আজ ৭ নভেম্বর, বিজ্ঞানের ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল নাম মেরি কুরির জন্মদিন। ১৮৬৭ সালে পোল্যান্ডের ওয়ারশতে জন্ম নেওয়া এই বিজ্ঞানী প্রথম নারী হিসেবে নোবেল পুরস্কার পান। বিজ্ঞানের দুটি ভিন্ন শাখায় দুবার নোবেল জয়ের রেকর্ডও বিশ্বে আর কারও নেই। জীবনের বেশির ভাগ সময় কাটলেও তিনি ফ্রান্সে। মৃত্যুর পর তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় তাঁকে সিসার তৈরি বদ্ধ কফিনে সমাহিত করা হয়, যা আজও তাঁর জীবন ও কাজের ঝুঁকির সাক্ষ্য বহন করছে।
মেরি কুরির জীবনের গল্প এমন এক সময়ের, যখন ইউরোপে শিল্পবিপ্লব ঘটে গেছে, সমাজ ও অর্থনীতি ছুটছে দ্রুত গতিতে। কিন্তু নারীদের অবস্থা তখনো অনেকটাই পিছিয়ে। শিক্ষা-দীক্ষায় নারীরা ছিলেন অনেক দূরে, আর বিজ্ঞানগবেষণায় তাঁদের অংশগ্রহণ ছিল প্রায় অকল্পনীয়। এমন সমাজে সীমারেখা ভেঙেছিলেন তিনি। বিজ্ঞান পড়েছেন, গবেষণায় ডুবে থেকেছেন, আবিষ্কারে বিশ্বখ্যাত হয়েছেন। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে তাঁর কাজ এনেছে বিপ্লব।
১৮৬৭ সালে ওয়ারশতে জন্ম নেওয়ার সময় পোল্যান্ড ছিল রুশ সাম্রাজ্যের অংশ। তখন তাঁর নাম ছিল মারিয়া সালোমিয়া স্ক্লোদোভস্কা। বাবা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অঙ্ক ও পদার্থবিদ্যা পড়াতেন। শৈশব থেকেই পড়াশোনার প্রতি, বিশেষ করে বিজ্ঞানের প্রতি, ছিল তাঁর তীব্র টান। বাবার কাছে বিজ্ঞানের মৌলিক কিছু বিষয়ে পাঠ নিয়েছেন। মাত্র ১৬ বছর বয়সে মাধ্যমিক শেষ করে স্বর্ণপদক পান।
কিন্তু ভুল জায়গায় বিনিয়োগ করে বাবা সব সঞ্চয় ও সম্পত্তি হারালে সংসারে তীব্র অনটন নেমে আসে। পড়াশোনা প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। বাধ্য হয়ে অল্প বয়সেই গৃহশিক্ষকতা শুরু করেন মারিয়া। তখন পোল্যান্ডে মেয়েরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেতেন না। তাঁর বড় বোন ব্রোনিয়া প্যারিসে চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়তে গেলে তাঁর খরচ জোগান মারিয়াই। আশা ছিল, বোন পড়া শেষ করে কাজে ঢুকলে তিনিও পড়ার সুযোগ পাবেন। এর মধ্যে শিক্ষার্থীদের একটি বিপ্লবী সংগঠনে জড়িয়ে পড়ায় নিরাপত্তার কারণে ওয়ারশ ছেড়ে ক্রাকোতে যাওয়ার কথা ভাবেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ভাগ্য তাঁকে নিয়ে যায় প্যারিসে।
১৮৯১ সালে পদার্থবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষার জন্য প্যারিসে বোনের কাছে যান মারিয়া। ভর্তি হন সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে তাঁর নাম হয়ে যায় মেরি। ১৮৯৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানে প্রথম শ্রেণিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। পরের বছর গণিতেও স্নাতক ডিগ্রি পান, তবে তৃতীয় শ্রেণিতে।
সরবোনই বদলে দেয় তাঁর জীবন। সেখানে পরিচয় হয় পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও খ্যাতিমান বিজ্ঞানী পিয়েরে কুরির সঙ্গে। ১৮৯৪ সালে পরিচয়, পরের বছর ২৫ জুলাই বিয়ে। মেরির নামের সঙ্গে যুক্ত হয় ‘কুরি’। পড়াশোনা শেষ করে পোল্যান্ডে ফেরার যে পরিকল্পনা তাঁর ছিল, বিয়ের পর তা বদলে যায়। স্বামী-স্ত্রী মিলে ফ্রান্সেই গবেষণা শুরু করেন। দিনের বেশির ভাগ সময় কাটত গবেষণাগারে। গবেষণাগারের পরিবেশ ছিল অনুন্নত, আর জীবিকার জন্য দুজনকেই শিক্ষকতা করতে হতো। এই দম্পতির দুই মেয়ে, ইরেন ও ইভ।
১৮৯৬ সালে ফরাসি বিজ্ঞানী অঁরি বেকেরেল তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কার করলে কুরি দম্পতি নতুন গবেষণায় অনুপ্রাণিত হন। তাঁদের নিরলস গবেষণায় ১৮৯৮ সালের জুলাইয়ে আবিষ্কৃত হয় পোলোনিয়াম। মেরির জন্মভূমি পোল্যান্ডের নামে এর নামকরণ করা হয়। একই বছর তাঁরা আবিষ্কার করেন রেডিয়াম, যা তীব্র তেজস্ক্রিয়তার কারণে বিখ্যাত হয়ে ওঠে। তেজস্ক্রিয় পদার্থের অবশিষ্টাংশ থেকে রেডিয়াম আলাদা করার পদ্ধতিও উদ্ভাবন করেন মেরি। এতে পর্যাপ্ত রেডিয়াম সংগ্রহ সম্ভব হয়। বিশেষ করে চিকিৎসাক্ষেত্রে এর ব্যবহারে তাঁর আগ্রহ ছিল।
১৯০৩ সালে তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে গবেষণার জন্য পদার্থবিজ্ঞানে অঁরি বেকেরেলের সঙ্গে যৌথভাবে নোবেল পান মেরি ও পিয়েরে কুরি। পুরস্কারের অর্থমূল্যের অর্ধেক পান কুরি দম্পতি, বাকি অর্ধেক বেকেরেল। একই বছর ডেভি পদক জেতেন তাঁরা, আর মেরি পদার্থবিজ্ঞানে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। প্রথম নোবেল জয়ের আট বছর পর, ১৯১১ সালে, ইতিহাসের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে দ্বিতীয়বার নোবেল পান তিনি। এবার রসায়নে, এককভাবে।
১৯০৬ সালে ঘোড়ায় টানা গাড়ির ধাক্কায় পিয়েরের মৃত্যু হয়। স্বামীর মৃত্যুর পর প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন মেরি। এ পদে নিয়োগ পাওয়া প্রথম নারী ছিলেন তিনি। ১৯০৯ সালে রেডিয়াম ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ তদারক করেন। পাস্তুর ইনস্টিটিউট ও প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে গড়া এই ইনস্টিটিউটের লক্ষ্য ছিল তেজস্ক্রিয়তা ও চিকিৎসাক্ষেত্রে এর ব্যবহার নিয়ে গবেষণা। ১৯১৪ সালে এটি আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করলে এর অধীন কুরি গবেষণাগারের পরিচালক হন মেরি। ইনস্টিটিউটের খরচ জোগাতে ১৯২১ সালে কুরি ফাউন্ডেশন গড়া হয়। ১৯২২ সালে প্যারিসে একটি চিকিৎসাকেন্দ্র চালু হয়, যেখানে রেডিওথেরাপিসহ ক্যানসারের আধুনিক চিকিৎসা দেওয়া হতো। পরে এটিই কুরি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি করে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে মেয়ে ইরেনকে সঙ্গে নিয়ে চিকিৎসাসেবায় যুক্ত হন মেরি। রেডক্রসের হাসপাতালগুলোয় এক্স-রে যন্ত্র পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। নিজ উদ্যোগে ১৮টি গাড়িতে এক্স-রে যন্ত্র বসান, যেগুলোর নাম দেন তাঁর মেয়ে ইভ—‘লিটল কুরি’। এর মাধ্যমে যুদ্ধাহত সেনাদের শরীরে আটকে থাকা গোলা ও বোমার টুকরা শনাক্ত করা এবং অস্ত্রোপচার করা সহজ হয়। এতে বহু মানুষের প্রাণ বাঁচে।
মেরি কুরি ছিলেন শান্ত, বিনয়ী ও প্রচারবিমুখ। ১৯২১ সালে প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্র সফরে যান গবেষণার জন্য মূল্যবান রেডিয়াম সংগ্রহের উদ্দেশ্যে। বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অনুদানে সেই রেডিয়াম কেনা হয়। ১৯২২ সাল থেকে তিনি লিগ অব নেশনসের বুদ্ধিবৃত্তিক সহযোগিতা কমিশনে যুক্ত হন। তিনি বিশ্বাস করতেন, গবেষণার কোনো ভৌগোলিক সীমানা থাকা উচিত নয়। এই বিশ্বাস থেকেই আলবার্ট আইনস্টাইনকেও কমিশনে যোগ দিতে উৎসাহিত করেন। একই বছর ফ্রান্সের চিকিৎসাবিজ্ঞান একাডেমির প্রথম নারী সদস্য হন তিনি। বিজ্ঞানের পাশাপাশি চিকিৎসা ও আইনশাস্ত্রে একাধিক সম্মানসূচক ডিগ্রিও পেয়েছেন।
জন্মশহর ওয়ারশতে একটি তেজস্ক্রিয়তা গবেষণাগার গড়ার উদ্যোগও নেন মেরি। ১৯২৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হার্বার্ট হুভার তাঁকে ৫০ হাজার ডলার উপহার দেন। সেই অর্থে ওয়ারশর গবেষণাগারের জন্য রেডিয়াম কেনেন তিনি। তাঁর বিশ্বাস ছিল, মানুষের জীবন সহজ করে এবং দুর্ভোগ কমিয়ে যে অগ্রগতি আনে, বিজ্ঞান তারই ভিত্তি।
জীবনভর তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে কাজ করেও এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে তিনি সম্ভবত তেমন ভাবেননি। পকেটে বোতলভর্তি পোলোনিয়াম বা রেডিয়াম নিয়ে নির্দ্বিধায় গবেষণাগারে ঘুরে বেড়াতেন। যথাযথ সুরক্ষাব্যবস্থা না থাকায় ধীরে ধীরে তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি হয়। ১৯২০-এর দশকে শরীরে রোগের লক্ষণ দেখা দেয়। পরে তাঁর অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া ধরা পড়ে। এ রোগে অস্থিমজ্জা রক্তকোষ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়। ১৯৩৪ সালের ৪ জুলাই ফ্রান্সের সাভোয়া অঞ্চলে ৬৬ বছর বয়সে মারা যান তিনি।
মৃত্যুর পর তেজস্ক্রিয় উপাদান ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে তাঁকে সিসার তৈরি বদ্ধ কফিনে সমাহিত করা হয়। ১৯৯৫ সালে প্যারিসের প্যানথিওনে নতুন করে সমাহিত করা হয় তাঁর দেহভস্ম। নিজ কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে প্যানথিওনে সমাহিত হওয়া প্রথম নারীও তিনি। সেখানে স্বামী পিয়েরের পাশেই শায়িত আছেন।
মৃত্যুর ৯০ বছরের বেশি পেরিয়ে গেলেও তেজস্ক্রিয়তার ভয় এখনো কাটেনি। তাঁর পোশাক, আসবাব, বই ও গবেষণাগারের বিভিন্ন সরঞ্জামে তেজস্ক্রিয় উপাদান এখনো সক্রিয় আছে বলে জানা গেছে। এ কারণে তাঁর নোটবুকসহ বিভিন্ন জিনিস ফ্রান্সের বিবলিওথেক ন্যাশনালে সিসা-আবৃত বাক্সে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। তাঁর দপ্তর ও গবেষণাগার এখন ‘কুরি জাদুঘর’ নামে পরিচিত।
মেরি ও পিয়েরে ১৯০৩ সালে নোবেল পাওয়ার সময় তাঁদের মেয়ে ইরেনের বয়স ছিল ছয় বছর। বড় হয়ে ইরেনও বাবা-মায়ের পথে হেঁটেছেন। কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কারের জন্য স্বামী ফ্রেডরিক জোলিও কুরির সঙ্গে ১৯৩৫ সালে রসায়নে নোবেল পান তিনি।
মেরি কুরি সম্পর্কে আইনস্টাইন বলেছিলেন, বিশ্বের বিখ্যাত ব্যক্তিদের মধ্যে একমাত্র মাদাম কুরিকেই খ্যাতি কখনো কলুষিত করতে পারেনি। জ্ঞানচর্চার সুযোগ শুধু বিশেষ শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকুক, এটা মানতেন না মেরি। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, উচ্চশিক্ষার পথ ধনী পরিবারের সন্তানদের জন্য অনেকটাই খোলা, কিন্তু স্বল্প আয়ের পরিবারের সন্তানদের জন্য তা এখনো কঠিন। এর ফলে প্রতিবছর প্রতিটি দেশ তাদের সবচেয়ে মেধাবী প্রতিভার বড় একটি অংশ হারায়। তাঁর আরেকটি উপলব্ধি ছিল, কী করা হয়েছে তা কেউ খেয়াল করে না, বরং কী করা বাকি আছে সেটাই সবার চোখে পড়ে।
সব মিলিয়ে বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় নিজের জীবন উৎসর্গ করে গেছেন মেরি কুরি। তাঁর আদর্শে গড়া কুরি ইনস্টিটিউট আজও মানুষের কল্যাণে গবেষণার পথ দেখাচ্ছে।

