ওয়াশিংটনে সোমবার আবারও মুখোমুখি হচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এ বছরের এটি তাদের চতুর্থ বৈঠক। গাজায় প্রায় দুই বছরের ধ্বংসযজ্ঞের পর “পরবর্তী শাসন কাঠামো” নিয়ে আলোচনার এ বৈঠককে ঘিরে বিশ্বজুড়ে দৃষ্টি এখন হোয়াইট হাউসে।
ট্রাম্প নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যাল-এ রোববার লিখেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে আসছে “অসাধারণ পরিবর্তন” এবং “একটি বিশেষ সমাধান”। তিনি একাধিকবার বলেছেন—এখন সময় এসেছে যুদ্ধ থামানোর।
অন্যদিকে নেতানিয়াহু ফক্স নিউজকে জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে তিনি এই নতুন পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছেন।
“ডে-আফটার” পরিকল্পনা: কী আছে প্রস্তাবে
গত সপ্তাহে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) পাশ্বচরিত বৈঠকে আরব ও মুসলিম নেতাদের সামনে উপস্থাপিত হয় ২১ দফার একটি পরিকল্পনা, যা এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
পরিকল্পনায় বলা হয়েছে:
-
গাজায় বন্দি থাকা অবশিষ্ট ৪৮ জনকে মুক্তি দিতে হবে, যাদের মধ্যে প্রায় ২০ জন জীবিত বলে ধারণা।
-
হামাস যোদ্ধারা চাইলে গাজা ছাড়তে পারবে বা অস্ত্র ত্যাগ করলে ক্ষমা পাবে।
-
ক্ষুধায় বিপর্যস্ত গাজায় মানবিক সাহায্য ঢুকতে দেওয়া হবে।
-
কিছু ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হবে।
-
ইসরায়েলি বাহিনী ধাপে ধাপে প্রত্যাহার শুরু করবে।
তবে হামাস বলছে, মিসর বা কাতার থেকে তারা কোনো নতুন প্রস্তাব পায়নি। কাসাম ব্রিগেডস দাবি করেছে, গাজা সিটিতে বন্দি রাখা দুজন ইসরায়েলির সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে—যখন ইসরায়েলি বাহিনী স্থল ও আকাশপথে নতুন হামলা চালাচ্ছে, প্রতিদিন নিহত হচ্ছেন অসংখ্য সাধারণ ফিলিস্তিনি।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা
এই পরিকল্পনা মেনে নিলে নেতানিয়াহু তাঁর ডানপন্থী জোটের সঙ্গে সরাসরি দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়বেন। কারণ পরিকল্পনায় ভবিষ্যতে একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে, যা ইসরায়েলের চরমপন্থী নেতারা কোনোভাবেই মেনে নিতে রাজি নন।
অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ ও জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির—দুজনই পরিকল্পনার কড়া সমালোচনা করেছেন। তারা গাজাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে সেখানে আবার অবৈধ ইসরায়েলি বসতি গড়ার পক্ষপাতী। এর আগে তারা খাদ্য, পানি, ওষুধ বন্ধ করে গাজাকে অনাহারে ঠেলে দিয়েছিল।
এই দুই নেতার দলে ১৩টি আসন আছে, যা প্রত্যাহার করলে নেতানিয়াহুর সরকার টালমাটাল হয়ে পড়তে পারে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, তারা আপাতত জোট ভাঙবেন না, কারণ গাজায় সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকায় তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এখনও আংশিক পূরণ হচ্ছে।
ট্রাম্পের পরিকল্পনায় নতুন শাসন কাঠামো
ট্রাম্পের প্রস্তাবে একটি নতুন সংস্থা গঠন করার কথা বলা হয়েছে—গাজা ইন্টারন্যাশনাল ট্রানজিশনাল অথরিটি এটি কয়েক বছর গাজা পরিচালনা করবে। ধারণা করা হচ্ছে, সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারকে এই সংস্থার নেতৃত্বে বসানো হতে পারে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী—
-
সংস্থাটি শুরুতে মিসর বা গাজার বাইরে কোনো জায়গা থেকে পরিচালিত হবে।
-
আন্তর্জাতিক বোর্ডে থাকবেন জাতিসংঘের কর্মকর্তা, মিসরের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী এবং মুসলিম সদস্যরা।
-
এর অধীনে পাঁচজন কমিশনার মানবিক কার্যক্রম, পুনর্গঠন, আইন প্রণয়ন, নিরাপত্তা ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় দেখবেন।
-
স্থানীয়ভাবে দায়িত্ব পালন করবে ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটদের একটি দল।
-
সীমান্ত, উপকূল ও নিরাপত্তা ঘাঁটি নিয়ন্ত্রণ করবে বহুজাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী।
প্রথম বছরে সংস্থার জন্য ৯ কোটি ডলারের বাজেট ধরা হয়েছে, যা দুই বছরের মধ্যে বেড়ে ১৬ কোটি ডলারের বেশি হবে। তবে এই অঙ্কে গাজার পুনর্গঠন ও মানবিক সহায়তার ব্যয় ধরা হয়নি।
ট্রাম্পের প্রস্তাব আপাতত খসড়া পর্যায়ে। এটি কার্যকর হতে গেলে শুধু হামাস ও ইসরায়েলের নয়, আন্তর্জাতিক সমর্থনও লাগবে। এমনকি জাতিসংঘের ম্যান্ডেটও নিতে হবে।
কিন্তু গাজার মাটিতে প্রতিদিন যখন বোমা পড়ছে, শিশুরা অনাহারে মারা যাচ্ছে, ঘরবাড়ি ধ্বংস হচ্ছে—তখন কাগুজে পরিকল্পনার বাইরে কতটা বাস্তব পরিবর্তন আসবে, সেটাই এখন মূল প্রশ্ন।

