ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় স্থিতিশীলতা রক্ষার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক বাহিনী গঠনের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র যে প্রস্তাব নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপন করেছে, সেটি রাশিয়া, চীন এবং কয়েকটি আরব দেশের কড়া আপত্তিতে কার্যত স্থগিত হয়ে গেছে। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট রোডম্যাপ না থাকা এবং ইসরায়েলি বাহিনী কখন গাজা ছাড়বে সে বিষয়ে দৃঢ় নিশ্চয়তা না পাওয়ায় প্রস্তাবটি নিয়ে গুরুতর মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।
শুক্রবার টিআরটি ওয়ার্ল্ড এই তথ্য জানিয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, গাজায় আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী বা আইএসএফ গঠনে জাতিসংঘের অনুমোদন পেতে ওয়াশিংটন যে খসড়া দিয়েছে, তা রাশিয়া, চীন এবং বেশ কয়েকটি আরব দেশ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।
তাদের দাবি, গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক কাঠামো কীভাবে গড়ে উঠবে এবং সেখানে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের স্থান কী হবে— এই দুটি বিষয়ের অস্পষ্টতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
জাতিসংঘে আলোচনায় যুক্ত থাকা চার কূটনীতিকের বরাতে জানা গেছে, নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো-ক্ষমতাধারী রাশিয়া ও চীন স্পষ্টভাবে বলেছে— মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনায় যে “বোর্ড অব পিস” গঠনের কথা উল্লেখ আছে, সেই অংশ সম্পূর্ণভাবে খসড়া থেকে বাদ দিতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের যে সংশোধিত খসড়া বুধবার ফেরত দেওয়া হয়, তাতেও এই বোর্ডের উল্লেখ থাকায় আপত্তির মাত্রা আরও বাড়ে। তবে সমালোচনার জবাবে নতুন খসড়ায় ফিলিস্তিনের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের কথা যোগ করেছে ওয়াশিংটন।
কূটনীতিকরা বলছেন, শব্দচয়ন নিয়ে এমন বিরোধ আগেও দেখা গেছে, তবে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে গাজার বিরুদ্ধে চলমান নির্বিচার হামলা ও গণহত্যার পর এই আপত্তিগুলো স্পষ্ট করে যে, গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং নিরাপত্তা পরিষদের অন্যান্য সদস্য দেশের অবস্থানের ফারাক এখন অত্যন্ত গভীর।
এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, প্রস্তাবটি “তাৎক্ষণিকভাবে” পাস হওয়া দরকার। কানাডায় জি–৭ সম্মেলন শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আলোচনায় অগ্রগতি হচ্ছে এবং গতি ধরে রাখা অপরিহার্য।
গত সপ্তাহে প্রচারিত যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম খসড়ায় গাজায় ২০২৭ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত ম্যান্ডেট নিয়ে আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা বলা হয়েছিল। সেই বাহিনী গঠিত হলে এটি বোর্ড অব পিসের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে— এমন উল্লেখ ছিল খসড়ায়।
তবে আরব দেশগুলো জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক অনুমোদন ছাড়া তারা কোনো বাহিনীতে সেনা পাঠাতে প্রস্তুত নয়। পাশাপাশি রাশিয়া, চীন ও আলজেরিয়া প্রথম খসড়াকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে। নিরাপত্তা পরিষদের প্রায় সব সদস্যই বিভিন্ন সংশোধনী জমা দিয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ দুটি প্রশ্নই আপাতত অনির্দিষ্ট— প্রস্তাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্পষ্ট রোডম্যাপ নেই এবং ইসরায়েলি সেনারা ঠিক কোন সময়সূচিতে গাজা থেকে সরে যাবে তার কোনো নিশ্চয়তাও নেই। যুক্তরাষ্ট্রের সংশোধিত খসড়ায় বলা হয়েছে, ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের সংস্কার “নিষ্ঠার সঙ্গে” সম্পন্ন হলে এবং পুনর্গঠন এগোলে ফিলিস্তিনের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একটি “বিশ্বাসযোগ্য পথ” তৈরি হবে।
আবার বলা হয়েছে, স্থিতিশীলতা বাহিনী গাজায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করলে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে নির্ধারিত “মানদণ্ড ও সময়সূচি অনুযায়ী” ইসরায়েলি বাহিনী সরে যাবে।
এ ছাড়া বেশ কয়েকটি সদস্য দেশ বোর্ড অব পিসের কাঠামো, কার্যপদ্ধতি এবং এর সদস্য কারা হবে— এসব বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও পরিষ্কার ব্যাখ্যা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাতও জানিয়েছে, বর্তমান অস্পষ্ট কাঠামোর ভিত্তিতে তারা কোনো বাহিনীতে অংশ নেবে না।

