আমেরিকান সমাজে পালাবদল ঘটেছে— ঐতিহ্যগতভাবে ইসরায়েল পক্ষপাতি যুক্তরাষ্ট্রের জনমতে এবার দেখা গেছে ইসরায়েলবিরোধী মনোভাব লক্ষণীয়। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ও সিয়েনা ইউনিভার্সিটির যৌথ জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে, যা বিশেষ চিন্তার কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
জরিপে স্পষ্ট হয়েছে যে এখন আমেরিকান ভোটারদের বড় অংশ ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত আর্থিক ও সামরিক সহায়তা দেওয়া থেকে বিরত থাকতে চাইছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ওই হামলার পর যে প্রথম প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছিল—তার থেকে ধীরে ধীরে জনমত বদলে গিয়েছে এবং গাজার সংঘাতের চলমান পরিস্থিতি এতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
সব মিলিয়ে জরিপের প্রধান ফলাফলগুলো এমন—আগের তুলনায় ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতি বেড়েছে এবং ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন কমে এসেছে। ৭ অক্টোবরের পরে যে জরিপগুলোতে দেখা গিয়েছিল তখন মার্কিন ভোটারের ৪৭ শতাংশ ইস্রায়েলের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং ২০ শতাংশ ফিলিস্তিনিদের পক্ষে ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক জরিপে ইস্রায়েলকে সমর্থন জানায় ৩৪ শতাংশ, আর ফিলিস্তিনিদের পক্ষে সাড়া দিয়েছে ৩৫ শতাংশ। একই সঙ্গে প্রশ্নে নিরপেক্ষ থেকেছে ৩১ শতাংশ উত্তরদাতা।
জরিপটি ২২—২৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ইংরেজি ও স্প্যানিশ ভাষায় পরিচালিত হয় এবং এতে ১,৩১৩ জন অংশ নেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমীক্ষার ফল থেকে বোঝা যায় যে বেশিরভাগ মার্কিনি এখন মনে করেন ইসরায়েলকে অতিরিক্ত আর্থিক বা সামরিক সহায়তা পাঠানো উচিত নয়; এবং অধিকাংশই ইসরায়েলের উচিত যুদ্ধে বিরতি আনা—এমন মনোভাব ব্যক্ত করেছেন, যদিও সব জিম্মি ছাড়া বা হামাসের নির্মূল না হওয়া পর্যন্তই কিমানটা কড়া সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে তা ভিন্ন আলোচনা।
আরেক জরুরি ফল হলো—অনেক মার্কিনি মনে করছেন ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে গাজার বেসামরিক নাগরিকদের মারছেন; এই ধারনার সমর্থক সংখ্যা ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণে উঠে এসেছে। এ কথা জরিপ বিশ্লেষকরা বিশেষভাবে নজর দিচ্ছেন।
রাজনৈতিক বিভাজনেও পরিবর্তন দৃশ্যমান। তরুণ ভোটাররা—দলমত নির্বিশেষে—ইসরায়েলকে আর বড় পরিসরে সহায়তা দিতে রাজি নয়; ৩০ বছরের নিচে প্রতিটি দশ জনের সাতজনই বলছেন তারা ইসরায়েলের আর্থিক ও সামরিক সহায়তার পক্ষে নেই। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মধ্যে ফিলিস্তিনের প্রতি সহানুভূতি বেড়ে গিয়েছে অত্যন্ত দ্রুত: জরিপে দেখা গেছে ডেমোক্র্যাটিকদের মধ্যে ৫৪ শতাংশ এখন ফিলিস্তিনিদের পাশে থাকছেন, আর ইসরায়েলকে সমর্থন করছেন মাত্র ১৩ শতাংশ। ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে প্রায় আট-দশকই মনে করছেন—even if objectives not fully met—ইসরায়েলকে সবশ্রেণীর লক্ষ্য অর্জন না হওয়া সত্ত্বেও যুদ্ধ থামাতে হবে।
রিপাবলিকানদের মধ্যেও সমর্থন কমেছে; ২০২৩ সালে যেখানে ৭৬ শতাংশ রিপাবলিকান ইসরায়েলের পক্ষে ছিল, এখন তা দাঁড়িয়েছে ৬৪ শতাংশে। এখন একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রিপাবলিকানও বলছে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গাজার বেসামরিকদের সুরক্ষায় যথেষ্ট চেষ্টা করছে না।
জরিপ বিশ্লেষকেরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন—এভাবে জনমত পরিবর্তিত থাকলে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সম্পর্কেও চাপ সৃষ্টি হতে পারে; এমনকি রাজনৈতিক স্তরে মিত্র সম্পর্ক পুনর্বিবেচনার সম্ভাবনা তুল্যভাবে বাড়তে পারে। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ১৯৪৮ সাল থেকে ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র বলে মনে করা হলেও, সাম্প্রতিক জনমত দেখাচ্ছে সেব্যাপারে দীর্ঘমেয়াদি অটল সমর্থন এখন আর নিশ্চিত নয়।
একেই ঘিরে এক গ্রাস্তিভাব থেকেই আলোচনার জায়গা তৈরি হয়েছে—কেন এত দ্রুত ও গভীরভাবে মেরুকরণ ঘটল? সাম্প্রতিক সংঘাতের ছবি, বেসামরিক মৃত্যুর সংখ্যা ও মানবিক সংকটের চিত্র তরুণদের ও নাগরিক সমাজকে প্রভাবিত করেছে—এগুলো জরিপের উত্তরগুলোতে প্রতিফলিত হচ্ছে। বহু সাধারণ নাগরিক জানিয়েছেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা দেখতে পাচ্ছেন সংঘাতে নিরসন না হলে ন্যায়বিচার ও মানবিক ভিত্তি কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে; এবং সেটাই তাদের মর্জি বদলে দিয়েছে।
বিশ্যালোকায় এ জরিপের ফলাফল রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের বরাবরই ভাবাচ্ছে—যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিকভাবে ইসরায়েলপন্থী কৌশল ও বহুমাত্রিক কূটনৈতিক অবস্থান এখন কি বদলাবে? আগামী দিনে এ প্রশ্নই সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবে।

