যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক সাময়িকী ফরেন অ্যাফেয়ার্স-এ ৩০ অক্টোবর প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে এসব বিষয় তুলে ধরেছেন ফিনিশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের জ্যেষ্ঠ গবেষক ম্যাত্তি পেসু। ‘ন্যাটোকে কি নর্ডিক মডেল রক্ষা করতে পারে’ শীর্ষক বিশ্লেষণে তিনি যুক্তি দিয়েছেন, রাশিয়ার সম্ভাব্য আগ্রাসন মোকাবিলায় ন্যাটোর সদস্যদেশগুলোর মধ্যে ছোট আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একদিকে রাশিয়া সামরিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে এবং ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর বিরুদ্ধে হামলার ঘটনা নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি করছে। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইউরোপীয় মিত্রদের নিজেদের প্রতিরক্ষার প্রধান দায়িত্ব গ্রহণের জন্য চাপ দিচ্ছে। ফলে ন্যাটোর ইউরোপীয় সদস্যদের এমন একটি প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তুলতে হচ্ছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সহায়তা তুলনামূলক কম থাকলেও সম্মিলিত সামরিক প্রতিরোধ কার্যকর থাকবে।
এই পরিবর্তনের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ দেখা গেছে গত আগস্টে। ফিনল্যান্ডের অনুরোধে সুইডেন দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় আকাশসীমা ও ফিনল্যান্ড উপসাগরে নজরদারির জন্য যুদ্ধবিমান এবং একটি যুদ্ধজাহাজ পাঠায়। রাশিয়ার সম্ভাব্য আকাশসীমা লঙ্ঘন এবং ইউক্রেনীয় সামরিক অভিযানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পথভ্রষ্ট ড্রোনের ঝুঁকি মোকাবিলাই ছিল এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য।
এই অভিযানের বিশেষ দিক ছিল, সুইডেনের পাঠানো সামরিক সরঞ্জাম ও সদস্যরা ফিনল্যান্ডের নেতৃত্বে কাজ করেন। এমনকি অভিযানের ক্ষেত্রে ফিনল্যান্ডের সামরিক নিয়মও অনুসরণ করা হয়। দুই দেশের মধ্যে এই সমন্বয় দেখিয়েছে, পৃথক রাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী কীভাবে প্রয়োজনের সময় একই নেতৃত্বের অধীনে কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে।
উত্তর ইউরোপের দেশগুলোর এই সহযোগিতা অবশ্য হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। এর ভিত্তি গড়ে ওঠে ২০০৯ সালে, যখন অর্থনৈতিক সংকটের কারণে প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন দেখা দেয়। সে সময় ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, নরওয়ে ও সুইডেন মিলে নর্ডিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কাঠামো প্রতিষ্ঠা করে।
প্রথম দিকে এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য ছিল যৌথভাবে সামরিক সরঞ্জাম কেনার মাধ্যমে খরচ কমানো এবং প্রশিক্ষণে সহযোগিতা বাড়ানো। বিশেষ করে ফিনল্যান্ড, নরওয়ে ও সুইডেনের উত্তরাঞ্চলীয় আকাশসীমায় যৌথ বিমান প্রশিক্ষণ পরিচালনার মাধ্যমে কিছু সাফল্য পাওয়া যায়।
তবে তখন দেশগুলোর নিরাপত্তাগত অবস্থান এক ছিল না। ডেনমার্ক, আইসল্যান্ড ও নরওয়ে ন্যাটোর সদস্য হলেও ফিনল্যান্ড ও সুইডেন জোটের বাইরে ছিল। ফলে সামরিক পরিকল্পনা ও সরঞ্জাম সংগ্রহে প্রশাসনিক বাধা তৈরি হতো। পাশাপাশি সে সময় রাশিয়াকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ তুলনামূলক কম থাকায় সহযোগিতার গতি সীমিত ছিল।
পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে ২০১৪ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক হস্তক্ষেপের পর। উত্তর ইউরোপের দেশগুলো বুঝতে পারে, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা শুধু ব্যয় সাশ্রয়ের বিষয় নয়; বরং নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যও জরুরি।
এরপর ফিনল্যান্ড ও সুইডেন সামরিক সহযোগিতা আরও গভীর করে। দুই দেশ যুদ্ধকালীন যৌথ পরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগ নেয়। নরওয়েও ধীরে ধীরে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সামরিক অভিযানে সহযোগিতা বাড়াতে শুরু করে।
২০২০ সালের মধ্যে ফিনল্যান্ড, সুইডেন ও নরওয়ে যৌথ সামরিক মহড়া, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং সংকটকালীন প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা সমন্বয়ের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করে।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর উত্তর ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে আরও বড় পরিবর্তন আসে। ফিনল্যান্ড ও সুইডেন পরবর্তী সময়ে ন্যাটোতে যোগ দেওয়ায় নর্ডিক অঞ্চলের পাঁচটি দেশই একই সামরিক জোটের আওতায় চলে আসে।
এর ফলে আগে যে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাধাগুলো সামরিক সহযোগিতাকে সীমিত করেছিল, সেগুলোর অনেকটাই দূর হয়। দেশগুলো রাশিয়াকে নিজেদের পাশাপাশি সমগ্র ইউরোপের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে।
এই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালে ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে ও সুইডেন যৌথ বিমানশক্তি ব্যবহারের একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এর উদ্দেশ্য চার দেশের প্রায় ২৫০টি আধুনিক যুদ্ধবিমানকে প্রয়োজনের সময় একটি সমন্বিত সামরিক শক্তি হিসেবে পরিচালনা করা।
শুধু বিমানবাহিনী নয়, স্থলবাহিনী ও সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনের ক্ষেত্রেও সহযোগিতা বাড়ানো হয়েছে। ২০২৪ সালে পাঁচ দেশ ‘নর্ডিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা রূপকল্প ২০৩০’ গ্রহণ করে। এর মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তা পরিকল্পনার সঙ্গে ন্যাটোর সামগ্রিক প্রতিরক্ষা কৌশল সমন্বয় করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
একই সঙ্গে উত্তর ইউরোপজুড়ে সামরিক সদস্য ও সরঞ্জাম দ্রুত পরিবহনের জন্য একটি সীমান্তবিহীন সামরিক চলাচল ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। এর ফলে সংকটের সময় এক দেশ থেকে অন্য দেশে সেনা, যানবাহন ও প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জাম স্থানান্তর সহজ হওয়ার কথা।
বর্তমানে নর্ডিক দেশগুলোর মধ্যে সামরিক দায়িত্বও অনেকটা ভাগ হয়ে গেছে। ফিনল্যান্ড আঞ্চলিক স্থল অভিযান পরিচালনায় নেতৃত্ব দিচ্ছে। নরওয়েতে বিমান অভিযানের আঞ্চলিক সদর দপ্তর রয়েছে। সুইডেন উত্তর ইউরোপের যৌথ সামরিক অভিযানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রসদ ও পরিবহনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠছে। অন্যদিকে ডেনমার্ক বিশেষ সামরিক অভিযানের আঞ্চলিক সদর দপ্তরের দায়িত্ব পালন করছে।
বিশ্লেষক ম্যাত্তি পেসুর মতে, এই সহযোগিতার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, প্রতিটি দেশকে আলাদাভাবে সব ধরনের সামরিক সক্ষমতা গড়ে তুলতে হচ্ছে না। বরং নিজেদের শক্তিশালী ক্ষেত্রগুলোকে একত্র করে তারা এমন একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করছে, যা পৃথকভাবে পরিচালিত সামরিক বাহিনীর তুলনায় বেশি কার্যকর হতে পারে।
এতে ন্যাটোর বৃহত্তর প্রতিরক্ষা কাঠামোও শক্তিশালী হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানির মতো বড় সদস্যদেশগুলো নর্ডিক অঞ্চলে নিয়মিত সামরিক মহড়ায় অংশ নিচ্ছে। একই সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য, নজরদারি এবং সামরিক পর্যবেক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সহায়তা দিচ্ছে।
বিশেষ করে উত্তর আটলান্টিক, আর্কটিক অঞ্চল এবং সমুদ্রের নিচে থাকা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তায় এই সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এসব অঞ্চলের সঙ্গে রাশিয়ার কৌশলগত সামরিক অবস্থানের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
পেসুর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নর্ডিক দেশগুলোর এই অভিজ্ঞতা শুধু উত্তর ইউরোপের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। ন্যাটোর অন্যান্য সীমান্তবর্তী অঞ্চলেও একই ধরনের আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে বাল্টিক অঞ্চলকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এস্তোনিয়া, লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়া রাশিয়ার সম্ভাব্য সামরিক চাপের মুখে থাকা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে তারা নিজেদের মধ্যে গভীর সামরিক সহযোগিতা গড়ে তোলার পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় মিত্রদের নিরাপত্তা সহায়তার ওপর বেশি নির্ভর করেছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই অবস্থায় পরিবর্তন আসছে। এস্তোনিয়া ও লাটভিয়া যৌথভাবে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সংগ্রহ করেছে। পাশাপাশি তিনটি বাল্টিক দেশ রকেট প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ব্যবহার সমন্বয় এবং রাশিয়ার সম্ভাব্য স্থল আক্রমণ প্রতিরোধে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে।
এই প্রতিরক্ষা প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো সম্ভাব্য রুশ স্থল আক্রমণের গতি কমানো, অগ্রযাত্রায় বাধা সৃষ্টি করা এবং প্রয়োজনের সময় প্রতিরোধ গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করা।
তবে বিশ্লেষকের মতে, শুধু যৌথ অস্ত্র সংগ্রহ বা সীমান্তে প্রতিরক্ষা স্থাপনা নির্মাণ যথেষ্ট নয়। বাল্টিক দেশগুলোর উচিত নিজেদের জাতীয় প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা আরও ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করা, নিয়মিত যৌথ সামরিক মহড়া পরিচালনা করা এবং আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ব্যবহারে সহযোগিতা বাড়ানো।
এ ছাড়া সমুদ্র ও সমুদ্রতলের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পর্যবেক্ষণে চালকবিহীন নৌযান ব্যবহারের মতো ক্ষেত্রেও যৌথ উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
এই আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা কাঠামোয় পোল্যান্ডকে যুক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন পেসু। ইউরোপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক শক্তি হিসেবে উঠে আসা দেশটির বাল্টিক অঞ্চলের নিরাপত্তায় আরও বড় ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে পোল্যান্ড ও লিথুয়ানিয়ার মধ্যবর্তী সুওয়ালকি করিডরকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই সরু স্থলপথ বাল্টিক দেশগুলোকে ইউরোপের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রেখেছে। কোনো বড় সামরিক সংঘাতের সময় এই পথের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে বাল্টিক দেশগুলোতে স্থলপথে সামরিক সহায়তা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
পেসুর মতে, পোল্যান্ডের নিজস্ব সীমান্ত প্রতিরক্ষা প্রকল্পকে বাল্টিক দেশগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে জার্মানির সঙ্গে সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটি লিথুয়ানিয়ায় স্থায়ীভাবে একটি সামরিক ব্রিগেড মোতায়েন করছে।
বাল্টিক অঞ্চলের পাশাপাশি কৃষ্ণসাগরকেও ন্যাটোর ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বুলগেরিয়া, রোমানিয়া ও তুরস্ক কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হলেও রাশিয়ার হুমকি সম্পর্কে তাদের মূল্যায়ন সব সময় এক নয়। ফলে দেশগুলোর মধ্যে গভীর সামরিক সহযোগিতা গড়ে তোলা নর্ডিক অঞ্চলের তুলনায় বেশি কঠিন।
তবে সামুদ্রিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে কিছু অগ্রগতি হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বুলগেরিয়া, রোমানিয়া ও তুরস্ক যৌথভাবে সমুদ্রে মাইন অপসারণ কার্যক্রম শুরু করে। পরবর্তী সময়ে জ্বালানি অবকাঠামো, যোগাযোগব্যবস্থা এবং সমুদ্রতলের পাইপলাইনের নিরাপত্তায় সহযোগিতার উদ্যোগও নেওয়া হয়।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই যৌথ নৌ উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত করে কৃষ্ণসাগরে নিয়মিত নজরদারি এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা রক্ষার একটি কার্যকর কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব।
বিমানবাহিনীর ক্ষেত্রেও সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। বুলগেরিয়া নতুন যুদ্ধবিমান পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে, রোমানিয়া আরও আধুনিক যুদ্ধবিমান সংগ্রহের পরিকল্পনা করছে এবং তুরস্ক নিজস্ব বিমানশক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত যুদ্ধবিমান কর্মসূচিতে পুনরায় যুক্ত হতে চাইছে।
এ অবস্থায় নিয়মিত যৌথ বিমান মহড়া এবং সামরিক যোগাযোগব্যবস্থা সমন্বয়ের মাধ্যমে দেশগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে পারে।
তবে নর্ডিক অঞ্চলের মতো সহযোগিতা গড়ে তোলা সহজ নয়। উত্তর ইউরোপের দেশগুলোর বর্তমান পর্যায়ের সামরিক সমন্বয় অর্জন করতে ১৫ বছরের বেশি সময় লেগেছে। পেসুর মতে, ন্যাটোর অন্যান্য সীমান্তবর্তী অঞ্চলের হাতে এত দীর্ঘ সময় নাও থাকতে পারে।
কারণ, ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর রাশিয়া আরও শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতা নিয়ে আবির্ভূত হতে পারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে সামরিক ঝুঁকি গ্রহণের ক্ষেত্রে মস্কোর আগ্রহও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করেছেন তিনি।
এ কারণে ন্যাটোর সদস্যদেশগুলোর উচিত শুধু কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় না থেকে আঞ্চলিক পর্যায়েও নিজেদের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি শক্তিশালী করা।
পেসুর মতে, ন্যাটোর সামগ্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোনো কারণে বিলম্ব বা অচলাবস্থা তৈরি হলে ছোট আঞ্চলিক সামরিক সহযোগিতা কাঠামো সদস্যদেশগুলোকে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর সুযোগ দিতে পারে। তবে এসব কাঠামো ন্যাটোর বিকল্প নয়; বরং জোটটির সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার একটি উপায়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনও ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতিরক্ষা দায়িত্ব বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। ওয়াশিংটনের প্রস্তাবিত নতুন ন্যাটো কাঠামোয় ইউরোপীয় সদস্যরা নিজেদের প্রচলিত সামরিক প্রতিরক্ষার প্রধান দায়িত্ব পালন করবে। যুক্তরাষ্ট্র মূলত পারমাণবিক প্রতিরোধক্ষমতা এবং বিশেষ কিছু সামরিক সক্ষমতার মাধ্যমে সহায়তা দেবে।
এই ধারণাকে বিশ্লেষণে ন্যাটোর নতুন পর্যায়ের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে পেসুর মতে, শুধু সামরিক বাজেট বাড়ালেই এই পরিকল্পনা সফল হবে না। সদস্যদেশগুলোর সামরিক বাহিনীকে একসঙ্গে কাজ করার উপযোগী করে তুলতে হবে।
যৌথ অস্ত্র সংগ্রহ, সামরিক পরিকল্পনা সমন্বয়, একই নেতৃত্বের অধীনে অভিযান পরিচালনা এবং সীমান্ত পেরিয়ে দ্রুত সেনা চলাচলের ব্যবস্থা তৈরি করা এ ক্ষেত্রে অপরিহার্য।
নর্ডিক দেশগুলো ইতোমধ্যে এই সক্ষমতার অনেকটাই অর্জন করেছে। বিশেষ করে ফিনল্যান্ড ও নরওয়ে রাশিয়ার সীমান্তবর্তী সামরিক তৎপরতা পর্যবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা ভূমিকা পালন করছে।
ফিনল্যান্ড তার আকাশসীমা ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা বিমানকে রাশিয়ার কোলা উপদ্বীপ পর্যবেক্ষণের সুযোগও দিচ্ছে। অঞ্চলটি রাশিয়ার কৌশলগত পারমাণবিক সামরিক সক্ষমতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ ধরনের সহযোগিতা উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলে রাশিয়ার সামরিক প্রভাব বিস্তার সীমিত রাখার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে নর্ডিক দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় রাজনৈতিক জটিলতা তৈরি করেছে গ্রিনল্যান্ড ইস্যু।
ট্রাম্প প্রশাসন একদিকে ইউরোপীয় মিত্রদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর প্রশংসা করছে, অন্যদিকে গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিভিন্ন মন্তব্য উত্তর ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে ও সুইডেন ২০২৯ সালের মধ্যে মোট দেশজ উৎপাদনের অন্তত ৩ শতাংশ প্রতিরক্ষায় ব্যয় করার লক্ষ্য অর্জন করেছে অথবা সেই পথে রয়েছে। একই সঙ্গে দেশগুলো ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা ও সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা খাতে মোট দেশজ উৎপাদনের ৫ শতাংশ ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রার প্রতিও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
কিন্তু গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান এসব মিত্রদেশের পারস্পরিক সংহতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের মধ্যে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
বিশেষ করে গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের সঙ্গে সাংবিধানিকভাবে যুক্ত একটি স্বশাসিত অঞ্চল হওয়ায় এর ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ উত্তর ইউরোপের নিরাপত্তা রাজনীতিতে সংবেদনশীল বিষয় হয়ে উঠেছে।
তবে গত সেপ্টেম্বরে ওয়াশিংটন, কোপেনহেগেন ও নুকের মধ্যে স্বাক্ষরিত গ্রিনল্যান্ড-সংক্রান্ত চুক্তিকে সম্পর্ক উন্নয়নের একটি সম্ভাব্য সুযোগ হিসেবে দেখছেন পেসু।
তার মতে, এই চুক্তির ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তায় আরও গঠনমূলক ভূমিকা নিতে পারে। একই সঙ্গে নর্ডিক দেশগুলোর সামরিক সহযোগিতাকে সমর্থন দিয়ে ন্যাটোর অন্যান্য অঞ্চলেও একই ধরনের উদ্যোগ উৎসাহিত করতে পারে।
বিশ্লেষকের যুক্তি, ইউরোপীয় সদস্যদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের সামরিক সক্ষমতা কার্যকরভাবে ব্যবহারের পরিবেশ তৈরি করা যুক্তরাষ্ট্রের নিজের স্বার্থেও গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ, ইউরোপের দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার প্রধান দায়িত্ব নিতে পারলে ন্যাটোর সামগ্রিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতা শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে ইউরোপের প্রতিটি নিরাপত্তা সংকটে সরাসরি প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে না।
সব মিলিয়ে উত্তর ইউরোপের পাঁচ দেশের সামরিক সহযোগিতা ন্যাটোর ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা কাঠামোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠেছে। রাশিয়ার সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় শুধু বড় সামরিক জোটের সদস্য হওয়া নয়, বরং প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে বাস্তবসম্মত সামরিক সমন্বয় গড়ে তোলাও জরুরি হয়ে পড়েছে।
ম্যাত্তি পেসুর বিশ্লেষণের মূল বক্তব্য হলো, ন্যাটোর ভবিষ্যৎ শক্তি নির্ভর করবে সদস্যদেশগুলো কতটা কার্যকরভাবে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা একত্র করতে পারে, তার ওপর। নর্ডিক অঞ্চলের অভিজ্ঞতা যদি বাল্টিক ও কৃষ্ণসাগর অঞ্চলেও প্রয়োগ করা যায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তুলনামূলক কম নির্ভর করেও ইউরোপ একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে।
তবে সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য শুধু প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন রাজনৈতিক আস্থা, যৌথ সামরিক পরিকল্পনা এবং সদস্যদেশগুলোর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা। আর এ কারণেই রাশিয়ার হুমকি ও যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তিত অবস্থানের মধ্যে নর্ডিক মডেল ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

