ভেনেজুয়েলাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক সক্রিয়তা ও মাদকবিরোধী অভিযান নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মাদক পাচার দমনের নামে ক্যারিবীয় অঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর উপস্থিতি ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকায় আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ভেনেজুয়েলার আকাশপথে সক্রিয় সব বেসামরিক ফ্লাইটকে নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় সতর্ক থাকার নির্দেশ দেয়। আর এর কয়েকদিন পরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার আকাশসীমাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ বিবেচনা করার নির্দেশ দিয়ে পরিস্থিতিকে আরো উত্তপ্ত করে তোলেন। এতে ধারণা জোরালো হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র দেশটিতে সামরিক অভিযানে যেতে পারে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার লাতিন আমেরিকা সম্পাদক লুসিয়া নিউম্যান জানান, আগেই ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো অভিযোগ করেছিলেন যে ওয়াশিংটন হস্তক্ষেপের পথ তৈরির জন্য ‘অজুহাত ও মিথ্যাচার’ ছড়াচ্ছে। নিউম্যান বলেন ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান এখন স্পষ্টতই চাপ সৃষ্টির দিকে এবং আকাশসীমা বন্ধ ঘোষণা সেই প্রক্রিয়াকেই আরও এগিয়ে নিচ্ছে।
ট্রাম্প ও মাদুরোর মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনার ইঙ্গিত থাকলেও তা নিশ্চিত হয়নি। তবুও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বড় অংশ ধারণা করছেন সাম্প্রতিক সংকেত দুই নেতার আলোচনার পটভূমিতে চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবেই দেখা যাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত সোমবার ‘সোলিস কার্টেল’ নামে ভেনেজুয়েলার একটি সংগঠনকে সন্ত্রাসী মাদকচক্র হিসেবে ঘোষণা করেন এবং সরাসরি অভিযোগ তোলেন এই কার্টেল মাদুরোর প্রভাবেই পরিচালিত হয়।
পরবর্তীতে হোয়াইট হাউস জানায় ক্যারিবীয় অঞ্চলে চলমান মাদকবিরোধী অভিযান স্থলপথে পরিচালিত হবে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এ ঘোষণা কার্যত ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
জর্জিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অধ্যাপক ও ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত চার্লস স্যামুয়েল শাপিরো মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসন ধাপে ধাপে চাপ বৃদ্ধি করে মাদুরোকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করতে চাইছে। তার ভাষায়, “প্রেসিডেন্ট চান মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরাতে। তবে শেষ লক্ষ্যটি সামরিক পদক্ষেপ কি না—এখনও অনিশ্চিত।”
তিনি আরো জানান যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন কমান্ড ও প্রতিরক্ষা দপ্তর এসব প্রশ্নের জবাব দিতে না চেয়ে তা হোয়াইট হাউসে পাঠিয়ে দিচ্ছে, যা সংকটকে আরো রহস্যময় করেছে। বিশেষ করে আকাশসীমা বন্ধ ঘোষণার ব্যাখ্যায় কোনো বিস্তারিত দিকনির্দেশনা না দেওয়া বিষয়টিকে অনেকে ইরাক যুদ্ধের আগে গৃহীত সিদ্ধান্তের সঙ্গে তুলনা করছেন।
ওয়াশিংটন ডিসি থেকে আল জাজিরার প্রতিনিধি রোজিল্যান্ড জর্ডান বলেন, এই পরিস্থিতি ১৯৮০-এর শেষ দিকে ইরাকের ওপর মার্কিন আকাশ নিয়ন্ত্রণ জোরদারের ঘটনাকে মনে করিয়ে দেয়। তিনি উল্লেখ করেন ভেনেজুয়েলার কাছাকাছি মার্কিন নৌবাহিনীর একটি বিমানবাহী রণতরী ইতোমধ্যে অবস্থান করছে এবং এতে থাকা বহু যুদ্ধবিমান সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।
ক্যারিবীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির চিত্রও এখন আগের তুলনায় অনেক বিস্তৃত। চলতি বছরের আগস্ট থেকে দেশটির নৌবাহিনী সেখানে প্রায় ১০ হাজার সেনা ও যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে; যা কয়েক দশকে সর্বোচ্চ। বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড ডি ফোর্ডকেও এলাকাটিতে সরানো হয়েছে। এ রণতরীতে রয়েছে ৭৫টির বেশি যুদ্ধবিমান ও আগাম সতর্কতা সক্ষমতা সম্পন্ন উড়োজাহাজ। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের একটি ডেস্ট্রয়ার এখন ভেনেজুয়েলার নিকটবর্তী ত্রিনিদাদ উপকূলে নোঙর করা।
এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ভেনেজুয়েলার সামরিক বাহিনী উচ্চ সতর্কতায় রয়েছে। দেশব্যাপী প্রচুর সেনা মোতায়েন করা হয়েছে এবং প্রায় পাঁচ হাজার রুশ ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধপ্রস্তুত অবস্থায় রাখা হয়েছে।
ওয়াশিংটন বলছে তাদের লক্ষ্য মাদক পাচার রোধ করা, কিন্তু কারাকাসের দাবি যুক্তরাষ্ট্র সরকার পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে চাপ প্রয়োগ করছে। গত সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্র সমুদ্রপথে ভেনেজুয়েলা লক্ষ্য করে ২০টির বেশি নৌযানে হামলা চালিয়েছে যাতে ৮০ জনেরও বেশি নিহত হয়। তবে এসব নৌযান সত্যিই মাদকবাহী ছিল কি না তার কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ প্রকাশ করেনি যুক্তরাষ্ট্র।
অভিযান বৃদ্ধির পর মার্কিন বিমান কর্তৃপক্ষ ভেনেজুয়েলায় বেসামরিক বিমান পরিচালনাকারীদের সতর্ক হওয়ার নির্দেশ দিলে দক্ষিণ আমেরিকার ছয়টি বড় এয়ারলাইন্স দেশটিতে ফ্লাইট স্থগিত করে। এতে ক্ষুব্ধ কারাকাস স্পেনের আইবেরিয়া, পর্তুগালের ট্যাপ, কলম্বিয়ার অ্যাভিয়ানকা, চিলি–ব্রাজিলের লাতাম, ব্রাজিলের গোল এবং তুর্কিশ এয়ারলাইন্সকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। কারাকাসের অভিযোগ—তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে সহযোগিতা করছে।
ফলে প্রশ্ন স্পষ্ট—এ উত্তেজনা কূটনৈতিক চাপেই সীমিত থাকবে, নাকি ইরাকের মতো সংঘাতে রূপ নেবে? এখনো কেউ নিশ্চিত নয়।

