চীনের নাগরিকদের বিদেশ ভ্রমণ ও দেশত্যাগের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করার সুযোগ রেখে নতুন একটি বিধিমালা কার্যকর করেছে বেইজিং। একই সঙ্গে বিদেশিদের ভিসা, প্রবেশ এবং অভিবাসনসংক্রান্ত নথির ওপরও নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো হয়েছে।
চীনের স্টেট কাউন্সিলের ১৯টি ধারাসংবলিত ‘রেগুলেশনস অব দ্য স্টেট কাউন্সিল অন এক্সিট অ্যান্ড এন্ট্রি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’, ডিক্রি নম্বর ৮৪১, গত ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে। বিধিমালাটি ২৯ জুন স্টেট কাউন্সিলের নির্বাহী বৈঠকে অনুমোদিত হয় এবং জুলাইয়ে প্রকাশ করা হয়। বেইজিং বলছে, এর উদ্দেশ্য দেশত্যাগ ও প্রবেশ ব্যবস্থাপনা নিয়মতান্ত্রিক করা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বৈধ অধিকার রক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও উন্নয়নস্বার্থ সুরক্ষিত রাখা।
তবে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বা এইচআরডব্লিউ বলছে, নতুন বিধিমালার কিছু ভাষা এতটাই বিস্তৃত যে তা নাগরিক ও বিদেশিদের চলাচলের স্বাধীনতার ওপর নির্বিচার নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। সংস্থাটির মতে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো দেশ ত্যাগের অধিকারের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করতে হলে তা অবশ্যই বৈধ উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক হতে হবে।
‘উচ্চঝুঁকির’ দেশে যেতে নিরুৎসাহিত করতে পারবে কর্তৃপক্ষ
বিধিমালার ২ নম্বর ধারায় চীনা নাগরিকদের বিদেশ ভ্রমণসংক্রান্ত নিরাপত্তাঝুঁকি মোকাবিলায় একটি ব্যবস্থা তৈরির কথা বলা হয়েছে।
যুদ্ধ, সশস্ত্র সংঘাত, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দুর্ঘটনা কিংবা সংক্রামক রোগের মতো পরিস্থিতির ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট দেশ বা অঞ্চলকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে সতর্কতা জারি করতে পারবে সরকার।
কোনো নাগরিক যদি সর্বোচ্চ ঝুঁকির দেশ বা এমন অঞ্চলে যেতে চান যেখানে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়ার ঘটনা বেশি, তাহলে ‘প্রয়োজনে’ অভিবাসন কর্তৃপক্ষ তাকে সেখানে না যেতে নিরুৎসাহিত করতে পারবে।
এইচআরডব্লিউর আপত্তি হলো, ‘প্রয়োজনে’ কখন এই ক্ষমতা প্রয়োগ হবে এবং কোন দেশকে কীভাবে ‘উচ্চঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে—তার মানদণ্ড বিধিমালায় বিস্তারিতভাবে নির্ধারণ করা হয়নি। ফলে প্রশাসনের বিবেচনাধীন ক্ষমতা বাড়তে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
তিন বছর পর্যন্ত দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিধান রয়েছে ৪ নম্বর ধারায়।
বিদেশে কোনো চীনা নাগরিক এমন ‘অবৈধ বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে’ জড়িত হয়েছেন, যা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বা জাতীয় স্বার্থের ক্ষতি করেছে- এমন সিদ্ধান্ত হলে দেশে ফেরার পর তাকে ছয় মাস থেকে সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত চীন ছাড়তে নিষেধ করা যেতে পারে।
প্রতারণার মাধ্যমে ভ্রমণ নথি সংগ্রহ বা অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করার কারণে প্রশাসনিক আটকভোগী ব্যক্তির ক্ষেত্রেও একই ধরনের ছয় মাস থেকে তিন বছরের নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া কোনো নাগরিক রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কিংবা প্রযুক্তি আমদানি-রপ্তানিসংক্রান্ত নিয়ম লঙ্ঘন করে দেশের শিল্প বা প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলতে পারেন—এমন পরিস্থিতিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তার দেশত্যাগ বন্ধ করতে পারবে। এই অংশটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ার প্রেক্ষাপটে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
কেন নিষিদ্ধ, সেটিও সবসময় জানাতে হবে না
বিধিমালার ৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী, সাধারণভাবে কাউকে দেশ ছাড়তে নিষেধ করা হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে তার কারণ, আইনি ভিত্তি এবং প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ জানাতে হবে।
কিন্তু তথ্য প্রকাশ করলে জাতীয় নিরাপত্তা বা কোনো অপরাধ তদন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে মনে হলে কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সেই তথ্য না-ও জানাতে পারবে।
এই ব্যতিক্রম নিয়েই মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বড় উদ্বেগ। এইচআরডব্লিউর মতে, নিষেধাজ্ঞার কারণ না জানানোর সুযোগ যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া বা ‘ডিউ প্রসেস’-এর সুরক্ষা দুর্বল করতে পারে।
বিদেশিদের ক্ষেত্রে কী বদলেছে?
বিদেশিদের বিষয়ে নতুন বিধিমালার ৫ নম্বর ধারায় কয়েক ধরনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
ভিসা বা প্রবেশের আবেদনে মিথ্যা তথ্য দিলে কোনো বিদেশিকে এক থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত চীনে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা যেতে পারে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত অপরাধ বা প্রতারণার ক্ষেত্রেও একই ধরনের নিষেধাজ্ঞার সুযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া চীনের ‘কাউন্টারমেজারস লিস্ট’, ‘আনরিলায়েবল এনটিটি লিস্ট’ বা ‘ম্যালিশাস এনটিটি লিস্ট’-এ থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ভিসা বা অন্যান্য এক্সিট-এন্ট্রি নথি না দেওয়া এবং প্রবেশে বাধা দেওয়ার ব্যবস্থা কার্যকর করতে পারবে কর্তৃপক্ষ।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। সরকারি বিধিমালার ইংরেজি অনুবাদে ৫ নম্বর ধারাটি মূলত প্রবেশ, ভিসা ও এক্সিট-এন্ট্রি নথি নিয়ন্ত্রণের কথা বলছে; বিদেশিদের জন্য নতুন কোনো সর্বজনীন দেশত্যাগ নিষেধাজ্ঞার বিধান সেখানে সরাসরি লেখা নেই। তবে এইচআরডব্লিউর ব্যাখ্যা হলো, নতুন বিধিমালা চীনের বিদ্যমান এক্সিট-ব্যান কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকি বাড়ায়।
বিদেশিদের আটকে রাখার নজিরও রয়েছে
চীনে বিদেশিদের দেশ ছাড়তে না দেওয়ার ঘটনা অবশ্য নতুন নয়।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে মার্কিন সরকারের পেটেন্ট অ্যান্ড ট্রেডমার্ক অফিসে কর্মরত এক মার্কিন নাগরিককে চীন ছাড়তে দেওয়া হয়নি। তিনি ব্যক্তিগত সফরে দেশটিতে গিয়েছিলেন। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ওয়েলস ফার্গোর নির্বাহী চেনইউয়ে মাওকেও চীন ত্যাগে বাধা দেওয়া হয়।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরে জানায়, মাও একটি ফৌজদারি তদন্তের সঙ্গে যুক্ত এবং আইন অনুসারেই তার ওপর দেশত্যাগের বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ, সে বিষয়ে তখন বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।
এসব ঘটনার পর বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীদের চীন সফর নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়। ওয়েলস ফার্গো সাময়িকভাবে কর্মীদের চীন সফরও স্থগিত করেছিল।
এক দশক ধরে বাড়ছে নিয়ন্ত্রণ
এইচআরডব্লিউ বলছে, গত এক দশকে চীনে দেশত্যাগসংক্রান্ত নিয়ন্ত্রণ ক্রমেই বিস্তৃত হয়েছে।
উইঘুর ও তিব্বতিদের বিদেশ ভ্রমণ, মানবাধিকারকর্মীদের দেশত্যাগ এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের পাসপোর্ট ব্যবহারের ওপর বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধের তথ্য আগে থেকেই রয়েছে।
সংস্থাটির মতে, সরকারি কর্মীদের পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা রাখা এবং বিদেশ যেতে আগাম অনুমোদন নেওয়ার ব্যবস্থা উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বাইরে স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতালের কর্মীদের মধ্যেও বিস্তৃত হয়েছে।
বেইজিং অবশ্য এসব নিয়ন্ত্রণকে দুর্নীতি প্রতিরোধ, রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁস ঠেকানো এবং নাগরিকদের বিদেশে অপরাধ ও নিরাপত্তাঝুঁকি থেকে রক্ষার ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করে আসছে। নতুন বিধিমালার সরকারি ব্যাখ্যাতেও নিরাপত্তাঝুঁকি প্রতিরোধ এবং মানুষের বৈধ অধিকার রক্ষাকে উদ্দেশ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে কী আছে
সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রত্যেক ব্যক্তির নিজের দেশসহ যেকোনো দেশ ত্যাগ করার অধিকার স্বীকৃত।
তবে এই অধিকার সম্পূর্ণ সীমাহীন নয়। জাতীয় নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, জনস্বাস্থ্য কিংবা অন্যের অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষার মতো বৈধ উদ্দেশ্যে আইনের মাধ্যমে বিধিনিষেধ আরোপ করা যেতে পারে। মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী, সেই বিধিনিষেধকে প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক হতে হয়।
এইচআরডব্লিউর দাবি, চীনের নতুন বিধিমালায় ‘জাতীয় নিরাপত্তা’, ‘জাতীয় স্বার্থ’ কিংবা শিল্প ও প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার মতো বিস্তৃত ধারণার ভিত্তিতে প্রশাসনকে যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তা নির্বিচারে প্রয়োগের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সংস্থাটির এশিয়াবিষয়ক উপপরিচালক মায়া ওয়াংয়ের মতে, এতে শুধু মানবাধিকারকর্মী বা সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী নয়, বিদেশিদেরও চীন থেকে বের হওয়ার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে পারে। তিনি আশঙ্কা করেন, এমন পরিস্থিতি মতপ্রকাশ ও একাডেমিক স্বাধীনতার ওপর চাপ সৃষ্টি করে আত্মনিয়ন্ত্রণ বা ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’ বাড়াতে পারে।
অন্যদিকে চীনা সরকারের অবস্থান হলো, নতুন বিধিমালার লক্ষ্য সাধারণ মানুষের আন্তর্জাতিক ভ্রমণ বন্ধ করা নয়; বরং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, জাতীয় নিরাপত্তা, প্রযুক্তি পাচার এবং ঝুঁকিপূর্ণ বিদেশযাত্রা নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান আইনগুলোকে আরও সুসংহত করা।
ফলে নতুন নিয়মকে ঘিরে মূল বিতর্কটি শুধু চীন কারও বিদেশযাত্রা ঠেকাতে পারবে কি না, সেটি নয়। বরং প্রশ্ন হচ্ছে- ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ বা ‘ঝুঁকি’র মতো বিস্তৃত ধারণা ব্যবহার করে সেই ক্ষমতা কতটা স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও আনুপাতিকভাবে প্রয়োগ করা হবে।

