ইরানে গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে শুরু হওয়া সরকারবিরোধী আন্দোলন কঠোর দমন-পীড়নের মধ্য দিয়ে আপাতত নিয়ন্ত্রণে এলেও সাধারণ মানুষের উদ্বেগ কমেনি। বরং আন্দোলন থেমে যাওয়ার পর থেকেই দেশজুড়ে শুরু হয়েছে গণগ্রেপ্তার অভিযান, নজরদারি এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন—যা নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে নাগরিকদের মধ্যে।
রাস্তায় প্রকাশ্য সংঘর্ষ কমে এলেও নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতা থামেনি। উল্টো, পরিস্থিতি যেন আবার উত্তপ্ত না হয়—এই অজুহাতে সাদা পোশাকের নিরাপত্তা সদস্যদের উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে বিভিন্ন এলাকায়। ফলে জনজীবনে এক ধরনের অদৃশ্য চাপ তৈরি হয়েছে, যেখানে মানুষ প্রকাশ্যে কথা বলতেও ভয় পাচ্ছে।
বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানায়, নতুন করে বিক্ষোভ দানা বাঁধতে না দিতেই এই অভিযান জোরদার করা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাঁচজন মানবাধিকারকর্মী জানান, প্রধান সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ চেকপয়েন্টগুলোর আশপাশে সাদা পোশাকের নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো বেড়েছে।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যাপক গ্রেপ্তার অভিযান চালানো হচ্ছে এবং আটক ব্যক্তিদের অনেককে রাখা হচ্ছে গোপন লকাপে। পরিবার কিংবা আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ পাচ্ছেন না অনেকেই।
আরেক মানবাধিকারকর্মী রয়টার্সকে বলেন,
‘নিরাপত্তা বাহিনী নির্বিচারে গ্রেপ্তার করছে। যাদের আটক করা হচ্ছে, তাদের কোথায় নেওয়া হচ্ছে বা কোথায় রাখা হচ্ছে—এ তথ্য কেউই জানে না। এই অনিশ্চয়তাই মানুষের মধ্যে ভয় ছড়িয়ে দিচ্ছে।’
তার মতে, উদ্দেশ্য পরিষ্কার—সমাজজুড়ে আতঙ্ক তৈরি করে ভবিষ্যতের যেকোনো প্রতিবাদ আগেই দমিয়ে দেওয়া।
এই চিত্র শুধু মানবাধিকারকর্মীদের বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আইনজীবী, প্রত্যক্ষদর্শী এবং সরকারি কর্মকর্তারাও একই ধরনের তথ্য নিশ্চিত করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুইজন ইরানি কর্মকর্তা জানান, গত কয়েকদিনেই হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এমনকি কয়েক বছর আগের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদেরও নতুন করে আটক করা হচ্ছে—যা ইঙ্গিত দেয়, সরকার শুধু সাম্প্রতিক আন্দোলন নয়, অতীতের বিরোধী কণ্ঠগুলোকেও দমন করতে চায়।
গত বছর ডিসেম্বরের শেষ দিকে, তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদে আন্দোলনের সূচনা হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই তা দেশের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর মতে,
গত প্রায় পাঁচ দশকের মধ্যে ইরান সরকার এমন চাপে পড়েনি—এমন মাত্রার সরকারবিরোধী আন্দোলন ছিল এটি।
বিক্ষোভকারীরা শুধু অর্থনৈতিক দাবি নয়, সরাসরি শাসকদের পদত্যাগ দাবি করেন, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।
এই আন্দোলনে হতাহতের সংখ্যা নিয়েও রয়েছে বড় ধরনের বিভ্রান্তি। ইরান সরকার জানিয়েছে, এবারের বিক্ষোভে ৩ হাজার ১১৭ জন নিহত হয়েছেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ (HRANA) বলছে, নিহতের প্রকৃত সংখ্যা ৬ হাজার ৩৭৩ জন। এই বড় ব্যবধান পরিস্থিতির ভয়াবহতা এবং তথ্যের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
এই অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার মধ্যেই নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের লাগাতার হুমকি। পশ্চিমা সূত্রগুলো জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র নাকি ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী ও শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলার পরিকল্পনা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এমন কোনো পদক্ষেপ নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। একদিকে সরকার দমন-পীড়ন জোরদার করবে, অন্যদিকে সেই চাপ নতুন করে বিক্ষোভকারীদের আন্দোলনে নামতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে।
বর্তমানে ইরানে পরিস্থিতি যেন এক অদ্ভুত স্থবিরতায় আটকে আছে—বাইরে আপাত শান্তি, ভেতরে ভয় আর অনিশ্চয়তা। গণগ্রেপ্তার ও ভয়ভীতি দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চললেও, দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে আরও প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।

