জাতিসংঘের কপ-৩০ জলবায়ু সম্মেলন শেষ হয়েছে, কিন্তু জীবাশ্ম জ্বালানি—তেল, কয়লা ও গ্যাস—হ্রাসে কোনো বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি। দুই সপ্তাহ ধরে চলা এই আলোচনায় ৮০টির বেশি দেশ, বিশেষ করে যুক্তরাজ্য ও ইইউ, দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েও তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো আগের অবস্থানেই দৃঢ় থাকল। তাদের যুক্তি, অর্থনীতি ও উন্নয়নের জন্য জীবাশ্ম জ্বালানি এখনও অপরিহার্য।
সম্মেলনের চূড়ান্ত প্রস্তাবে কেবল দেশগুলোকে ‘স্বেচ্ছায়’ জ্বালানি কমানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। এ বছর যুক্তরাষ্ট্র কোনো প্রতিনিধিদল পাঠায়নি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অবস্থান ছিল স্পষ্ট—তিনি জলবায়ু পরিবর্তনকে ‘ভাঁওতাবাজি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
সম্মেলনের সময় নানা সমস্যাও দেখা দিয়েছে। শৌচাগারের পানি শেষ হওয়া, তীব্র বজ্রঝড়, গরম ও আর্দ্র কক্ষের কারণে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে। প্রতিবাদকারী প্রায় ১৫০ জন নিরাপত্তা অতিক্রম করে সভাস্থলে প্রবেশ করেছিল।
তবে কিছু দেশ, যেমন ভারত ও ৩৯টি ছোট দ্বীপ রাষ্ট্র, সম্মেলনের কিছু অগ্রগতি স্বীকার করেছে। দরিদ্র দেশগুলো আরও জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি চেয়েছে। ব্রাজিল ‘উষ্ণমণ্ডলীয় বন সংরক্ষণ তহবিল’ চালু করেছে, যেখানে অন্তত ৬.৫ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি এসেছে। ৯০টিরও বেশি দেশ বন উজাড় প্রতিরোধের পরিকল্পনাকে সমর্থন জানিয়েছে।
তবে জীবাশ্ম জ্বালানি কমানোর ক্ষেত্রে অনেকের হতাশা গাঢ়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অবস্থায় বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধির হুমকি বাড়বে। প্রোপাবলিকা ও দ্য গার্ডিয়ানের যৌথ বিশ্লেষণ অনুসারে, ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি—জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং নির্গমন নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা—আগামী দশকে অতিরিক্ত কার্বন নির্গমন বাড়াবে। এর ফলে ২০৩৫ সালের পরবর্তী ৮০ বছরে বিশ্বে তাপ-সংক্রান্ত মৃত্যু প্রায় ১৩ লাখে পৌঁছাতে পারে।
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হলো, সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হবে আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার উষ্ণ ও উন্নয়নশীল দেশগুলো। এই অঞ্চলের দেশগুলোর কার্বন নির্গমন তুলনামূলকভাবে কম, কিন্তু তীব্র গরম মোকাবিলার অবকাঠামো দুর্বল। ভারত ও পাকিস্তানসহ এসব দেশে গরম-সংক্রান্ত মৃত্যু দ্রুত বাড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৪ শতাংশ হলেও বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাসের ২০ শতাংশ নির্গমন করে। ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি অনুসারে প্যারিস চুক্তি থেকে বেরিয়ে তারা কয়লা, তেল ও গ্যাস উৎপাদন সহজতর করেছে, একই সঙ্গে যানবাহন, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্প খাতের নির্গমন নিয়ন্ত্রণও শিথিল হয়েছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে জলবায়ু ও মানবজীবনের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, অতিরিক্ত মৃত্যু মূলত তাপদাহ, স্ট্রোক, হৃদরোগ ও শ্বাসকষ্টের মতো তাপ-সংক্রান্ত কারণে হবে। পাশাপাশি খরা, খাদ্য সংকট, বনআগুন, রোগ বিস্তার ও অন্যান্য জলবায়ু দুর্যোগ আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

