যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে বুধবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ব্যাপক শুল্ক প্রয়োগ নিয়ে তীব্র প্রশ্নের মুখে পড়তে দেখা গেছে। এই মামলাটি শুধু ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির পরীক্ষা নয়, বরং দেশের অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। সূত্র: বিবিসি
বিচারপতিদের বেশিরভাগই হোয়াইট হাউসের আমদানি শুল্ক আরোপের যুক্তি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। এদের মধ্যে অনেকেই রক্ষণশীল হলেও- তারা প্রেসিডেন্টের দাবি—যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনশীলতা পুনরুদ্ধার এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে শুল্ক প্রয়োজন—প্রকৃতপক্ষে কতটা যৌক্তিক তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
একাধিক ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং কয়েকটি অঙ্গরাজ্য এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। তাদের অভিযোগ, প্রেসিডেন্ট তার সাংবিধানিক ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করে কার্যত করের সমতুল্য শুল্ক আরোপ করেছেন। তারা মনে করেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া নেওয়া যায় না।
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট সাধারণত বড় সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে কয়েক মাস সময় নেয়। তবে এই মামলায় অনেকেই আশা করছেন, আদালত দ্রুত রায় দিতে পারে। এই মামলা ট্রাম্প প্রশাসনের প্রেসিডেন্ট ক্ষমতা সম্প্রসারণ প্রচেষ্টার প্রথম বড় পরীক্ষা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
বিচারপতি অ্যামি কনি ব্যারেট, যিনি ট্রাম্পের দ্বারা নিয়োগপ্রাপ্ত, শুনানিতে প্রশ্ন তোলেন, “তাহলে কি আপনার বক্তব্য এই যে প্রতিটি দেশকেই প্রতিরক্ষা ও শিল্পের জন্য হুমকি বিবেচনা করে শুল্ক আরোপ করতে হয়েছে? যেমন স্পেন বা ফ্রান্স?” ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়, কিছু দেশের ক্ষেত্রে তা বোঝা যায়, তবে কেন একাধিক দেশকে একই সঙ্গে শুল্কের আওতায় আনা হয়েছে, তার যুক্তি উপস্থাপন করতে হয়।
বিলিয়ন ডলারের শুল্ক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। যদি ট্রাম্প প্রশাসন মামলায় হেরে যায়, তাহলে সংগৃহীত অর্থের বড় অংশ ফেরত দিতে হবে। বিচারপতি ব্যারেট বলেন, এটি হতে পারে “সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি।”
শুনানিতে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট, বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক এবং মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, আদালত যদি তাদের পক্ষে রায় না দেয়, তবে বিকল্প পথ অনুসরণ করা হবে।
শুনানির আগে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট একটি বিবৃতিতে বলেন, “হোয়াইট হাউস সবসময়ই ‘প্ল্যান বি’-এর জন্য প্রস্তুত থাকে।”
মামলাটি ১৯৭৭ সালের ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ার্স (আইইইপিএ) আইন-কে কেন্দ্র করে করা হয়েছে। এই আইনের আওতায় জরুরি পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্টকে বাণিজ্য “নিয়ন্ত্রণের” ক্ষমতা দেয়া হয়। ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প প্রথমবার আইইইপিএ ব্যবহার করে চীন, মেক্সিকো এবং কানাডো থেকে আসা পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করেন। তার যুক্তি, এসব দেশ থেকে পাচার হওয়া মাদক যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি “জরুরি অবস্থা” তৈরি করেছে।
এরপর এপ্রিল মাসে ট্রাম্প একই আইন প্রয়োগ করে বিশ্বের প্রায় সব দেশের পণ্যের ওপর ১০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের নির্দেশ দেন। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি—রপ্তানির তুলনায় আমদানি বেশি হওয়া—“অসাধারণ এবং অস্বাভাবিক হুমকি” সৃষ্টি করছে। গ্রীষ্মজুড়ে এই শুল্কগুলো ধীরে ধীরে কার্যকর হয়, যখন যুক্তরাষ্ট্র অন্যান্য দেশকে “চুক্তি করতে” চাপ দিচ্ছিল।
ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তি দেয়, বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতার মধ্যে শুল্ক আরোপের ক্ষমতাও অন্তর্ভুক্ত। তাদের যুক্তি, দেশটি একাধিক “দেশ-ধ্বংসকারী ও অস্থিতিশীল” সংকটের মুখোমুখি, যা প্রেসিডেন্টের জরুরি পদক্ষেপকে যৌক্তিক করে।
প্রশাসনের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন সলিসিটর জেনারেল জন সাউয়ার। তিনি সতর্ক করেন, যদি আদালত ট্রাম্পের শুল্ক ক্ষমতাকে অবৈধ ঘোষণা করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র “নিষ্ঠুর বাণিজ্য প্রতিশোধের” মুখোমুখি হবে এবং এর ফলে “অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তার ধ্বংসাত্মক পরিণতি” দেখা দিতে পারে।

বিচারপতিদের প্রশ্ন থেকে বোঝা গেছে, তারা ভবিষ্যতের প্রভাব নিয়ে গভীরভাবে ভাবছেন। প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস বলেন, “এই যুক্তিটি এমন এক ক্ষমতা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে যা প্রেসিডেন্টকে যেকোনো দেশ থেকে, যেকোনো পণ্যের ওপর, যেকোনো পরিমাণে এবং অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য শুল্ক আরোপের সুযোগ দেয়।”
মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী, কর আরোপের ক্ষমতা কংগ্রেসের। আদালত সবসময় এই ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করে এসেছে। রক্ষণশীল বিচারপতি নিল গোরসাচ প্রশ্ন তুলেছেন, যদি আদালত ট্রাম্পের পক্ষে রায় দেয়, “তাহলে বিদেশি বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের সমস্ত দায়িত্ব ত্যাগ করতে কংগ্রেসকে কী বাধা দেবে?” তিনি বলেন, সাউয়ারের যুক্তি গ্রহণের যৌক্তিক কারণ তিনি খুঁজে পাচ্ছেন না।
তিনি আরো উদাহরণ দিয়ে বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের অস্বাভাবিক হুমকি মোকাবিলার অজুহাতে প্রেসিডেন্ট কি বিদেশ থেকে গ্যাসচালিত গাড়ি ও অটো পার্টসের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করতে পারেন?”
চ্যালেঞ্জ জানানো অঙ্গরাজ্য ও বেসরকারি গোষ্ঠীর আইনজীবীরা যুক্তি দেন, আইইইপিএ-তে কোথাও শুল্ক শব্দের উল্লেখ নেই। তাদের মতে, কংগ্রেস কখনো প্রেসিডেন্টকে এমন অসীম ক্ষমতা দিতে চায়নি। বেসরকারি ব্যবসার পক্ষে নিল কাটিয়াল বলেন, আইনটি প্রেসিডেন্টকে বাণিজ্য বন্ধ করার ক্ষমতা দেয়, তবে রাজস্ব আদায়ের জন্য নয়।
সরকারের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল যুক্তি দেন, শুল্ককে কর নয়, বরং প্রেসিডেন্টকে প্রদত্ত নিয়ন্ত্রণমূলক ক্ষমতার “স্বাভাবিক সম্প্রসারণ” হিসেবে দেখা উচিত। তিনি বলেন, “আমি যতই বলি কম হবে—এটি নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, কর নয়।” রাজস্ব আদায়ের দিকটি “কেবল ঘটনাচক্রে” ছিল, যদিও ট্রাম্প প্রায়শই শুল্ক থেকে আদায় করা অর্থ নিয়ে গর্ব প্রকাশ করেছেন।
শুল্ক এবং করের পার্থক্য বিচারপতিদের কাছে বড় প্রশ্ন। বিচারপতি সোনিয়া সোটোমেয়র মন্তব্য করেন, “আপনি বলতে চান শুল্ক কর নয়, কিন্তু বাস্তবে সেটাই তো কর।” অন্যদিকে, কিছু বিচারপতি জাতীয় নিরাপত্তা এবং বৈদেশিক নীতির প্রেক্ষাপটেও সীমা আরোপের যৌক্তিকতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।
বিচারপতি ব্রেট ক্যাভানফ বলেন, প্রেসিডেন্টকে বাণিজ্য বন্ধ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু এক শতাংশ শুল্ক আরোপ করতে না পারা “কমন সেন্স” বলে মনে হয় না।
ওয়েলস ফার্গোর বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইতোমধ্যেই প্রায় ৯০ বিলিয়ন ডলারের আমদানি শুল্কে মামলার প্রভাব পড়েছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এটি যুক্তরাষ্ট্রের মোট শুল্ক আয়ের প্রায় অর্ধেক। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, যদি আদালত জুন পর্যন্ত রায় দিতে দেরি করে, তবে এই অঙ্ক এক ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
বুধবারের শুনানি প্রায় তিন ঘণ্টা চলেছে, যা বিচারপতিদের বরাদ্দ সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। পূর্ণ আদালতের রায় ট্রাম্পের পক্ষে গেলে, প্রশাসনের বিপক্ষে নিম্ন আদালতের তিনটি রায় বাতিল হবে।
আদালতের বাইরে সিঁড়িতে বসে ছিলেন সারাহ ওয়েলস ব্যাগসের প্রধান নির্বাহী সারাহ ওয়েলস। তার প্রতিষ্ঠান স্তন্যপান যন্ত্র ও অন্যান্য সরঞ্জাম তৈরি করে, যার বেশিরভাগই বিদেশে উৎপাদিত। শুল্কের কারণে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ২০ হাজার ডলার অপ্রত্যাশিত খরচে পড়েছে। সরবরাহ চেইন পরিবর্তনের চেষ্টা করেও পণ্য আমদানি বন্ধ করতে হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মজুত ফুরিয়ে গেছে, নতুন পণ্যের মান উন্নয়ন স্থগিত করা হয়েছে এবং কিছু কর্মী ছাঁটাই করা হয়েছে।
তবুও শুনানি শেষ হয়ে আসার পর ওয়েলস আশাবাদী। তিনি বলেন, “আমার মনে হয়েছে, তারা ভালোভাবে বুঝতে পেরেছেন যে প্রেসিডেন্ট আইইইপিএ আইনের আওতায় যে ক্ষমতা প্রয়োগ করেছেন, তা সীমা অতিক্রম করেছে। বিচারপতিরাও উপলব্ধি করছেন, এই ক্ষমতার লাগাম টানা প্রয়োজন।”

