দক্ষিণ আমেরিকার আকাশে নেমে এসেছে গভীর শোক। ভেনেজুয়েলার সীমান্তবর্তী এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বিমান বিধ্বস্ত হয়ে কলম্বিয়ার এক সংসদ সদস্যসহ বিমানে থাকা সব আরোহীর মৃত্যু হয়েছে। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় পুরো কলম্বিয়াজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, দুর্ঘটনাকবলিত বিমানটিতে মোট ১৫ জন আরোহী ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন যাত্রী ও ক্রু সদস্য—কেউই প্রাণে বাঁচেননি। একই দিন কলম্বিয়ার পরিবহন মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে হতাহতের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে।
রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক বিমান সংস্থা সাতেনা (SATENA) পরিচালিত ওই ফ্লাইটটি উত্তর সান্তান্দার বিভাগের কুকুতা শহর থেকে ওকানিয়া শহরের উদ্দেশে যাত্রা করেছিল। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর মাত্র ১১ মিনিট আগে হঠাৎ করেই বিমানটি রাডার থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়। এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল সূত্র জানায়, শেষ মুহূর্তে বিমানের উচ্চতা অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত কমে যেতে দেখা যায়—যা বড় ধরনের দুর্ঘটনার ইঙ্গিত দেয়।
পরিবহনমন্ত্রী মারিয়া ফার্নান্দা রোহাস এক সংবাদ সম্মেলনে নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। তিনি বলেন, “এটি আমাদের সবার জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক একটি দিন। যারা প্রিয়জন হারিয়েছেন, তাদের কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।” তিনি আরও জানান, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ তদন্ত শুরু হয়েছে এবং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সব প্রয়োজনীয় প্রটোকল অনুসরণ করা হচ্ছে।
নিহতদের মধ্যে ছিলেন সংঘাতের শিকার জনগোষ্ঠীর জন্য সংরক্ষিত আসনে নির্বাচিত কলম্বিয়ার নিম্নকক্ষের সংসদ সদস্য দিওহেনেস কুইন্তেরো। একই আসনের জন্য নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা প্রার্থী কার্লোস সালসেদো সালাজারও ওই ফ্লাইটে ছিলেন। এছাড়া বিমানে থাকা দুইজন ক্রু সদস্যসহ অন্য সব যাত্রীও দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান।
পরিবহনমন্ত্রী রোহাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় জানান, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের দুর্ঘটনা তদন্ত বিভাগ বিমানটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণ খতিয়ে দেখছে। একই সঙ্গে জরুরি উদ্ধার ও সমন্বয় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ‘ইউনিফায়েড কমান্ড পোস্ট (পিএমইউ)’ সক্রিয় করা হয়েছে।
তবে দুর্ঘটনাস্থলের অবস্থান উদ্ধার তৎপরতাকে জটিল করে তুলেছে। এলাকাটি ঘন জঙ্গলপূর্ণ ও দুর্গম হওয়ায় উদ্ধারকারী দলকে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হচ্ছে। স্থানীয় এক সরকারি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রতিকূল আবহাওয়া দুর্ঘটনার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, যদিও তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, দুর্ঘটনাস্থল কাতাতুম্বো অঞ্চল—যা দীর্ঘদিন ধরেই মাদক চাষ ও সশস্ত্র সংঘাতের জন্য কুখ্যাত। এটি বিশ্বের বৃহত্তম কোকা চাষ অঞ্চলগুলোর একটি। ভেনেজুয়েলা সীমান্তবর্তী এই এলাকাটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সংঘর্ষের কেন্দ্রস্থল হিসেবেও পরিচিত। গত বছরের জানুয়ারিতে এখানে সশস্ত্র সংঘর্ষের কারণে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিল।
যে রুটে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে—কুকুতা–ওকানিয়া বিমান রুট—তা মাত্র গত বছরের জুন মাসে চালু হয়েছিল। দীর্ঘদিন অবহেলিত এই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে রুটটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছিল। কিন্তু চালুর এক বছরের মধ্যেই এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা সেই আশার পথকে শোকের ছায়ায় ঢেকে দিল।

