ইউরোপ এমন এক সময়ের মুখোমুখি, যেখানে আর আগের মতো আমেরিকার সামরিক ও রাজনৈতিক ভরসাকে নিশ্চিত ধরে নেওয়া যাচ্ছে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে ইউরোপ ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা, সমৃদ্ধি ও রাজনৈতিক ঐক্যের পথে এগিয়েছে, সেই কাঠামো এখন বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্যে পড়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে ন্যাটোকে বিশ্বের সবচেয়ে সফল নিরাপত্তা জোটগুলোর একটি হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু কোনো জোট এক দিনে ভেঙে পড়ে না; তার আগে ভেতরের আস্থা ক্ষয় হতে থাকে। পারস্পরিক প্রতিরক্ষার যে প্রতিশ্রুতি ন্যাটোর প্রাণ, সেটি যদি দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই জোটের বাস্তব শক্তি কমে আসতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউরোপের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—ওয়াশিংটনের ছায়া সরে গেলে মহাদেশটি কি নিজের নিরাপত্তা নিজেই সামলাতে পারবে?
ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এই প্রশ্ন আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। লেখাটির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রাম্প শুধু ন্যাটো নিয়ে সংশয়ী নন; তিনি কার্যত উত্তর আটলান্টিক জোটকে দুর্বল করার পথে এগোচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে ন্যাটো ছাড়বে কি না, সেটি এখন একমাত্র প্রশ্ন নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, যদি আমেরিকা অবহেলা, অবজ্ঞা ও অনাগ্রহের মাধ্যমে জোটকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দেয়, তাহলে ইউরোপ কী করবে?
ইউরোপের জন্য এই পরিস্থিতি কেবল সামরিক চ্যালেঞ্জ নয়; এটি রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক এবং মানসিক চ্যালেঞ্জও। কারণ, প্রায় আট দশক ধরে ইউরোপ নিজের নিরাপত্তার বড় অংশ আমেরিকার ওপর নির্ভর করে এসেছে। শীতল যুদ্ধের সময় থেকে পরবর্তী সময় পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি ইউরোপের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বড় ভূমিকা রেখেছে। সেই নিরাপত্তার ছায়াতেই অর্থনৈতিক সহযোগিতা গভীর হয়েছে, ইউরোপীয় একীকরণের পথ তৈরি হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো কাঠামো গড়ে উঠেছে।
এখানে ইতিহাসের শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপ থেকে আমেরিকার সরে যাওয়া এক ধরনের শূন্যতা তৈরি করেছিল। সেই শূন্যতার ভেতরেই জার্মান প্রতিশোধবাদ, হিটলারের উত্থান এবং শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা দেখা দেয়। লেখাটির যুক্তি হলো, যদি সেই সময় বিশ্বের প্রধান সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি ইউরোপে সক্রিয় উপস্থিতি ধরে রাখত, তাহলে জার্মান প্রতিশোধবাদ এত সহজে মাথা তুলতে পারত না।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকা সেই ভুল আর করেনি। হ্যারি এস ট্রুম্যান ইউরোপে শক্তিশালী মার্কিন উপস্থিতি বজায় রাখেন। এর একটি কারণ ছিল সোভিয়েত রেড আর্মির হুমকি, যারা তখন বার্লিনে দাঁড়িয়ে ইউরোপের কেন্দ্রস্থলে অবস্থান করছিল। আরেকটি কারণ ছিল ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে জার্মানির ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে ভয় ও সন্দেহ কমানো। আমেরিকার এই উপস্থিতি ইউরোপকে ধীরে ধীরে আরও ঘনিষ্ঠ ঐক্যের পথে হাঁটার সুযোগ দেয়।
এই পটভূমি ছাড়া আজকের ইউরোপকে বোঝা কঠিন। জার্মানির পুনরেকত্রীকরণ, ন্যাটোর পূর্বমুখী সম্প্রসারণ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিস্তার—এসব ঘটনা কেবল ইউরোপীয় ইচ্ছাশক্তির ফল নয়; এগুলোর পেছনে ছিল আমেরিকার নিরাপত্তা নিশ্চয়তা। সেই নিশ্চয়তা না থাকলে ইউরোপ হয়তো এতটা আত্মবিশ্বাসীভাবে এগোতে পারত না।
কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। ট্রাম্প ও তাঁর রাজনৈতিক আন্দোলন ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি গভীর সন্দেহ ও বিরূপতা দেখাচ্ছে। লেখাটিতে বলা হয়েছে, এই মনোভাব ইউরোপকে আবার আত্মঘাতী জাতীয়তাবাদের যুগে ঠেলে দিতে পারে। এটি শুধু ইউরোপের জন্য বিপজ্জনক নয়; আমেরিকার জন্যও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর। কারণ, শক্তিশালী, স্থিতিশীল ও ঐক্যবদ্ধ ইউরোপ আমেরিকার কৌশলগত শক্তিরও বড় অংশ ছিল।
ইউরোপ যদি দুর্বল হয়, আমেরিকাও তার কৌশলগত অংশীদার হারাবে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো বড় শক্তি একা সবকিছু সামলাতে পারে না। মিত্রতা, আস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কই বৈশ্বিক ক্ষমতার ভিত্তি তৈরি করে। সেখান থেকে সরে আসা মানে শুধু একটি জোট দুর্বল করা নয়; বরং নিজের প্রভাবক্ষেত্রকেও ছোট করে ফেলা।
এই মুহূর্তে ইউরোপের সামনে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো নিজের নিরাপত্তা নিয়ে বাস্তববাদী হওয়া। এতদিন তারা অপেক্ষা করেছে—আমেরিকা নেতৃত্ব দেবে, আমেরিকা নিরাপত্তা দেবে, আমেরিকা কৌশলগত দিকনির্দেশনা দেবে। কিন্তু এখন সেই অপেক্ষার সুযোগ কমে এসেছে। ইউরোপকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা কি নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই নির্ধারণ করবে, নাকি ভেতরের বিভাজন ও দ্বিধার কারণে নতুন বিশ্বব্যবস্থায় দুর্বল হয়ে পড়বে।
এখানে জার্মানি ও ফ্রান্সের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। লেখাটিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ইউরোপে নেতৃত্বের প্রশ্নে জার্মানি ও ফ্রান্সের বিকল্প নেই। এই দুই শক্তিশালী দেশকে এগিয়ে আসতেই হবে। কিন্তু বিষয়টি সহজ নয়। বিশেষ করে জার্মানির ক্ষেত্রে ইতিহাসের ভার অনেক বেশি। একসময় ইউরোপে আধিপত্য বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা জার্মানিকে ভয়াবহ পথে নিয়ে গিয়েছিল। তাই আজ জার্মানি নতুন নেতৃত্বের ভূমিকা নিলে তাকে অতীতের প্রতি সংবেদনশীলতা, রাজনৈতিক পরিপক্বতা এবং ইউরোপীয় ঐক্যের প্রতি অঙ্গীকার দেখাতে হবে।
তবে জার্মানির ভেতরেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিশ্চিন্ত নয়। কট্টর ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান দেখাচ্ছে, ইউরোপীয় গণতন্ত্রের ভিত এখনো চাপের মধ্যে আছে। শুধু বাহ্যিক নিরাপত্তা নয়, ভেতরের রাজনৈতিক ভারসাম্যও ইউরোপের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। যদি জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলো শক্তিশালী হয়, তাহলে ইউরোপীয় ঐক্য দুর্বল হতে পারে। আর ঐক্য দুর্বল হলে আমেরিকাহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা আরও কঠিন হবে।
হাঙ্গেরির ভিক্টর অরবানের নির্বাচনী পরাজয়ের প্রসঙ্গও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। লেখাটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ট্রাম্প তাঁর এই উদারনীতিবিরোধী মিত্রের পরাজয়ের পর ইউরোপীয়দের নিজেদের মতো চলতে দেওয়ার দিকে আরও ঝুঁকতে পারেন। অর্থাৎ, ইউরোপের সঙ্গে আমেরিকার দূরত্ব কেবল নীতি বা কৌশলের কারণে নয়; আদর্শিক রাজনীতির কারণেও বাড়ছে।
তবে এই সংকটের ভেতরেও একটি সুযোগ আছে। ইউরোপ বহুদিন ধরে নিরাপত্তা বিষয়ে অন্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এখন তারা চাইলে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, কূটনৈতিক ঐক্য এবং কৌশলগত স্বাধীনতা নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারে। এতে ইউরোপ শুধু শক্তিশালীই হবে না, বরং ভবিষ্যতের বৈশ্বিক রাজনীতিতে আরও আত্মবিশ্বাসী ভূমিকা নিতে পারবে।
কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন কঠিন সিদ্ধান্ত। প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানো, সামরিক সমন্বয় জোরদার করা, সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে যৌথ অবস্থান তৈরি করা, রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে বাস্তববাদী হওয়া—এসব বিষয়ে ইউরোপকে দ্রুত এগোতে হবে। শুধু বক্তৃতা বা সম্মেলন দিয়ে এই শূন্যতা পূরণ করা যাবে না। নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, অর্থনৈতিক বিনিয়োগ এবং জনসমর্থন—সবই প্রয়োজন।
লেখাটির শেষ অংশে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা আছে। আমেরিকার দীর্ঘ নিরাপত্তা ছাতা ট্রাম্পের অধীনে শেষ হয়ে গেছে, এবং সেটি আগের রূপে আর ফিরে আসবে না—এমন ধারণাই সেখানে তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ, ইউরোপের সামনে এখন আর পুরোনো বাস্তবতায় ফিরে যাওয়ার সহজ পথ নেই। তাদের নতুন পথ আঁকতে হবে।
তবু সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে ফেলার মধ্যেই ভবিষ্যৎ নেই। ইউরোপ ও আমেরিকার সম্পর্ক হয়তো নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হবে। পশ্চিমা জোটের ধারণা হয়তো বদলাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইউরোপীয় ও আমেরিকানরা আলাদা থাকার চেয়ে একসঙ্গে থাকলে বেশি শক্তিশালী—এই সত্য অস্বীকার করা কঠিন। নতুন বিশ্বব্যবস্থায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ছে, পুরোনো জোটগুলো পরীক্ষা দিচ্ছে, আর শক্তির ভারসাম্য দ্রুত বদলাচ্ছে। এমন সময়ে দীর্ঘদিনের অংশীদারদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হওয়া দুপক্ষের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, ইউরোপ এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আমেরিকার ওপর নির্ভরতার যুগ শেষের পথে। সামনে আছে অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তা সংকট, রাজনৈতিক বিভাজন এবং নেতৃত্বের পরীক্ষা। কিন্তু একই সঙ্গে আছে নতুন আত্মনির্ভরতার সুযোগ। প্রশ্ন একটাই—ইউরোপ কি প্রস্তুত?

