১৯৬১ সাল। উত্তাল উত্তরের আফ্রিকায় তখনও সদ্য স্বাধীন মরক্কো নিজেদের পরিচয় খুঁজছে। আর ঠিক তখনই, হাজার হাজার ইহুদি পরিবারের জীবনভাগ্য চিরতরে পাল্টে যেতে শুরু করে। একটি গোপন অপারেশন—‘অপারেশন ইয়াচিন’-এর মাধ্যমে মরক্কো থেকে প্রায় ৯০ হাজার ইহুদি গোপনে ইসরায়েলে পাঠানো হয়। অপারেশনটি ছিল ইতিহাসের এক অন্ধকারচিহ্নিত অধ্যায়, যা এখনও বহু মরক্কান-ইহুদির স্মৃতিতে বেদনার রেখা টেনে রেখেছে।
‘অপারেশন ইয়াচিন’ শুরু হয় ১৯৬১ সালে এবং চলে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত। এটি পরিচালনা করে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ও বিশ্ব ইহুদি সংস্থা জিউইশ এজেন্সি। অপারেশনের মূল লক্ষ্য ছিল মরক্কোর ইহুদি জনগোষ্ঠীকে নিরাপদে ও গোপনে ইসরায়েলে পাঠানো।
মরক্কোর তৎকালীন রাজা হাসান দ্বিতীয় গোপনে এই মিশনের অনুমোদন দেন। চুক্তির আওতায়, ইসরায়েল মরক্কো সরকারকে অর্থ প্রদান করে—প্রথম ৫০ হাজার অভিবাসীর জন্য প্রতি মাথাপিছু ১০০ ডলার, এরপর প্রত্যেকের জন্য ২৫০ ডলার। এক অর্থে, মরক্কোর ইহুদি জনগোষ্ঠী “মূল্যায়িত” হয়েছিল একটি কৌশলগত বিনিময়পণ্যে।
কেন এই গণ-অভিবাসন?
মরক্কো থেকে ইহুদি জনগোষ্ঠীর এই গণ-প্রস্থান অনেকটা ‘অদৃশ্য চাপ’ ও মনস্তাত্ত্বিক ভয়ের ফল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নতুন জাতীয়তাবাদী আবহে অনেক ইহুদি উদ্বিগ্ন ছিলেন নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে। যদিও সরকারি নীতিতে ইহুদি-বিরোধিতা খোলাখুলি ছিল না, তবে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আরব-ইসরায়েল উত্তেজনা এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মধ্যে বিদ্যমান একপ্রকার সামাজিক চাপ ইহুদি সম্প্রদায়কে নিরাপত্তাহীনতায় ফেলেছিল।
১৯৬১ সালে ১৭ বছর বয়সে দেশ ত্যাগকারী ফান্নি মারগুইয়ের স্মৃতি এখনও ঝাপসা হয়নি। ক্যাসাব্লাঙ্কার বন্দরঘাটে হাজার হাজার ইহুদি পরিবারের কান্না, চোখেমুখে আতঙ্ক—এই দৃশ্যই তাকে আজও তাড়িয়ে বেড়ায়।
তিনি বলেন, “লোকে আনন্দের সঙ্গে দেশ ছাড়েনি। এটা ছিল অস্তিত্ব রক্ষার এক সিদ্ধান্ত। কেউ জানত না সামনে কী অপেক্ষা করছে।”
🇮🇱 ইসরায়েলের অভ্যর্থনা: বৈষম্য, অবহেলা ও সংস্কৃতিগত সংকট
ইসরায়েলে পৌঁছানোর পরই মরক্কান ইহুদি পরিবারগুলো উপলব্ধি করেন, তারা একটি নতুন জাতিগত ও শ্রেণিগত বৈষম্যের মুখোমুখি হয়েছেন। ইউরোপীয় ইহুদিদের তুলনায় তারা ‘নিম্নমানের’ হিসেবে বিবেচিত হন। মরক্কানদের ঠাঁই হয় মরুভূমির ধারে জরাজীর্ণ স্থাপনায়। তাদের শেখানো হয় কিভাবে ইউরোপীয় সংস্কৃতি গ্রহণ করতে হবে।
ফান্নি মারগুই বলেন, “ইউরোপ থেকে আসা ইহুদি পরিবারগুলো আমাদের নিচু চোখে দেখত। আমাদের সংস্কৃতি, ভাষা, পোশাক—সবই উপহাসের বিষয় ছিল।”
অনেকেই ইসরায়েলে গিয়ে ফিরে যেতে চেয়েছিলেন মরক্কোতে। কিন্তু অধিকাংশের পাসপোর্ট বা বৈধ কাগজ ছিল না। কেউ কেউ মরক্কোর কনস্যুলেটে গিয়ে অনুরোধ করেছিলেন পুনঃপ্রবেশের অনুমতির জন্য। তবে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে তা আর সম্ভব হয়নি।
মারগুই পরে ফ্রান্সে পড়াশোনা শেষে নিজেকে রাজনীতিতে সক্রিয় করে তোলেন। তিনি ইসরায়েলি ‘ব্ল্যাক প্যান্থারস’ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন, যেটি সেপার্ডিক (মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার ইহুদি) জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধ ও ফিলিস্তিন দখল তার দৃষ্টিভঙ্গিতে বড়সড় পরিবর্তন আনে।
“ইসরায়েলকে আমি আর ‘আমার দেশ’ মনে করতে পারিনি,” বলেন ফান্নি।
🏘️ মরক্কোয় যারা রয়ে গেছেন: ক্ষয়িষ্ণু কিন্তু বেঁচে থাকা ইতিহাস
আজ মরক্কোতে প্রায় ২০০০ ইহুদি রয়েছেন, যদিও এক সময় এই সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৫০ হাজারের বেশি। কাসাব্লাঙ্কা, ফেজ, মারাকেশ ও এসাওইরায় এখনও কিছু ইহুদি পরিবার ও উপাসনালয় রয়েছে।
হাইম ক্রেসপিন নামের এক স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, “আমার পরিবার ছিল মরক্কোর সন্তান। রাজনীতি নয়, বাস্তব জীবনের চাহিদা আমাদের এখানেই রেখেছে।”
মরক্কো সরকার ইহুদি ঐতিহ্য সংরক্ষণে অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে:
- ১৯৯৭ সালে আফ্রিকার প্রথম ইহুদি জাদুঘর স্থাপন
- ১৬৭টির বেশি কবরস্থান ও উপাসনালয় পুনর্নির্মাণ
- ২০১১ সালের সংবিধানে হিব্রু ঐতিহ্যকে স্বীকৃতি
তবু লেখক জ্যাকব কোহেন বলেন, “রক্ষণাবেক্ষণ দিয়ে ঐতিহ্য বাঁচে না—প্রাণবন্ত সম্প্রদায়ের অভাবেই এটি একদিন বিলুপ্ত হবে।
হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনার মর্মন্তুদ স্মৃতি
‘অপারেশন ইয়াচিন’ ছিল শুধু একটি অভিবাসন কর্মসূচি নয় বরং একটি শতাব্দীপ্রাচীন সভ্যতার শেষ অধ্যায়। মরক্কো যেমন হারিয়েছে এক বিপুল জনসম্পদ ও ঐতিহ্য, তেমনি ইহুদি সম্প্রদায় হারিয়েছে তাদের শিকড়, সংস্কৃতি ও ইতিহাস।
ফান্নি মারগুই একবাক্যে বলেন, “এটা ছিল এমন এক বাড়ি থেকে দৌড়ে পালানো, যেখানে আগুন লেগে গেছে। সবাই ছুটছিল। আমিও।”

