সৌদি আরবের রিয়াদে অগ্নিকাণ্ডে নিহত নওগাঁর আরও পাঁচ প্রবাসীর মরদেহ শনিবার (৩১ অক্টোবর) দেশে পৌঁছাচ্ছে। ডিএনএ পরীক্ষায় পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর মরদেহ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হলেও শোকগ্রস্ত পরিবারগুলোর সামনে এখন ঋণের বড় বোঝা।
রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সেলর মুহাম্মদ রেজায়ে রাব্বি স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বৃহস্পতিবার এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, গত ৯ আগস্ট রিয়াদের একটি সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ১৬ জন বাংলাদেশি কর্মী মারা যান। এর মধ্যে ২৭ আগস্ট নয়জনের মরদেহ দেশে পাঠানো হয়েছিল। বাকি সাতটি মরদেহের পরিচয় এখন ডিএনএ পরীক্ষায় শনাক্ত হয়েছে। মরদেহ পাঠানোর সব আনুষ্ঠানিকতাও শেষ।
দূতাবাস জানিয়েছে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি ৩৩৬ ফ্লাইটে শনিবার সকাল ৮টা ৫ মিনিটে মরদেহগুলো ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করবে।
নওগাঁর যে পাঁচজনের মরদেহ আসছে, তাঁরা হলেন নওগাঁ শহরের পার নওগাঁ এলাকার মজনু রহমানের ছেলে শাহিন এবং আত্রাই উপজেলার চারজন। আত্রাইয়ের চারজন হলেন ডুবাই গ্রামের নাজমুল হুদার ছেলে হাসিবুল হাসান শুভ, মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের আক্কাস প্রামানিকের ছেলে মিনহাজ প্রামানিক, মাধবপুর গ্রামের মজনু সরদারের ছেলে মাসিদুল সরদার সজিব এবং সাধনগর গ্রামের আজহার আলীর ছেলে সাগর আলী।
ওই অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১৬ জনের মধ্যে ১২ জনই ছিলেন নওগাঁর বাসিন্দা। প্রথম দফায় মরদেহ দেশে আনা হলেও আইনি প্রক্রিয়া ও পরিচয় শনাক্তের জটিলতায় বাকি পাঁচজনের মরদেহ এতদিন সৌদি আরবের হিমঘরে পড়ে ছিল। এই সময়জুড়ে স্বজনেরা প্রিয়জনের মুখ শেষবার দেখার আশায় প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন।
এমন অপেক্ষার একটি করুণ চিত্র আত্রাইয়ের মজনু সরদার ও ছাইদা বেগম দম্পতির। সত্তরোর্ধ্ব এই বৃদ্ধ দম্পতি ছেলে মাসিদুল সরদারের মরদেহের খোঁজে প্রতি সপ্তাহে লাঠিতে ভর দিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে যেতেন। চোখের জল মুছে মজনু সরদার বারবার বলতেন, মৃত্যুর আগে অন্তত ছেলের মুখটি একবার দেখতে চান। শেষ পর্যন্ত তাঁদের সেই অপেক্ষা শেষ হতে চলেছে।
আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান জানান, নিহত পরিবারগুলোর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। মরদেহ দ্রুত আনতে প্রশাসন ওয়েজ আর্নার্স বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। তিনি জানান, পাঁচজনের মধ্যে চারজনের বাড়ি আত্রাই উপজেলায়, একজনের নওগাঁ সদরে।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে এই কর্মকর্তা আরও জানান, শুরুতে আত্রাইয়ের ১৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছিল। এখন আত্রাইয়ের ১১ জন ও নওগাঁ সদরের একজনের পরিচয় নিশ্চিত হয়েছে। অর্থাৎ নওগাঁর মোট ১২ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে।
মরদেহ ফেরার খবরে অপেক্ষার প্রহর শেষ হলেও পরিবারগুলোর সামনে এখন নতুন সংকট। নিহত প্রবাসীদের অনেকেই ভাগ্য বদলের আশায় ভিটেমাটি বন্ধক রেখে কিংবা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। তাঁদের স্বপ্ন আগুনে শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু দেশে রয়ে গেছে ঋণের বিশাল বোঝা।
আত্রাইয়ের সাধনগর গ্রামের নিহত সাগর আলীর স্ত্রী পারভীন খাতুন জানান, মাত্র ছয় মাস আগে সাড়ে ছয় লাখ টাকা ঋণ করে স্বামীকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন। পরিবারের একমাত্র সম্বল ভিটেবাড়িও মহাজনের কাছে বন্ধক আছে। এর মধ্যে ঋণের এক লাখ টাকাও শোধ করা যায়নি। দুই ছোট সন্তানকে নিয়ে এখন পাওনাদারদের তাগাদায় তিনি দিশেহারা।
পারভীনের ঘটনা একটি বড় সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। বিদেশে কাজে যাওয়ার খরচ জোগাতে গ্রামের অনেক পরিবার সর্বস্ব বন্ধক রাখে। উপার্জনকারী সদস্যের মৃত্যু হলে সেই ঋণ শোধের কোনো পথ থাকে না। মরদেহ দেশে আনা প্রশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, তবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের টিকে থাকার জন্য এর পরের ধাপও সমান জরুরি। এ ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ ও আর্থিক সহায়তা, ঋণের চাপ কমানোর উদ্যোগ এবং শিশুদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার প্রশ্নটি এখন সামনে এসেছে। সেদিকেই নজর থাকবে সংশ্লিষ্ট সবার।

