আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে উড়ন্ত বিমানের ডানায় দাঁড়িয়ে মানুষের কসরত দেখানোর দৃশ্য অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। কিন্তু প্রায় এক শতাব্দী আগে এমন বিপজ্জনক প্রদর্শনী ছিল বাস্তব। তখন নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত সীমিত। আকাশে উড়ন্ত বিমানের ডানায় হাঁটা, উল্টো হয়ে ঝুলে থাকা, এমনকি এক বিমান থেকে অন্য বিমানে যাওয়ার মতো দুঃসাহসিক কসরত দেখিয়ে দর্শকদের বিনোদন দিতেন বৈমানিকেরা।
এই প্রদর্শনী পরিচিত ছিল ‘উইং ওয়াকিং’ নামে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দর্শকদের বিনোদন দিতে গিয়ে কেন মানুষ নিজের জীবনকে এত বড় ঝুঁকির মুখে ফেলতেন? আর যে কসরতে সামান্য ভুলের পরিণতি হতে পারত মৃত্যু, সেটিই বা কীভাবে জনপ্রিয় বিনোদনে পরিণত হয়েছিল?
বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে বিমান চলাচল ছিল প্রযুক্তিগত অগ্রগতির এক বিস্ময়কর অধ্যায়। তখন আকাশে উড়তে পারাই ছিল বড় অর্জন। বিমানের নির্মাণপ্রযুক্তি, ইঞ্জিনের নির্ভরযোগ্যতা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা আজকের তুলনায় অনেক পিছিয়ে ছিল। ফলে প্রতিটি উড্ডয়নেই অনিশ্চয়তা থাকত। তা সত্ত্বেও একদল দুঃসাহসী বৈমানিক শুধু বিমান চালিয়েই সন্তুষ্ট থাকেননি। তাঁরা আকাশকে পরিণত করেছিলেন এমন এক প্রদর্শনীর মঞ্চে, যেখানে দক্ষতা, সাহস এবং জীবনের ঝুঁকি একসঙ্গে উপস্থিত ছিল।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বিমান প্রযুক্তির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যুদ্ধের প্রয়োজনে দ্রুত উন্নত হতে থাকে বিমান নির্মাণ ও পাইলটদের প্রশিক্ষণব্যবস্থা। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বিপুলসংখ্যক সামরিক বিমান অব্যবহৃত হয়ে পড়ে। এসব বিমান তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হওয়ায় অনেক সাবেক সামরিক বৈমানিক ও দুঃসাহসী তরুণ সেগুলো কিনে আকাশে প্রদর্শনী শুরু করেন। এভাবেই জনপ্রিয়তা পায় ‘ফ্লাইং সার্কাস’ বা ভ্রাম্যমাণ আকাশ প্রদর্শনী।
এই প্রদর্শনীগুলো শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না; অনেক বৈমানিকের জীবিকা নির্বাহের পথও ছিল। দর্শকদের কাছ থেকে পাওয়া অর্থের ওপর নির্ভর করতেন তাঁরা। ফলে দর্শক আকর্ষণের প্রতিযোগিতায় ক্রমেই নতুন ও বিপজ্জনক কসরত যুক্ত হতে থাকে। কেউ বিমান উল্টো করে ওড়াতেন, কেউ আকাশে জটিল বাঁক নিতেন, আবার কেউ উড়ন্ত বিমানের ককপিট ছেড়ে ডানায় উঠে দাঁড়াতেন। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে- দর্শকদের বিস্মিত করার প্রতিযোগিতা কি একসময় মানুষের নিরাপত্তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল?
| দর্শকদের বিনোদন দিতে গিয়ে কেন মানুষ নিজের জীবনকে এত বড় ঝুঁকির মুখে ফেলতেন? আর যে কসরতে সামান্য ভুলের পরিণতি হতে পারত মৃত্যু, সেটিই বা কীভাবে জনপ্রিয় বিনোদনে পরিণত হয়েছিল? |
উইং ওয়াকিংয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তিদের একজন মার্কিন বৈমানিক অর্মার লকলিয়ার। ১৯১৮ সালে সামরিক প্রশিক্ষণের সময় বিমানের একটি কারিগরি সমস্যা সমাধান করতে তিনি ককপিটের বাইরে বের হয়েছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে সেই অভিজ্ঞতাকে তিনি দুঃসাহসিক প্রদর্শনীতে রূপ দেন। উড়ন্ত বিমানের ডানায় হাঁটা, মাথার ওপর ভর দিয়ে উল্টো হয়ে দাঁড়ানো এবং এক বিমান থেকে অন্য বিমানে যাওয়ার মতো কসরতের মাধ্যমে তিনি ব্যাপক পরিচিতি পান।
লকলিয়ারের জনপ্রিয়তা এতটাই বেড়েছিল যে উইং ওয়াকিং দ্রুত ফ্লাইং সার্কাসের অন্যতম প্রধান আকর্ষণে পরিণত হয়। তাঁর দেখানো পথ অনুসরণ করে আরও অনেকে এই বিপজ্জনক পেশায় যুক্ত হন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ইথেল ডেয়ার নামে পরিচিত মার্জি হবস। তিনি আকাশে এক বিমান থেকে অন্য বিমানে যাওয়ার দুঃসাহসিক কসরতের জন্য পরিচিতি পেয়েছিলেন। সেই সময় নারীদের বিমান চালনা ও আকাশকসরতে অংশগ্রহণের সামাজিক বাধা বিবেচনায় তাঁর উপস্থিতি ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
তবে এই রোমাঞ্চকর প্রদর্শনীর আড়ালে ছিল ভয়াবহ ঝুঁকি। শুরুর দিকের অনেক উইং ওয়াকার প্যারাস্যুট কিংবা বিমানের সঙ্গে শরীর আটকে রাখার নিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়াই কসরত দেখাতেন। উড়ন্ত বিমানের ডানায় দাঁড়িয়ে ভারসাম্য হারালে বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা ছিল অত্যন্ত কম। অথচ দর্শকদের কাছে এই মৃত্যুঝুঁকিই অনেক সময় প্রদর্শনীর আকর্ষণ বাড়িয়ে তুলত। বিষয়টি বিনোদনের ইতিহাসে একটি গভীর নৈতিক প্রশ্ন তৈরি করে, মানুষের জীবন বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা কি কখনো বিনোদনের উপাদান হওয়া উচিত?
এই বিপজ্জনক পেশার করুণ পরিণতির অন্যতম উদাহরণ অর্মার লকলিয়ার নিজেই। ১৯২০ সালের ২ আগস্ট ‘দ্য স্কাইওয়েম্যান’ চলচ্চিত্রের জন্য আকাশে কসরত প্রদর্শনের সময় বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়। যে আকাশ তাঁকে খ্যাতি দিয়েছিল, সেই আকাশেই তাঁর জীবনের অবসান ঘটে। ঘটনাটি প্রমাণ করে, অসাধারণ দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা থাকলেও আকাশে বিপজ্জনক কসরতের ঝুঁকি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ছিল না।
উইং ওয়াকিংয়ের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে নিরাপত্তাবিধি কঠোর করতে বাধ্য করে। ১৯৩০-এর দশকে নির্দিষ্ট উচ্চতার নিচে উইং ওয়াকিংয়ের ওপর বিধিনিষেধ এবং প্যারাস্যুট ব্যবহারের নিয়ম চালু হয়। এতে আগের মতো দর্শকদের খুব কাছ থেকে বিপজ্জনক কসরত দেখানো কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার ঝুঁকি, ব্যয় ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার পরিবর্তনে ফ্লাইং সার্কাসের জনপ্রিয়তা কমতে থাকে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিমান প্রযুক্তির লক্ষ্যও বদলে যায়। দ্রুতগতির সামরিক বিমান, শব্দের গতিসীমা অতিক্রম, মহাকাশ গবেষণা এবং নিরাপদ যাত্রী পরিবহনের দিকে গুরুত্ব বাড়তে থাকে। যে বিমান একসময় মানুষের কাছে বিস্ময়ের প্রতীক ছিল, ধীরে ধীরে সেটিই আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও পরিবহনের অপরিহার্য মাধ্যমে পরিণত হয়। ফলে আকাশে উড়তে পারার বিস্ময়ের জায়গা নিতে থাকে নিরাপত্তা, গতি ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ।
|
মানুষের সাহসের প্রকৃত পরিচয় কি জীবনের ঝুঁকি নেওয়ার মধ্যে, নাকি |
তবে উইং ওয়াকিং পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। ১৯৭০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে কয়েকটি দল পুরোনো দিনের আকাশকসরতের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়। পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ বৈমানিক ভিক নরম্যানের প্রতিষ্ঠিত অ্যারোসুপারব্যাটিকস দল ইউরোপে এই প্রদর্শনীকে নতুনভাবে পরিচিত করে তোলে। আধুনিক সময়ে বিশেষভাবে প্রস্তুত বোয়িং স্টিয়ারম্যান বাইপ্লেন ব্যবহার করে উইং ওয়াকাররা বিমানের ডানায় দাঁড়িয়ে নানা কসরত দেখান।
অবশ্য অতীতের তুলনায় বর্তমান উইং ওয়াকিংয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ সংযোগব্যবস্থা ও নিরাপত্তা সরঞ্জামের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীদের বিমানের সঙ্গে আটকে রাখা হয়। এতে ঝুঁকি কমানো সম্ভব হলেও আকাশে প্রবল বাতাসের চাপ, বিমানের গতি এবং শারীরিক ভারসাম্য বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। অর্থাৎ প্রযুক্তি এই প্রদর্শনীকে তুলনামূলক নিরাপদ করেছে, কিন্তু একে সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত করতে পারেনি।
উইং ওয়াকিংয়ের ইতিহাস তাই কেবল দুঃসাহসিক বিনোদনের গল্প নয়। এটি মানুষের প্রযুক্তিগত সীমা অতিক্রমের আকাঙ্ক্ষা, খ্যাতি অর্জনের প্রতিযোগিতা এবং নিরাপত্তা সম্পর্কে পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গিরও ইতিহাস। একসময় যে প্রদর্শনীতে জীবনের ঝুঁকি নেওয়াই ছিল দর্শকদের আকর্ষণের অন্যতম কারণ, আধুনিক যুগে সেই একই প্রদর্শনী টিকিয়ে রাখতে নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিতে হচ্ছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, মানুষের সাহসের প্রকৃত পরিচয় কি জীবনের ঝুঁকি নেওয়ার মধ্যে, নাকি সেই ঝুঁকি বুঝে তা নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতার মধ্যে?
উইং ওয়াকিংয়ের শতবর্ষের ইতিহাস এই প্রশ্নের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। প্রযুক্তির উন্নতি মানুষকে অসম্ভব মনে হওয়া অনেক কিছু করার সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু কোনো প্রদর্শনী যতই রোমাঞ্চকর হোক, মানুষের জীবনের মূল্য তার চেয়ে অনেক বেশি।

