ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর একটি মন্তব্য নিয়ে এখন নানা আলোচনা চলছে। শনিবার ঢাকার একটি অনুষ্ঠানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে যাওয়া নিয়ে কথা বলেন। এই মন্তব্য এসেছে এমন সময়, যখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে প্রস্তুতির আভাস মিলছে। ফলে কূটনৈতিক মহলে বিষয়টি বাড়তি কৌতূহল তৈরি করেছে।
ঢাকায় একটি বেসরকারি সংস্থার সম্মেলনে প্রশ্নোত্তর পর্ব চলছিল। সেখানে একজন জানতে চান, শেখ হাসিনাকে কবে হস্তান্তর করা হবে। জবাবে ত্রিবেদী বলেন, এই বিষয়ে একটি নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া আছে। ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রও বারবার এ কথা বলেছেন। তাঁর মতে, বিষয়টি এখন আদালতে রয়েছে, তাই কেউ সময়সীমা বেঁধে দিতে পারে না।
হাসিনার ভারতে আসার প্রসঙ্গেও তিনি কথা বলেন। ত্রিবেদী জানান, ভারতীয় বিমান বাহিনী বা সেনাবাহিনী তাঁকে নিয়ে আসেনি। বাংলাদেশের সেই কঠিন সময়ের কারণেই তিনি এসেছিলেন। হাইকমিশনার আরও বলেন, সামরিক বিমানটি যখন ভারতে পৌঁছায়, তখন ভারত এর জন্য প্রস্তুত ছিল না। তিনি টিভিতে দেখেছিলেন, হাসিনা অন্য কোনো দেশে যাচ্ছেন বলে খবর চলছে। তখনো হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
ত্রিবেদী বলেন, প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের সামনে বাস্তবতা মেনে নেওয়া ছাড়া কার্যত কোনো পথ ছিল না। অনুমতি না দিলে কী ঘটত, তা তিনি জানেন না বলেও মন্তব্য করেন। তাঁর ভাষায়, এটিই ঘটনার ঐতিহাসিক কারণ। একই সঙ্গে তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক ভালো এবং জাতীয় স্বার্থে দুই দেশেরই বন্ধু হিসেবে যোগাযোগ রাখা উচিত।
এই বক্তব্য নতুন নয় বলে মনে করছেন অনেক কূটনৈতিক বিশ্লেষক। ২০২৪ সালের ৬ই অগাস্ট ভারতের রাজ্যসভায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর প্রায় একই কথা বলেছিলেন। তিনি তখন জানান, বিক্ষোভের মুখে হাসিনা পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। এরপর তিনি অল্প সময়ের নোটিশে ভারতে আসার অনুমতি চান। বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ফ্লাইট ক্লিয়ারেন্সের অনুরোধও আসে।
ভারতের ওপি জিন্দাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত মনে করেন, ত্রিবেদী নতুন কিছু বলেননি। তাঁর মতে, এটিই ভারত সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান। অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক শ্রোতা ছিলেন। তাই হয়তো হাইকমিশনার সরকারের অবস্থান আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন। দত্ত এর পেছনে আলাদা কোনো বার্তা দেখছেন না।
বাংলাদেশের বিশ্লেষকরা বিষয়টিকে এত সহজ ভাবে দেখছেন না। সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, হাইকমিশনার বোঝাতে চেয়েছেন যে বিষয়টি বাংলাদেশের। একতরফা ভাবে ভারতের ওপর দায় চাপানোর সুযোগ নেই। তবে ভারত এতে জড়িয়ে গেছে। তাই তিনি আইনি প্রক্রিয়ায় সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন। কেউ কেউ মনে করেন, ত্রিবেদী এবার আগের চেয়ে দৃঢ়ভাবে একটি কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। হাসিনা সামরিক বিমানে এসেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই এসেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমীন ভিন্ন একটি দিক দেখছেন। তাঁর মতে, হাইকমিশনার সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আগ্রহ জানিয়েছেন। এক জায়গায় আটকে না থেকে আলোচনায় বসার কথাই তিনি বলতে চেয়েছেন। এ জন্য শীর্ষ বৈঠক বা দুই প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ দরকার হতে পারে। তাহলে বাকি বিষয়গুলো নিয়ে এগোনো সহজ হবে।
এদিকে বাংলাদেশ সরকার শুরু থেকেই হাসিনাকে ফেরত চাইছে। সরকারি মহল এটিকে তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের অনুকূল পরিবেশ তৈরির এক ধরনের শর্ত হিসেবেও তুলে ধরেছে। গত ১৬ই অগাস্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী হাসিনা ও অন্য পলাতক অপরাধীদের দ্রুত ফেরত দিতে ভারতকে অনুরোধ করা হয়েছে। শহীদ শরীফ ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডের অভিযুক্তদেরও হস্তান্তরের অনুরোধ জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ এখন ভারতের জবাবের অপেক্ষায় আছে।
২০২৪ সালের অগাস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে নেমেছিল। চলতি বছরের ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি নেতা তারেক রহমানের সরকার ক্ষমতায় আসে। এরপর ঢাকা ও দিল্লি দুই পক্ষই সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করেছে। গত ২৯শে সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে ত্রিবেদী সাক্ষাৎ করেন। এরপর থেকে তারেক রহমানের ভারত সফরের বিষয়টি আবার আলোচনায় এসেছে।

