত শত ভবন ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। কয়েক ডজন সামরিক বিমানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে চারটি এফ-১৫ই এবং ইরানের ওপর অভিযান চালানোর সময় শত্রুপক্ষের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি এফ-৩৫এ যুদ্ধবিমানের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ৩০টি পর্যন্ত এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন এবং সাতটি কেসি-১৩৫ জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান হারানো বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্যও মার্কিন সরকারি পর্যালোচনায় উঠে এসেছে।
আকাশ প্রতিরক্ষা মজুতেও চাপ
ইরানের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকাতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট ও থাডের মতো ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টরের মজুতেও চাপ তৈরি হয়েছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু সাম্প্রতিক কয়েকটি হামলা ঠেকাতেই কয়েক ডজন প্যাট্রিয়ট এবং একাধিক থাড ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করা হয়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় এসব অস্ত্র দ্রুত পুনরায় উৎপাদন ও মজুত করার সক্ষমতা নিয়েও মার্কিন সামরিক মহলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
পেন্টাগনের মহাপরিদর্শকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও উন্নত গোলাবারুদের ‘কৌশলগত ঘাটতি’ তৈরি হওয়ার কথা স্বীকার করা হয়েছে। ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত অভিযানে শুধু গোলাবারুদের পেছনেই যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে ২২ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
গালিবাফের বক্তব্য তাই মূলত এই ক্ষয়ক্ষতি ও অস্ত্রের মজুতে চাপকে ইরানের সামরিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরার প্রচেষ্টা। তবে তার প্রকাশিত সব ক্ষয়ক্ষতির দাবি মার্কিন সরকারি তথ্য দিয়ে নিশ্চিত করা যায়নি।
তবে এটুকু স্পষ্ট যে, ইরান যুদ্ধের সাত মাসের মাথায় মার্কিন বিমান, ঘাঁটি ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ আগের তুলনায় দৃশ্যমান হয়েছে। আর সেই বাস্তবতাকেই রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে ব্যবহার করছেন তেহরানের শীর্ষ নেতারা।

