নিরাপত্তা আর মর্যাদার জীবনের আশায় মিয়ানমারের রোহিঙ্গা শরণার্থীরা প্রায়ই সমুদ্রপথে পাড়ি জমান মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়ার দিকে। কিন্তু সেই স্বপ্নযাত্রাই আবারও পরিণত হলো মৃত্যুর যাত্রায়। থাইল্যান্ড-মালয়েশিয়া সীমান্তের কাছাকাছি সমুদ্রে ডুবে গেছে রোহিঙ্গাদের একটি নৌকা, যেখানে এখন পর্যন্ত ১১ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে।
রবিবার রাতে দুর্ঘটনাটি ঘটলেও সোমবার (১০ নভেম্বর) সকালে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ। ধারণা করা হচ্ছে, প্রায় ৭০ জন মানুষ ওই নৌকায় ছিলেন। এখন পর্যন্ত ১৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ১১ জন রোহিঙ্গা এবং ২ জন বাংলাদেশি নাগরিক।
থাইল্যান্ডের উদ্ধারকারী দল জানিয়েছে, তাদের জেলেদের সহায়তায় চারটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে—এর মধ্যে দুটি শিশুর লাশও রয়েছে। এর আগে মালয়েশিয়ার উপকূলীয় বাহিনী সমুদ্র থেকে সাতটি মরদেহ উদ্ধার করে।
তবে এখানেই দুঃসংবাদ শেষ নয়। উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, একই সময়ের কাছাকাছি আরেকটি নৌকা ২৩০ জন যাত্রীসহ সমুদ্রে ছিল—কিন্তু সেটির কোনো খোঁজ এখনো মেলেনি। মালয়েশিয়ার সামুদ্রিক সংস্থা জানিয়েছে, থাইল্যান্ডের সঙ্গে যৌথভাবে আকাশপথে অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য বহু বছর ধরেই দারিদ্র্য, সহিংসতা ও জাতিগত বৈষম্যের চক্রে আটকে আছে। রোহিঙ্গা মুসলিম সংখ্যালঘুরা সেখানে নাগরিক অধিকারহীন হয়ে বেঁচে আছে। ২০১৭ সালে দেশটির সেনাবাহিনীর ভয়াবহ দমন অভিযানের পর প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়, যারা এখন কক্সবাজার ও ভাসানচরের শরণার্থী শিবিরে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
এই হতাশা আর অনিশ্চয়তার মাঝেই অনেকে দালালচক্রের প্রলোভনে পা দিয়ে বিপজ্জনক সমুদ্রপথে রওনা দেন। কিন্তু খুব কম মানুষই পৌঁছাতে পারেন গন্তব্যে—বেশিরভাগের জন্য এই যাত্রা শেষ হয় মাঝসমুদ্রে।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (UNHCR) জানিয়েছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বরের প্রথম দিক পর্যন্ত মিয়ানমার ও বাংলাদেশ থেকে ৫,১০০ জনেরও বেশি রোহিঙ্গা সমুদ্রপথে পালানোর চেষ্টা করেছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৬০০ জনের মৃত্যু বা নিখোঁজের খবর পাওয়া গেছে।
সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া এসব মানুষের নাম হয়তো ইতিহাসে লেখা থাকবে না, কিন্তু তাদের হারিয়ে যাওয়া গল্পগুলো রয়ে যাবে মানবতার বিবেককে নাড়া দেওয়ার মতো এক অনন্ত প্রশ্নচিহ্ন হয়ে—কেন কেউ নিজের দেশ ছেড়ে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে অন্য দেশে আশ্রয় খুঁজে বেড়ায়?

