ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে জন্মহার ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রতি নারীর গড় সন্তান সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মাত্র ১.৪১। টানা তিন বছর ধরে এই হার কমছে এবং ৯০ বছরের রেকর্ডে এটিই সবচেয়ে নিচু অবস্থান। অথচ একটি দেশকে জনসংখ্যার বর্তমান স্তরে ধরে রাখতে প্রয়োজন অন্তত ২.১ হার।
এর মানে দীর্ঘ মেয়াদে যুক্তরাজ্যের জনসংখ্যা কমতে শুরু করবে, যা কেবল জনসংখ্যাগতই নয়, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দিক থেকেও এক বড় চ্যালেঞ্জ। কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বাধীন লেবার সরকার এমনিতেই অভিবাসন নিয়ে তীব্র চাপের মুখে রয়েছে, তার ওপর অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে। নতুন এই জন্মহার–সংকট দুই বিষয়কেই আরও জটিল করে তুলেছে।
কেন কমছে জন্মহার?
অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিকস (ওএনএস) জানায়, ব্রিটেনে মানুষ আগের তুলনায় দেরিতে সন্তান নিচ্ছে। এখন নতুন মায়ের গড় বয়স ৩১, যা দুই দশক আগে ছিল ২৯। বাবাদের গড় বয়সও বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৪।
এ প্রবণতার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা দেখাচ্ছেন—আকাশছোঁয়া বাসাভাড়া, শিশু যত্নের খরচ, এবং চাকরির অনিশ্চিত বাজার। উপরন্তু, ব্যবসায়ীরা করের চাপ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভুগছে। বিশেষ করে নিয়োগদাতাদের ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স অবদানের বৃদ্ধি কিছু খাতের চাকরির বাজারে সরাসরি আঘাত হেনেছে।
স্বল্পমেয়াদি প্রভাব
অর্থনীতিবিদদের মতে, স্বল্পমেয়াদে জন্মহার কমা ব্রিটেনের অর্থনীতিতে সামান্য স্বস্তি আনতে পারে। কারণ একটি শিশুর প্রথম ১৬ বছর রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে নির্ভরশীল। ফলে স্বল্প সময়ের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতের ওপর চাপ কিছুটা কমবে।
কিছু বিশ্লেষক বলছেন, সন্তান কম থাকলে তরুণ প্রজন্মের হাতে বাড়তি অর্থ খরচের সুযোগ তৈরি হয়, যা খরচযোগ্য আয়ের বাজারকে সাময়িকভাবে চাঙা করতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি সংকট
তবে দীর্ঘ মেয়াদে চিত্র ভিন্ন। কম জন্মহার মানে ধীরে ধীরে শ্রমশক্তি সংকুচিত হওয়া। অথচ আয়ু বাড়ছে, ফলে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী কমে যাবে আর অবসরপ্রাপ্তদের সংখ্যা বাড়বে।
২০২০ সালে প্রতি হাজার কর্মীর বিপরীতে ২৮০ জন পেনশনভোগী ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৭০ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ৩৯৩। যেহেতু ব্রিটেনের রাষ্ট্রীয় পেনশন মূলত বর্তমান কর্মীদের ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স অবদানের ওপর নির্ভরশীল, তাই ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়বে।
অর্থনীতিবিদ সাইমন ফ্রেঞ্চের ভাষায়, “বেবি বুম প্রজন্মে যেভাবে বিপুল সংখ্যক মানুষ কর দিয়েছে, তা আর পুনরাবৃত্তি হচ্ছে না। আগামী দশকগুলোতে এই বৈষম্য বড় সমস্যায় রূপ নেবে।”
কেন জন্মহার অর্থনীতিকে আঘাত করে?
কারণ খুব সরল—জনসংখ্যা মানেই শ্রমশক্তি, আর শ্রমশক্তি মানেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। জনসংখ্যা কমলে অর্থনীতির আকারও ছোট হয়।
হ্যাঁ, মাথাপিছু আয় (GDP per capita) নিয়ে আলাদা আলোচনা থাকতে পারে, কিন্তু প্রবীণ নির্ভরশীলতার অনুপাত বাড়লে করের বোঝা অনিবার্যভাবেই তরুণ প্রজন্মের কাঁধে এসে পড়ে।
বর্তমানে ব্রিটেনের জন্মহার ১.৪১ হলেও, তুলনায় ফ্রান্সে ১.৬৪ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১.৬২। আফগানিস্তান ও চাদের মতো দেশগুলোতে এখনো জন্মহার ৪ থেকে ৬–এর মধ্যে।
সমাধান কী?
সরাসরি কোনো সহজ সমাধান নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হয় উৎপাদনশীলতার অলৌকিক অগ্রগতি ঘটাতে হবে, নয়তো কর বাড়ানো ও সরকারি ঋণ বাড়িয়ে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর ব্যয় সামলাতে হবে।
অভিবাসন বাড়ানো একটি পথ হতে পারে। কিন্তু যুক্তরাজ্যে অভিবাসনবিরোধী আন্দোলন এত তীব্র যে রাজনৈতিকভাবে এ পথে হাঁটা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছে। লেবার সরকার ইতিমধ্যেই শরণার্থী পরিবারের পুনর্মিলন প্রকল্প স্থগিত করেছে, কারণ ডানপন্থী দলগুলোর উত্থান ক্রমশ জনমতকে চাপের মুখে ফেলছে।
নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন রিফর্ম ইউকে দল স্পষ্টতই অভিবাসন কমানোর পক্ষে। তাদের মতে, সমাধান হলো ব্রিটিশদের আরও বেশি সন্তান নিতে উৎসাহ দেওয়া। এজন্য তারা দুই-সন্তান ভাতার সীমা তুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, পাশাপাশি বিবাহিত দম্পতিদের জন্য বাড়তি কর ছাড়ের আশ্বাসও দিয়েছে।
ব্রিটেনে জন্মহার কমার ফলে আপাতত কিছু আর্থিক স্বস্তি মিললেও দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনীতি ও সমাজ উভয়ের জন্য বড় সংকট ডেকে আনবে। আগামী প্রজন্মকে টিকিয়ে রাখতে সরকারকে একদিকে যেমন জনসংখ্যাগত ভারসাম্য রক্ষায় উদ্যোগ নিতে হবে, অন্যদিকে রাজনৈতিক সাহস দেখাতে হবে—হোক তা অভিবাসন, পরিবারনীতি কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ক্ষেত্রে।

