বিশ্ব রাজনীতিতে আবারও বড় শক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য বৈঠক ঘিরে নতুন বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তিন নেতা নিজেদের দেশের সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে চাইছেন। তবে বর্তমান বিশ্ব কি সত্যিই এমন অবস্থায় রয়েছে, যেখানে কয়েকটি পরাশক্তি নিজেদের ইচ্ছামতো অন্য দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারবে?
এই প্রশ্ন সামনে এনেছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক নিকোলাস ওয়েস্টকট। ৫ নভেম্বর এশিয়া টাইমসে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে তিনি যুক্তি দিয়েছেন, ১৯৪৫ সালের মতো বিশ্বকে কয়েকটি প্রভাববলয়ে ভাগ করে নেওয়ার চিন্তা বর্তমান বাস্তবতায় কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ, গত আট দশকে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রযুক্তি এবং রাষ্ট্রগুলোর স্বাধীনতা সম্পর্কে মানুষের ধারণায় মৌলিক পরিবর্তন এসেছে।
আগামী ১৮ ও ১৯ নভেম্বর এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা সংস্থার সম্মেলনের পাশাপাশি ট্রাম্প, পুতিন ও শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য বৈঠক নিয়ে আলোচনা চলছে। যদিও বৈঠকটি এখনো নিশ্চিত নয়, এর সম্ভাবনাই আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
বিশেষ করে ১৯৪৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক ইয়াল্টা সম্মেলনের সঙ্গে এই সম্ভাব্য বৈঠকের তুলনা করা হচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল এবং সোভিয়েত নেতা জোসেফ স্তালিন ইয়াল্টায় বৈঠক করেছিলেন।
সেই সম্মেলনে যুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং আন্তর্জাতিক ক্ষমতার বিন্যাস নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। পরবর্তী সময়ে বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে দুটি প্রধান শক্তিবলয় গড়ে ওঠে।
বর্তমানে ট্রাম্প, পুতিন ও শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য বৈঠককে ঘিরে একই ধরনের নতুন ক্ষমতার বিন্যাসের আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। তবে ওয়েস্টকটের মতে, বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতা ১৯৪৫ সালের পরিস্থিতি থেকে অনেক আলাদা।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তিন নেতাই এমন দেশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যেগুলো নিজেদের প্রধান বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করে। তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে এমন ধারণা পাওয়া যায় যে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো মূলত বড় শক্তিগুলোর পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমেই নির্ধারিত হওয়া উচিত।
ওয়েস্টকটের মূল্যায়নে, ট্রাম্প বিশেষভাবে পুতিন ও শি জিনপিংয়ের প্রতি এমন সম্মান ও গুরুত্ব দেখান, যা অন্য অনেক দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের ক্ষেত্রে দেখা যায় না। তার রাজনৈতিক আচরণে এমন একটি বিশ্বব্যবস্থার প্রতি আগ্রহের ইঙ্গিত রয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন নিজেদের প্রভাববলয় অনুযায়ী আন্তর্জাতিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
বিশ্লেষকের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৫ সালের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলেও পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন প্রাধান্যের বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়া ও চীনের নিজ নিজ অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনাকেও পরোক্ষভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এই ধারণার একটি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন ওয়েস্টকট। তার বিশ্লেষণে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হস্তক্ষেপের মাধ্যমে নেতৃত্ব পরিবর্তন এবং অঞ্চলটির বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি সহানুভূতিশীল রাজনৈতিক শক্তিকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
তার মতে, এসব কর্মকাণ্ড থেকে বোঝা যায়, ওয়াশিংটন পশ্চিম গোলার্ধে নিজের রাজনৈতিক প্রভাব ধরে রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
অন্যদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সামরিক শক্তি ব্যবহার করছেন বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সাবেক সোভিয়েত অঞ্চলের দেশগুলোতে রাশিয়ার প্রতি অনুগত বা সহানুভূতিশীল সরকার প্রতিষ্ঠায় মস্কো বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক ও কৌশলগত চাপ প্রয়োগ করছে বলে ওয়েস্টকটের মূল্যায়ন।
চীনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা দেখা যাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তাইওয়ানের ওপর বেইজিংয়ের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য দীর্ঘদিন ধরেই প্রকাশ করে আসছেন।
এর পাশাপাশি মিয়ানমার, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং দক্ষিণ চীন সাগর অঞ্চলে চীনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা চলছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
ওয়েস্টকটের মতে, তিনটি পরাশক্তির এই দৃষ্টিভঙ্গির সামনে অন্যতম বড় বাধা ইউরোপীয় ইউনিয়ন। কারণ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো বড় শক্তির একক আধিপত্যের পরিবর্তে পারস্পরিক সহযোগিতা, যৌথ নিয়ম এবং রাষ্ট্রগুলোর সম্মতির ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যদেশগুলো নিজেদের সার্বভৌমত্বের কিছু ক্ষমতা যৌথ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রয়োগ করে। এর বিনিময়ে তারা অভিন্ন বাজার, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার সুবিধা পায়।
এই ব্যবস্থায় মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং পারস্পরিক সমঝোতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে বড় শক্তির প্রভাববলয়ভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার ধারণার সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতিগত পার্থক্য রয়েছে।
বিশ্লেষণে ওয়েস্টকট অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া উভয়ই ইউরোপের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক কাঠামোর বিরুদ্ধে অসন্তোষকে উৎসাহিত করছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নবিরোধী জনতুষ্টিবাদী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর প্রতি সমর্থনের মাধ্যমে ইউরোপের ঐক্য দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
তবে বিশ্বে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার বিষয়টি শুধু ভূখণ্ড দখলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ওয়েস্টকটের মতে, সাম্রাজ্যবাদী প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অন্য দেশের সম্পদ বণ্টন, বাণিজ্য, নিরাপত্তা এবং শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করা।
এই কারণেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে অনেক সদ্য স্বাধীন দেশ পুরোপুরি স্বাধীনতার নিশ্চয়তা হিসেবে দেখেনি। আনুষ্ঠানিকভাবে ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান হলেও অর্থনৈতিক নীতি ও শাসনব্যবস্থার ওপর বাইরের প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে অব্যাহত ছিল।
অনেক দেশের কাছে এই পরিস্থিতি নতুন ধরনের ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। অর্থাৎ সরাসরি বিদেশি শাসন না থাকলেও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ থেকে যায়।
তবে ওয়েস্টকট মনে করেন, উনিশ শতকের সাম্রাজ্যবাদী যুগের তুলনায় বর্তমান বিশ্ব মৌলিকভাবে বদলে গেছে।
একসময় সাম্রাজ্য ছিল বিভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম ও অঞ্চলের জনগোষ্ঠীকে একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের অধীনে রাখার প্রচলিত ব্যবস্থা। বহু শতাব্দী ধরে এই ধরনের শাসনব্যবস্থা টিকে ছিল।
কিন্তু জাতীয়তাবাদের উত্থান সাম্রাজ্যভিত্তিক রাজনৈতিক কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ জানায়। ভাষা, সংস্কৃতি, জাতিগত পরিচয় এবং নিজস্ব রাষ্ট্র পরিচালনার আকাঙ্ক্ষা মানুষের মধ্যে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে শক্তিশালী করে।
একই সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক জাতীয়তাবাদ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন ধরনের সংঘাতও সৃষ্টি করে। ওয়েস্টকটের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শক্তির ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা কিছু সময়ের জন্য বড় সংঘাত ঠেকালেও শেষ পর্যন্ত ১৯১৪ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে বিশ্ব দুটি ভয়াবহ যুদ্ধের মুখোমুখি হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে পারমাণবিক অস্ত্রের আবির্ভাব মানবসভ্যতাকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের আশঙ্কার সামনে দাঁড় করায়। এর পর আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য নতুন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ এবং বহুপক্ষীয় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
১৯৪৬ সালে জাতিসংঘের সদস্যসংখ্যা ছিল ৪৩। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯৩-এ। সদস্যদেশগুলোর বড় অংশই দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছে এবং সেই স্বাধীনতা রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ওয়েস্টকটের মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ছোট দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। যাতে বড় শক্তিগুলো নিজেদের সুবিধামতো অন্য দেশের ভূখণ্ড ও জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে না পারে।
এই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এখন শুধু রাষ্ট্রের নেতৃত্ব নয়, সাধারণ মানুষও নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার সম্পর্কে অনেক বেশি সচেতন।
বিশ্লেষণে গ্রিনল্যান্ডের জনগণের অবস্থানকে এর উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ওয়েস্টকটের মতে, গ্রিনল্যান্ডের মানুষ দেখিয়েছেন যে নিজেদের ভূখণ্ড ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অন্য কোনো রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হোক, তা তারা সহজে মেনে নিতে প্রস্তুত নন।
একইভাবে ইউক্রেন ও ইরানের জনগণের রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, সামরিক শক্তি বা বাইরের চাপ দিয়ে কোনো জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও অনিশ্চয়তার কথা উল্লেখ করেছেন তিনি। তার বিশ্লেষণে মার্কিন সমর্থনে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া ডেলসি রদ্রিগেজ কতদিন ক্ষমতায় থাকতে পারবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
ওয়েস্টকটের মতে, এসব ঘটনা দেখায় যে বড় শক্তির সমর্থন বা সামরিক ক্ষমতা থাকলেই কোনো দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা যায় না।
বর্তমান বিশ্বে পরাশক্তিগুলোর ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার আরেকটি বড় কারণ অর্থনৈতিক আন্তনির্ভরতা।
গত কয়েক দশকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিকে গভীরভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। একটি দেশের উৎপাদন, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও বাজার এখন অনেক ক্ষেত্রেই অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীল।
বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৫০ সালের তুলনায় বিশ্ববাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার ৫০০ শতাংশ বেড়েছে। এই বিস্তৃত বাণিজ্যব্যবস্থা বিশ্বজুড়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, আয় বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ওয়েস্টকটের মতে, বিশ্বায়ন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকলেও এর বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। গণতান্ত্রিক কিংবা কর্তৃত্ববাদী—উভয় ধরনের সরকারের জন্যই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, জনগণের জীবনমান ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখা রাজনৈতিক ক্ষমতা বজায় রাখার অন্যতম শর্ত।
এ কারণে বর্তমান বিশ্বের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে পুরোপুরি উপেক্ষা করে পরাশক্তিগুলোর পক্ষে নিজেদের মধ্যে বিশ্ব ভাগ করে নেওয়া সহজ নয়।
প্রযুক্তিগত পরিবর্তনও আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।
ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি সংযুক্ত। যদিও কয়েকটি বড় মার্কিন প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের হাতে এই ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং কিছু কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র ইন্টারনেট ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে, তবু তথ্য ও যোগাযোগের বিস্তার বিশ্ব রাজনীতিকে বদলে দিয়েছে।
একই সঙ্গে সামরিক প্রযুক্তির উন্নয়ন যুদ্ধের প্রচলিত ধারণায় পরিবর্তন এনেছে। বিশেষ করে চালকবিহীন আকাশযান বা ড্রোনের ব্যবহার তুলনামূলক দুর্বল সামরিক শক্তিকেও শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলার সুযোগ দিচ্ছে।
ওয়েস্টকটের বিশ্লেষণে ইউক্রেন ও ইরানের চলমান যুদ্ধের পাশাপাশি ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া ও গাজার সংঘাতের উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে।
তার মতে, এসব সংঘাতে দেখা গেছে, সামরিক শক্তির বড় ধরনের ব্যবধান থাকলেও তুলনামূলক দুর্বল পক্ষ শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে।
ফলে শুধু সামরিক অভিযান পরিচালনা করে কোনো রাজনৈতিক বিরোধের স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বরং অনেক ক্ষেত্রে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং কোনো পক্ষই সহজে পরাজয় স্বীকার করতে চায় না।
এ ধরনের সংঘাত সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর জন্যও বড় ধরনের চাপ তৈরি করে।
বিশ্লেষকের মতে, বর্তমান বিশ্বে সামরিক শক্তি, অর্থ ও অস্ত্রের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মিত্রতার গুরুত্বও বেড়েছে।
কোনো রাষ্ট্রের কাছে বিপুল সামরিক সক্ষমতা থাকলেও নির্ভরযোগ্য মিত্র না থাকলে দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক প্রভাব ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনা করেছেন ওয়েস্টকট। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী মিত্রদের প্রতি ট্রাম্পের অবজ্ঞাপূর্ণ আচরণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মার্কিন প্রভাব ও বিশ্বাসযোগ্যতার ক্ষতি করেছে।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ২০২৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে যিনিই পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন না কেন, মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সহজ হবে না।
তবে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মতো বড় শক্তিগুলোর প্রভাব মোকাবিলায় মধ্যম শক্তির দেশগুলো কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা রক্ষায় মধ্যম শক্তির দেশগুলোর সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু ওয়েস্টকট মনে করেন, এই দেশগুলোর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশ বিদ্যমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার দুর্বলতাকে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগাতে বেশি আগ্রহী হতে পারে। ফলে সব মধ্যম শক্তি একসঙ্গে একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক জোট গড়ে তুলবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
ওয়েস্টকটের মতে, আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা রক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি স্বার্থ রয়েছে ছোট দেশগুলোর।
কারণ, বিশ্বের ১৯৩টি রাষ্ট্রের মধ্যে অল্প কয়েকটি ছাড়া অধিকাংশই ছোট ও মাঝারি আকারের দেশ। এসব দেশের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন অনেকাংশে এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে, যেখানে রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্বকে সম্মান করা হয় এবং বিরোধ নিষ্পত্তিতে কিছু অভিন্ন নিয়ম অনুসরণ করা হয়।
বড় শক্তির প্রতিযোগিতায় ছোট দেশগুলো প্রায়ই বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ে। আন্তর্জাতিক নিয়ম দুর্বল হয়ে গেলে তাদের ওপর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ বাড়ার আশঙ্কা থাকে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক আইন, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং শান্তিপূর্ণ বাণিজ্যব্যবস্থা কার্যকর থাকলে ছোট দেশগুলো নিজেদের স্বার্থ রক্ষার তুলনামূলক বেশি সুযোগ পায়।
এ কারণে ওয়েস্টকট মনে করেন, বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রশ্নে শুধু পরাশক্তি বা মধ্যম শক্তির দেশগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। ছোট দেশগুলোর সম্মিলিত স্বার্থ ও রাজনৈতিক অবস্থানকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
তার বিশ্লেষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—বিশ্বের ছোট দেশগুলোকে আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা রক্ষার জন্য কে একত্র করবে?
ওয়েস্টকটের মতে, বিশ্বের অবশিষ্ট গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর নেতাদের এখন এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত। শুধু নিজেদের সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা বাড়ানোর পরিবর্তে এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করা প্রয়োজন, যেখানে ছোট দেশগুলোর স্বাধীনতা ও অধিকার সুরক্ষিত থাকবে।
সব মিলিয়ে ট্রাম্প, পুতিন ও শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য বৈঠক বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন ক্ষমতার সমীকরণ নিয়ে আলোচনা তৈরি করলেও ১৯৪৫ সালের ইয়াল্টা সম্মেলনের মতো বিশ্বকে প্রভাববলয়ে ভাগ করে নেওয়ার ধারণা বর্তমান বাস্তবতায় বড় বাধার মুখে পড়তে পারে।
কারণ, আজকের বিশ্বে স্বাধীন রাষ্ট্রের সংখ্যা অনেক বেশি, আন্তর্জাতিক অর্থনীতি গভীরভাবে সংযুক্ত এবং প্রযুক্তি সামরিক শক্তির প্রচলিত ভারসাম্যকে বদলে দিয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের জনগণ নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার ছাড়তে আগের তুলনায় অনেক কম প্রস্তুত।
নিকোলাস ওয়েস্টকটের বিশ্লেষণের মূল বক্তব্য হলো, বিশ্ব রাজনীতিতে পরাশক্তিগুলোর প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ থাকলেও তারা আর এককভাবে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারবে না। ছোট দেশগুলোর স্বাধীনতা, জনগণের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক আন্তনির্ভরতা সেই ক্ষমতার ওপর গুরুত্বপূর্ণ সীমা তৈরি করেছে।
তাই ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মধ্যে ক্ষমতার সমঝোতা হবে কি না, তা নয়। বরং আন্তর্জাতিক নিয়ম, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং শান্তিপূর্ণ সহযোগিতার ভিত্তিতে ছোট-বড় সব দেশের জন্য কতটা গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ।

