গাজায় রক্তপাত ও ধ্বংসযজ্ঞের মাঝেই নতুন করে আলোচনার দরজা খুলেছে। হামাস ঘোষণা করেছে, তারা সর্বশেষ যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছে এবং আলোচনায় ফিরতে প্রস্তুত। কিন্তু ইসরায়েলের পক্ষ থেকে যুদ্ধ থামানোর কোনো সদিচ্ছার ইঙ্গিত এখনও নেই।
হামাস সোমবার এক বিবৃতিতে জানায়, কাতার ও মিশরের মধ্যস্থতায় যেই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, তারা সেটি মেনে নিয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে জানা গেছে, ইসরায়েলও এই প্রস্তাবের বিষয়টি হাতে পেয়েছে। সূত্রের বরাতে আল জাজিরা জানিয়েছে, পরিকল্পনায় ৬০ দিনের জন্য সামরিক অভিযান বন্ধ রাখার বিষয়টি রয়েছে। এই সময়ে ইসরায়েলি সেনারা পিছু হটবে এবং মানবিক সাহায্য প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হবে। পাশাপাশি, একই সময়সীমার মধ্যে ৫০ জন ইসরায়েলি বন্দির অর্ধেককে ফিলিস্তিনি বন্দিদের সঙ্গে বিনিময়ের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
হামাসের এই ঘোষণার আগে কায়রোতে কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানি ও মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ সিসির বৈঠক হয়। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, হামাস পূর্বেও একাধিকবার অস্ত্রবিরতি ও বন্দি বিনিময়ে রাজি হয়েছিল, কিন্তু ইসরায়েল সেসব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে যুদ্ধ চালিয়ে গেছে। মূল দ্বন্দ্ব রয়ে গেছে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ঘিরে। হামাস স্থায়ী সমাপ্তি চাইলেও ইসরায়েল বারবার অস্থায়ী বিরতির কথা বলেছে, যাতে পরবর্তীতে আবার হামলা চালানো যায়।
বর্তমানে ইসরায়েলি সেনারা গাজা সিটিতে প্রবেশের পরিকল্পনা করছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ঘোষণা দিয়েছেন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সেনাপ্রধানের সঙ্গে বৈঠকে তারা এ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার ভাষায়, “হামাস এখন প্রবল চাপের মধ্যে আছে।” প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল ক্যাটজ বলেন, হামাস কেবল এই চুক্তির কথা বলছে কারণ তারা ভয় পেয়েছে ইসরায়েল সত্যিই গাজা দখল করতে যাচ্ছে।
অন্যদিকে কট্টরপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ প্রকাশ্যে যুদ্ধবিরতির বিরোধিতা করেছেন। তার দাবি, “হামাস টিকে থাকার শেষ চেষ্টা করছে। তাই এখনই থামা মানে তাদের নতুন করে শক্তি জোগানো।”
কিন্তু ভেতরে ভেতরে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জনবল সংকটে পড়েছে। বারবার নতুন সৈন্য ডাকার ঘোষণা দেওয়া হলেও প্রয়োজনীয় সংখ্যক সেনা জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছে তারা।
গাজায় পরিস্থিতি ভয়াবহ। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো আগেই সতর্ক করেছে, দুই মিলিয়নের বেশি মানুষের জীবন বিপন্ন। খাদ্য সংকট, চিকিৎসা সংকট ও অনাহারে প্রতিদিনই নতুন মৃত্যু ঘটছে। জানুয়ারিতে কাতার, মিশর ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও মার্চে ইসরায়েল একতরফাভাবে তা ভঙ্গ করে এবং সাহায্য সরবরাহের পথ বন্ধ করে দেয়। তারপর থেকে অন্তত ২৬০ জন ফিলিস্তিনি অনাহারে মারা গেছেন।
মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাদর আবদেলাত্তি সোমবার রাফাহ সীমান্ত পরিদর্শন শেষে বলেন, “বর্তমান অবস্থা কল্পনারও বাইরে। আমরা চাই উভয় পক্ষের ওপর সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ করে দ্রুত একটি চুক্তি নিশ্চিত করতে।”
জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল-আরিয়ান মন্তব্য করেছেন, অতীতে যেমন দেখা গেছে, আসল বাধা হচ্ছে ইসরায়েলের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। তিনি বলেন, “ইসরায়েল যে হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে, তা একেবারেই নজিরবিহীন। ইতিহাস বলছে—গণহত্যা সাধারণত আলোচনায় শেষ হয় না, শেষ হয় বাইরের চাপ ও হস্তক্ষেপের মাধ্যমে। সেই আন্তর্জাতিক চাপ এখনো আসেনি।”
এমন বাস্তবতায় অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গাজায় “অনাহারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের” অভিযোগ তুলেছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েল সচেতনভাবেই খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে মানুষকে অনাহারে ঠেলে দিচ্ছে।
সবশেষ খবর অনুযায়ী, নতুন করে আলোচনার তারিখ নির্ধারণের চেষ্টা চলছে। কাতার ও মিশর বারবার চেষ্টা করলেও এখন পর্যন্ত কোনো স্থায়ী সমাধান আসেনি। গাজার মানুষ প্রতিদিন মৃত্যুর ভেতর দিয়ে বেঁচে আছে, অথচ যুদ্ধ থামানোর স্পষ্ট কোনো আলোর রেখা এখনও দেখা যাচ্ছে না।

