বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির অস্থিরতা যত বাড়ছে, বিনিয়োগকারীদের আচরণেও ততটাই স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, যুদ্ধের আশঙ্কা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন অনেকেই। নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বিনিয়োগকারীদের ভরসা হয়ে উঠছে স্বর্ণ। এরই ফল হিসেবে বিশ্ববাজারে সোনার দাম ছুঁয়েছে ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়।
প্রথমবারের মতো প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ৫৫০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। একই সঙ্গে রুপার দামও পৌঁছেছে সর্বকালের সর্বোচ্চ উচ্চতায়—যা মূল্যবান ধাতুর বাজারে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) স্পট মার্কেটে স্বর্ণের দাম একদিনেই ২ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় প্রতি আউন্স ৫ হাজার ৫৫৪ দশমিক ৭৬ ডলার। আগের দিনই স্বর্ণের দাম রেকর্ড ৫ হাজার ৫৯১ দশমিক ৬১ ডলার ছুঁয়েছিল।
এর আগে সোমবার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ডলার অতিক্রম করে। মাত্র চারটি ট্রেডিং সেশনেই দাম বেড়েছে ৫০০ ডলারেরও বেশি—যা বাজার বিশ্লেষকদের কাছেও চমক হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
আইজি মার্কেটের বিশ্লেষক টনি সাইকামোর মনে করেন, একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। তার ভাষায়,
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ধারাবাহিক স্বর্ণ ক্রয়, ট্রেন্ড-অনুসরণকারী বিনিয়োগ তহবিলের সক্রিয়তা এবং নিরাপদ বিনিয়োগের প্রতি বাড়তি চাহিদা মিলেই স্বর্ণের দামে এই দ্রুত উত্থান ঘটিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দামের এই তীব্র গতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সামনে সাময়িক সংশোধন আসতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে—বিশেষ করে ২০২৬ সাল পর্যন্ত—স্বর্ণের বাজার শক্ত অবস্থানে থাকবে। ফলে দাম কিছুটা কমলেও সেটিকে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ হিসেবেই দেখবেন বিনিয়োগকারীরা।
স্বর্ণের বাজারে চাপ বাড়ানোর আরেকটি বড় কারণ মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা। বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনায় বসার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি দেন—আলোচনায় না এলে যুক্তরাষ্ট্র আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে।
এর জবাবে ইরান যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও তাদের মিত্রদের বিরুদ্ধে পালটা হামলার হুমকি দেয়। এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্য বাজারে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে স্বর্ণের দামে।
অন্যদিকে, মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ নীতিগতভাবে সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে—যা বাজারের প্রত্যাশার সঙ্গেই মিলেছে। তবে ব্যবসায়ীদের ধারণা, জুন মাসে সুদের হার কমাতে পারে ফেড, যদিও তার আগে নয়।
ফেড চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েল জানিয়েছেন, ডিসেম্বর মাসেও মূল্যস্ফীতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি ছিল। এই অবস্থায় স্বর্ণের মতো অ-ফলনশীল সম্পদ আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
ঐতিহাসিকভাবে স্বর্ণকে মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে সুরক্ষা হিসেবে দেখা হয়। সুদের হার কম থাকলে স্বর্ণের মতো সম্পদের প্রতি আগ্রহ বাড়ে—কারণ এতে সুদের ক্ষতি নেই।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে স্বর্ণের দাম বেড়েছিল ৬৪ শতাংশ। চলতি বছর এখন পর্যন্ত দাম বেড়েছে ২৫ শতাংশেরও বেশি—যা বিনিয়োগকারীদের আস্থারই প্রতিফলন।
স্বর্ণের রেকর্ড দামের প্রভাব পড়েছে ভোক্তা বাজারেও। চলতি সপ্তাহে দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর সাংহাই ও হংকংয়ের স্বর্ণ ও মূল্যবান ধাতুর দোকানগুলোতে ভিড় করছেন ক্রেতারা। অনেকেই ধারণা করছেন, সামনে দাম আরও বাড়তে পারে—এই আশঙ্কা থেকেই আগাম কেনাকাটায় ঝুঁকছেন তারা।
স্বর্ণের পাশাপাশি অন্য মূল্যবান ধাতুর দামও ঊর্ধ্বমুখী।
স্পট মার্কেটে—
-
রুপার দাম ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রতি আউন্স ১১৮ দশমিক ৩৬ ডলার, যা এর আগে রেকর্ড ১১৯ দশমিক ৩৪ ডলার ছুঁয়েছিল।
-
প্লাটিনামের দাম বেড়ে হয়েছে প্রতি আউন্স ২ হাজার ৬৯৭ দশমিক ৫৪ ডলার।
-
প্যালাডিয়ামের দাম দাঁড়িয়েছে প্রতি আউন্স ২ হাজার ৯১ দশমিক ১৫ ডলার।

