রাশিয়ার সংসদীয় নির্বাচনের শেষ দিনে রাজধানী মস্কো ও আশপাশের অঞ্চলে বড় ধরনের ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় অন্তত দুজন নিহত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মস্কোর একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল শোধনাগার ও আবাসিক ভবন। একই রাতে ইউক্রেনের কিয়েভ অঞ্চলে রুশ ড্রোন হামলায় তিন শিশুসহ চারজন নিহত হয়েছেন। সূত্র: আল-জাজিরা
মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিন রোববার দাবি করেন, শনিবার থেকে বিভিন্ন প্রতিরক্ষা স্তরে ১ হাজার ৬০০টির বেশি ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৫০টি মস্কোর দিকে আসছিল। তিনি এটিকে রাজধানীর ওপর এ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ড্রোন হামলা হিসেবে বর্ণনা করেন।
তবে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পৃথক হিসাবে দেশজুড়ে ১ হাজার ১১০টি ইউক্রেনীয় ড্রোন প্রতিহত করার কথা বলা হয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দুই পক্ষের দেওয়া এসব সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
তেল শোধনাগারে আঘাত
সোবিয়ানিন জানিয়েছেন, কয়েকটি ড্রোন মস্কো তেল শোধনাগারের এলাকায় পৌঁছায় এবং সেখানকার একটি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘটনাস্থল থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখেছেন রয়টার্সের প্রত্যক্ষদর্শীরাও। শোধনাগারটি এর আগেও ইউক্রেনীয় হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি পরে দূরপাল্লার হামলার প্রশংসা করে বলেন, রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ তেল শিল্প ও সামরিক রসদ অবকাঠামোতে আঘাত হানা হয়েছে। তার দাবি, এসব স্থাপনা রাশিয়ার যুদ্ধ পরিচালনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্থ ও সরবরাহ জোগায়।
ইউক্রেন কয়েক মাস ধরে রাশিয়ার তেল শোধনাগার, তেল ডিপো ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে দূরপাল্লার হামলা বাড়িয়েছে। কিয়েভের যুক্তি, জ্বালানি রপ্তানি থেকে পাওয়া রাজস্ব মস্কোর যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়তা করছে।
আবাসিক ভবনে হামলা, ৪০০ মানুষ সরিয়ে নেওয়া
মস্কো অঞ্চলের গভর্নর আন্দ্রেই ভোরোবিওভ জানিয়েছেন, পৃথক দুটি ঘটনায় ৪৪ বছর বয়সী এক নারী এবং একজন বয়স্ক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন।
রামেনস্কি এলাকায় একটি ২১ তলা আবাসিক ভবনে ড্রোনের আঘাত বা ধ্বংসাবশেষ থেকে আগুন লাগার পর প্রায় ৪০০ বাসিন্দাকে সরিয়ে নেওয়া হয়। আর সোফিয়িনো এলাকায় একটি তিনতলা ভবনে হামলায় একজন নিহত ও কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে রুশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
রুশ কর্তৃপক্ষের হিসাবে মস্কো অঞ্চলে আহতের সংখ্যাও একাধিক। এপি জানিয়েছে, বৃহত্তর মস্কো এলাকায় অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন।
নির্বাচন ব্যাহত করার চেষ্টা বলে অভিযোগ মস্কোর
তিন দিনব্যাপী রাশিয়ার সংসদীয় নির্বাচনের শেষ দিনেই বড় হামলাটি হয়েছে।
সোবিয়ানিন অভিযোগ করেন, ‘নজিরবিহীন’ এই হামলার উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচন ব্যাহত করা। তিনি দাবি করেন, সেই লক্ষ্য সফল হয়নি। ইউক্রেন এই অভিযোগ নিয়ে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
রাশিয়ার এবারের নির্বাচন ২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম স্টেট ডুমা নির্বাচন। ৪৫০ আসনের নিম্নকক্ষের জন্য ভোট হচ্ছে। ক্ষমতাসীন ইউনাইটেড রাশিয়া গত নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেয়েছিল এবং এবারও সংসদে প্রভাব ধরে রাখবে বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
রাশিয়ার নির্বাচন কমিশন আরও দাবি করেছে, রুশ-অধিকৃত খেরসন অঞ্চলে একটি বাসে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় একজন নির্বাচন কর্মকর্তাসহ দুজন নিহত হয়েছেন। এই দাবিটিও স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
কিয়েভে পাল্টা রুশ হামলা, নিহত তিন শিশু
মস্কোয় হামলার একই রাতে রাশিয়াও ইউক্রেনজুড়ে বড় ধরনের ড্রোন হামলা চালায়।
ইউক্রেনের বিমানবাহিনী জানিয়েছে, রাতভর ১৩৮টি শাহেদ, গেরবেরা ও বিভ্রান্তিমূলক ড্রোন নিক্ষেপ করা হয়। এর প্রায় অর্ধেক ছিল জেটচালিত। ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর দাবি, এর মধ্যে ১০১টি ড্রোন ভূপাতিত বা ইলেকট্রনিক ব্যবস্থায় নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। ১৭টি স্থানে সরাসরি আঘাত এবং আরও পাঁচটি স্থানে ধ্বংসাবশেষ পড়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে কিয়েভ অঞ্চলে।
ইউক্রেনের জরুরি পরিষেবা জানিয়েছে, একটি বাড়িতে রুশ ড্রোন আঘাত হানলে এক মা ও তার তিন বছর বয়সী যমজ দুই শিশু নিহত হন। অন্য একটি জেলায় আহত এক কন্যাশিশু হাসপাতালে মারা যায়। ফলে ওই অঞ্চলে নিহতের সংখ্যা বেড়ে চারজন হয়, যাদের তিনজনই শিশু।
কিয়েভ অঞ্চলের গভর্নর তিমুর তাকাচেঙ্কো জানিয়েছেন, এক দিনের বেশি সময় ধরে চলা হামলায় পাঁচ জেলার ৩১টি স্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ফাস্তিভ এলাকায়; সেখানে বাড়িঘর, শিল্প ও পরিষেবা স্থাপনা, কৃষি প্রতিষ্ঠানের জমি এবং যানবাহনসহ ২৪টি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দূরপাল্লার ড্রোনযুদ্ধে নতুন মাত্রা
রাশিয়া ও ইউক্রেন- দুই পক্ষই এখন একে অপরের ভূখণ্ডের গভীরে ড্রোন হামলা বাড়িয়েছে।
ইউক্রেন মূলত রাশিয়ার তেল শোধনাগার, সামরিক উৎপাদন কেন্দ্র ও রসদ অবকাঠামো লক্ষ্য করছে। অন্যদিকে রাশিয়া ইউক্রেনের শহর, বিদ্যুৎব্যবস্থা, শিল্প ও পরিবহন অবকাঠামোয় নিয়মিত বড় ধরনের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে।
মস্কোয় সর্বশেষ হামলা দেখিয়েছে, ইউক্রেনের দূরপাল্লার ড্রোন এখন রাশিয়ার রাজধানী ও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনাতেও বড় আকারে পৌঁছাতে সক্ষম হচ্ছে। একই সময়ে কিয়েভ অঞ্চলে তিন শিশুসহ চারজনের মৃত্যু আবারও দেখিয়েছে, পাল্টাপাল্টি দূরপাল্লার হামলার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে বেসামরিক মানুষকে।

