গত ৩১ অক্টোবর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি দেশটির সশস্ত্র বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন, ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের হুমকির জবাব যেন তাৎক্ষণিক ও কার্যকরভাবে দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে কোনো ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা রাখা যাবে না। একই সঙ্গে তিনি ইরানের সামরিক বাহিনীর কমান্ডারদের যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এমন সব বস্তুগত ও অবস্তুগত সম্পদের তালিকা হালনাগাদ করার নির্দেশ দিয়েছেন, যেগুলো ইরানের হামলার আওতায় আসতে পারে। পাশাপাশি গোয়েন্দা সক্ষমতা, সামরিক কৌশল ও দেশের অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার নির্দেশও দিয়েছেন তিনি।
এই বক্তব্যের তাৎপর্য শুধু হুমকির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর পেছনে থাকা কৌশলগত চিন্তাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তেহরান এমন দাবি করছে না যে যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ কিংবা সামরিক ব্যয়ের দিক থেকে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ। বরং তারা আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা দিতে চাইছে: যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব থাকলেই কোনো সংঘাতকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা কিংবা রাজনৈতিকভাবে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করা সম্ভব নয়। ইরান চাইছে, নতুন করে হামলা চালানো হলে তার মূল্য যেন শুধু ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে সীমাবদ্ধ না থাকে।
আট মাসের যুদ্ধের পর এই পার্থক্যটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করে। এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও সংঘাতের অবসান ঘটাতে জুনে করা একটি সমঝোতা স্মারক কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ভেঙে পড়ে। সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের বিশ্লেষণী সংস্থা কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিস (সিআরএস) এই সংঘাতকে ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধ হিসেবে বর্ণনা করে। অন্যদিকে, কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের (সিবিও) হিসাব অনুযায়ী, ১ আগস্ট পর্যন্ত ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে ব্যয় হয়েছে ৩৮ বিলিয়ন ডলার।
ইরানের সর্বশেষ সতর্কবার্তা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন কূটনৈতিক তৎপরতা চললেও পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। গত ৩০ অক্টোবর কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা আবারও তেহরানে যান। তবে আলোচনার অগ্রাধিকার নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মতপার্থক্য রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টি সমাধান করতে চায়। অন্যদিকে, ইরান চায় দেশটির বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহার এবং তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হোক।
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে একের পর এক সামুদ্রিক ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) দাবি করেছে, প্রণালিটিতে চারটি তেলবাহী ট্যাংকারে আগুন লেগেছে। তবে বার্তা সংস্থা রয়টার্স স্বাধীনভাবে এ দাবি যাচাই করতে পারেনি। আলাদাভাবে ব্রিটিশ নৌবাহিনী পরিচালিত যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য পরিচালনা সংস্থা (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, প্রণালিটিতে একটি ট্যাংকার অজ্ঞাত কোনো বস্তুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইরানের বার্তা শুধু এই নয় যে দেশটি আবারও যুদ্ধ করতে প্রস্তুত। বরং তেহরান বোঝাতে চাইছে, নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু হলে তা প্রতিপক্ষের প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত, ব্যয়বহুল এবং নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এটি মূলত উত্তেজনা বৃদ্ধির হুমকির মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কৌশল। এখানে বিজয়ের নিশ্চয়তা দেওয়ার চেয়ে প্রতিপক্ষকে এই ধারণা দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ যে সীমিত পরিসরে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।
প্রতিশোধের সীমা ছাড়িয়ে প্রতিরোধের কৌশল
প্রচলিত সামরিক ধারণায় প্রতিরোধের মূল ভিত্তি হলো প্রতিপক্ষকে বোঝানো যে হামলা চালানোর সম্ভাব্য ক্ষতি তার প্রত্যাশিত লাভের চেয়ে বেশি। কোনো রাষ্ট্র প্রতিপক্ষের লক্ষ্য অর্জনের পথ বন্ধ করে অথবা হামলার জন্য বড় ধরনের মূল্য দিতে বাধ্য করার হুমকি দিয়ে এই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় প্রচলিত সামরিক শক্তিতে ইরান অনেক পিছিয়ে। এ কারণে দেশটি দীর্ঘদিন ধরে দ্বিতীয় কৌশলটির ওপর নির্ভর করে আসছে। ক্ষেপণাস্ত্র, একমুখী আক্রমণকারী ড্রোন, দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে রাখা সামরিক অবকাঠামো এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোকে হুমকির মুখে ফেলার সক্ষমতার মাধ্যমে ইরান আকাশ কিংবা নৌপথে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন ছাড়াই প্রতিপক্ষের ওপর ক্ষয়ক্ষতি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।
সাম্প্রতিক যুদ্ধ এই কৌশলের সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা—দুটিই সামনে এনেছে। সিআরএসের তথ্য অনুযায়ী, ইরান পুরো অঞ্চলজুড়ে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র এবং হাজার হাজার ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। এসব হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল ইসরায়েল, উপসাগরীয় দেশগুলো, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা, কূটনৈতিক স্থাপনা, জ্বালানি উৎপাদনকেন্দ্র এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটির হাতে এখন কতসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন অবশিষ্ট রয়েছে, তা নিয়ে বিভিন্ন মূল্যায়নে ভিন্নতা রয়েছে। কিন্তু ইরানের জন্য অসীম অস্ত্রভান্ডার থাকা জরুরি নয়। বরং প্রতিপক্ষের ক্ষয়ক্ষতি ঘটানো, তাদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় অতিরিক্ত ব্যয় চাপানো এবং ভবিষ্যৎ হামলার আশঙ্কা জিইয়ে রাখার মতো সক্ষমতা টিকিয়ে রাখাই যথেষ্ট।
খামেনির ‘ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা ছাড়াই’ জবাব দেওয়ার নির্দেশ সম্ভাব্য হামলার পরিধি আরও বিস্তৃত হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর আওতায় ইসরায়েলের ভূখণ্ড থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পদ এবং সম্ভাব্য অপ্রচলিত বা অশারীরিক ব্যবস্থাও আসতে পারে।
তবে লক্ষ্যবস্তুর তালিকা হালনাগাদ করার নির্দেশের অর্থ এই নয় যে ইরান নতুন কোনো সামরিক সক্ষমতা অর্জন করেছে কিংবা ইতিমধ্যে হামলার চূড়ান্ত নির্দেশ দিয়েছে। বরং এর মাধ্যমে বোঝা যায়, সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশটির সামরিক কমান্ডারদের কত বিস্তৃত পরিসরে চিন্তা করতে বলা হচ্ছে।
ফলে ওয়াশিংটনের জন্য উদ্বেগের বিষয়টি শুধু ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার সক্ষমতা কিংবা কতগুলো উৎক্ষেপণকেন্দ্র ধ্বংস করা হয়েছে, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং নতুন করে হামলা চালানো হলে একাধিক রণাঙ্গনে পাল্টা প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও যুক্তরাষ্ট্রকে বিবেচনায় নিতে হবে।
হরমুজ প্রণালি: সামরিক ঝুঁকি থেকে অর্থনৈতিক চাপ
ইরানের সবচেয়ে কার্যকর কৌশলগত leverage বা চাপ প্রয়োগের সক্ষমতা হয়তো নিহিত রয়েছে এমন এক জায়গায়, যেখানে ভৌগোলিক অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক বাজারের স্বার্থ। ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী সরু জলপথ হরমুজ প্রণালির অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (ইআইএ) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ কোটি ৯ লাখ ব্যারেল তেল এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে। যা বিশ্বের মোট পেট্রোলিয়াম তরল জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং সমুদ্রপথে পরিবাহিত মোট তেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ।
সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) পাইপলাইনের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল রপ্তানির সক্ষমতা রয়েছে দৈনিক প্রায় ৪৭ লাখ ব্যারেল। কিন্তু স্বাভাবিক সময়ে এই প্রণালি দিয়ে যে বিপুল পরিমাণ তেল পরিবাহিত হয়, তার তুলনায় এই সক্ষমতা অনেক কম।
সাম্প্রতিক যুদ্ধ এই দুর্বলতা আরও স্পষ্ট করেছে। ইআইএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১ কোটি ৪৯ লাখ ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়েছে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪৯ লাখ ব্যারেলে। একই সময়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) পরিবহনও দৈনিক ৭ দশমিক ৪ বিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমে ০ দশমিক ৮ বিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসে।
প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত অধিকাংশ তেলের গন্তব্য এশিয়ার বাজার। ফলে এর প্রভাব শুধু উপসাগরীয় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকে না। জ্বালানি আমদানিকারক দেশ, নৌপরিবহন প্রতিষ্ঠান, বিমা কোম্পানি এবং শিল্প উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান—সবাই এর প্রভাবের মুখে পড়ে।
এটি মূলত ভূ-অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের কৌশল। বৈশ্বিক বাজারে প্রভাব বিস্তারের জন্য ইরানের হরমুজ প্রণালি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং এই জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেওয়া, জাহাজগুলোকে বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য করা, বিমা ও পরিবহন ব্যয় বাড়ানো এবং জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি করাই যথেষ্ট।
এ ক্ষেত্রে হুমকিটিই অর্থনৈতিক ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। তবে এই কৌশলের বিপরীত দিকও রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা চললে ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এশিয়ার জ্বালানি ক্রেতারা তেহরানের ওপর আস্থা হারাতে পারে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কঠোর প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়তে পারে দেশটি।
অর্থাৎ, পারস্পরিক নির্ভরশীলতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইরান চাপ সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু বিশ্ব কীভাবে এর জবাব দেবে, তা নির্ধারণ করার ক্ষমতা তেহরানের নেই।
উত্তেজনা বৃদ্ধির ফাঁদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান
ইরানের এই অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের সামনে একটি কঠিন কৌশলগত সংকট তৈরি করেছে। সীমিত পরিসরে হামলা চালালে ইরানের সামরিক সক্ষমতা কিংবা পাল্টা আঘাত হানার ইচ্ছা পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব নাও হতে পারে। অন্যদিকে, বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালালে ইরানের সামরিক শক্তি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে সংঘাতের বিস্তার, উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে।
এখানে ক্ষতির হিসাব শুধু অর্থনৈতিক নয়। সিআরএসের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের ১৮ জন সেনাসদস্য নিহত এবং ৮২৪ জন আহত হয়েছেন। একই সঙ্গে সংস্থাটি সতর্ক করেছে, ইরানের হামলা প্রতিহত করার মতো পর্যাপ্ত সামরিক সক্ষমতা এবং এর সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য বহন করার ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্র ও তার অংশীদারদের সীমিত।
তবে ইরানের কৌশলেও সমান গুরুতর ঝুঁকি রয়েছে। তেহরান সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তুর পরিধি যত বিস্তৃত করবে, ওয়াশিংটন ও তেল আবিব তত বেশি তার সামরিক প্রস্তুতিকে আক্রমণাত্মক অভিপ্রায়ের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।
এতে প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপও প্রতিপক্ষের কাছে হুমকি হিসেবে দেখা দিতে পারে। পাল্টা ব্যবস্থা আরও পাল্টা প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় একে বলা হয় ‘নিরাপত্তা সংকট’ বা সিকিউরিটি ডিলেমা। অর্থাৎ, যে নীতি নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নেওয়া হয়, সেটিই প্রতিপক্ষকে আগাম হামলা চালানোর প্রণোদনা দিতে পারে। কারণ প্রতিপক্ষ মনে করতে পারে, হুমকির মুখে থাকা সামরিক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হওয়ার আগেই তা ধ্বংস করা প্রয়োজন।
উত্তেজনা বাড়ালেই যে কূটনৈতিক আলোচনায় সুবিধা পাওয়া যাবে, তারও নিশ্চয়তা নেই। কাতারের সর্বশেষ মধ্যস্থতার উদ্যোগ থেকে বোঝা যায়, দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগের পথ এখনো খোলা রয়েছে। কিন্তু সমঝোতায় পৌঁছানোর ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার ক্রম নিয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
ইরান চায় বন্দর অবরোধ প্রত্যাহার এবং তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হোক। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো চুক্তির কেন্দ্রে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কঠোর অঙ্গীকার দেখতে চায়।
তেহরানের হুমকি যদি ওয়াশিংটনকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে বাধ্য করে যে নতুন করে যুদ্ধ শুরু করলে তার মূল্য অনেক বেশি হবে, তাহলে আলোচনার টেবিলে ইরানের অবস্থান শক্তিশালী হতে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে, সময়ক্ষেপণের ফলে ইরান আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠবে, তাহলে এই হুমকিই নতুন করে সামরিক হামলার পথ ত্বরান্বিত করতে পারে।
ইরানের নতুন সামরিক অবস্থানের কেন্দ্রে রয়েছে এই দ্বন্দ্ব। দেশটি উত্তেজনা বৃদ্ধির হুমকিকে বিশ্বাসযোগ্য করে যুদ্ধ ঠেকাতে চাইছে। কিন্তু একই সঙ্গে এমন পরিস্থিতি তৈরি করছে, যেখানে সেই উত্তেজনাই শেষ পর্যন্ত নতুন যুদ্ধের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
প্রচলিত সামরিক শক্তিতে ইরানের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজিত করা হয়তো সম্ভব নয়। কিন্তু মার্কিন সামরিক শক্তি প্রয়োগের ব্যয় বাড়িয়ে দেওয়া এবং সেই শক্তিকে রাজনৈতিক সাফল্যে রূপান্তর করা কঠিন করে তোলার সক্ষমতা দেশটির রয়েছে।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, প্রতিরোধের কৌশল নতুন যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটানোর আগেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এই বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারবে কি না। নাকি যুদ্ধ ঠেকানোর জন্য নেওয়া পাল্টাপাল্টি সামরিক প্রস্তুতিই শেষ পর্যন্ত দুই দেশকে আরেকটি সংঘাতের দিকে ঠেলে দেবে।

