ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতায় নির্মাণাধীন একটি গুদাম ভবন ধসের ঘটনা নতুন করে নির্মাণ নিরাপত্তা ও তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। তারাতলা এলাকায় ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১০ জনে পৌঁছেছে। বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও একজন আহত ব্যক্তির মৃত্যু হলে প্রাণহানির সংখ্যা বাড়ে।
দুর্ঘটনার প্রায় একদিন পরও উদ্ধারকাজ অব্যাহত রয়েছে। প্রশাসনের আশঙ্কা, ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও কেউ আটকে থাকতে পারেন। সেই কারণেই উদ্ধারকারীরা সময়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন।
বুধবার বিকেলে ভবনটি ধসে পড়ার পর মুহূর্তেই চারপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নির্মাণকাজে নিয়োজিত বহু শ্রমিক তখন সেখানে অবস্থান করছিলেন বলে স্থানীয়দের দাবি। ফলে শুরু থেকেই হতাহতের সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। ধ্বংসস্তূপের ভেতরে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায় দমকল বাহিনী, পুলিশ, চিকিৎসক দল এবং বিশেষ উদ্ধারকারী ইউনিট।
প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে মোট ৩০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে তাদের অনেকের অবস্থাই গুরুতর। হাসপাতালে ভর্তি কয়েকজনের শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহল আশঙ্কা করছে।
উদ্ধার অভিযানে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারও নজর কেড়েছে। সেনাবাহিনীর বিশেষ অনুসন্ধান যন্ত্রের মাধ্যমে ধ্বংসস্তূপের নিচে কোনো মানুষের উপস্থিতি, নড়াচড়া কিংবা জীবনের সংকেত পাওয়া যায় কি না, তা পরীক্ষা করা হচ্ছে। উদ্ধারকারীরা বলছেন, সম্ভাব্য জীবিত কাউকে খুঁজে বের করার সুযোগ শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযান বন্ধ করা হবে না।
নিহতদের মধ্যে কয়েকজনের পরিচয় ইতোমধ্যে নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে এখনও দুইজনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। প্রশাসন তাদের পরিচয় নিশ্চিত করতে কাজ করছে।
এই দুর্ঘটনা শুধু প্রাণহানির কারণেই নয়, বরং নির্মাণ প্রকল্পে নিরাপত্তা মানদণ্ড কতটা অনুসরণ করা হচ্ছে, সেই প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের অভিযোগ, নির্মাণস্থলে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চাইছে না প্রশাসন।
রাজ্য সরকারের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভবনটি কেন ধসে পড়ল, তার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করতে তদন্ত শুরু হয়েছে। নির্মাণসামগ্রীর মান, নকশাগত ত্রুটি, প্রকৌশলগত ভুল কিংবা নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘনের মতো সম্ভাব্য সব দিক খতিয়ে দেখা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত নগরায়নের ফলে বড় বড় নির্মাণ প্রকল্প বাড়লেও নিরাপত্তা তদারকি অনেক ক্ষেত্রে সমানতালে শক্তিশালী হয়নি। ফলে মাঝেমধ্যেই এমন দুর্ঘটনা ঘটছে, যা কেবল অবকাঠামোগত ব্যর্থতা নয়, মানবিক বিপর্যয়েও পরিণত হচ্ছে।
কলকাতার এই গুদাম ধসও সেই বাস্তবতার একটি নির্মম উদাহরণ। এখন সবার নজর উদ্ধার অভিযানের দিকে। কারণ ধ্বংসস্তূপ পুরোপুরি সরানোর আগে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র স্পষ্ট হবে না। একই সঙ্গে তদন্তের ফলাফলই বলে দেবে এটি কেবল একটি দুর্ঘটনা ছিল, নাকি এর পেছনে ছিল অবহেলা ও নিরাপত্তাহীনতার দীর্ঘ ছায়া।

