ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা যখন আবারও বিপজ্জনক মোড় নিতে পারত, ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধের পথ তাৎক্ষণিকভাবে না বেছে যুদ্ধবিরতির সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। বাইরে থেকে দেখলে এটি কেবল একটি সাময়িক কূটনৈতিক পদক্ষেপ মনে হতে পারে। কিন্তু ভেতরের চিত্র বলছে, এই সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল নীরবতা, অচলাবস্থা, সন্দেহ, এবং একই সঙ্গে আরও বড় সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি।
হোয়াইট হাউসে মঙ্গলবার দুপুরে ট্রাম্প তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা দলের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। সামনে ছিল কঠিন প্রশ্ন—ইরান নিয়ে এখন পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে। যুদ্ধবিরতির নির্ধারিত সময় প্রায় শেষের দিকে, আর ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের পাকিস্তান সফরের প্রস্তুতিও প্রায় সম্পন্ন। কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল, ইরানের পক্ষ থেকে কার্যত কোনো সাড়া আসছিল না। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার পরবর্তী ধাপে যাওয়ার আগে কিছু বিস্তৃত সমঝোতা-বিষয়ক শর্ত ইরানকে পাঠিয়েছিল। কিন্তু কয়েক দিন পেরিয়ে গেলেও কোনো জবাব না আসায় ওয়াশিংটনের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়—এ অবস্থায় মুখোমুখি বৈঠকে গিয়েও আদৌ কতটা অগ্রগতি সম্ভব।
এই নীরবতাকে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরের অনেকে কেবল কূটনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছেন না। তাদের ধারণা, ইরানের নেতৃত্বের ভেতরেই বড় ধরনের বিভাজন রয়েছে। পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের সূত্রে পাওয়া বার্তাও নাকি সেই ইঙ্গিত দিচ্ছিল। বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বর্তমান মজুত, এবং আলোচকরা কত দূর পর্যন্ত ছাড় দিতে পারবেন—এসব বিষয়ে তেহরানের ভেতরে ঐকমত্য নেই বলেই ওয়াশিংটন মনে করছে। অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নয়; ইরানের ভেতরেও অবস্থান এখনও পুরোপুরি এক নয়।
এখানেই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা, নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তাঁর অধস্তনদের স্পষ্ট নির্দেশ দিচ্ছেন কি না, সেটিও অনিশ্চিত। ফলে আলোচনায় বসার আগেই ইরানের সিদ্ধান্ত কাঠামো যেন ধোঁয়াশায় ঢেকে গেছে। এই ধোঁয়াশা কেবল কূটনৈতিক দেরি তৈরি করছে না; এটি আসলে বোঝাচ্ছে, ইরান এখনো নিজের অবস্থানকে একক ও সুসংহত রূপে বিশ্বের সামনে তুলতে পারেনি। একটি রাষ্ট্র যখন বাইরের চাপের মুখে নিজের অভ্যন্তরীণ অবস্থান স্থির করতে হিমশিম খায়, তখন তার কূটনৈতিক নীরবতা প্রায়ই দুর্বলতারও লক্ষণ হয়ে দাঁড়ায়।
তবু ট্রাম্প তাৎক্ষণিক সামরিক হামলায় ফেরার পথ নেননি। বরং নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার ঠিক আগে তিনি ইরানের সঙ্গে চলমান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি বাড়িয়ে দেন, এবং এবার কোনো নির্দিষ্ট শেষ সময়ও উল্লেখ করেননি। এই দিকটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সময়সীমা না দিয়ে যুদ্ধবিরতি বাড়ানো মানে একদিকে চাপ বজায় রাখা, অন্যদিকে আলোচনার দরজাও পুরোপুরি বন্ধ না করা। তিনি প্রকাশ্যে ইরানের সরকারি মহলকে “গুরুতরভাবে বিভক্ত” বললেও, একই সঙ্গে স্পষ্ট ছিল যে তিনি এখনো যুদ্ধের বদলে কূটনৈতিক সমাধানেই আগ্রহী। বিশেষত এমন এক সংঘাতকে আবার জিইয়ে তুলতে তিনি সতর্ক, যেটিকে তিনি আগেই শেষ হয়ে যাওয়া যুদ্ধ বলে দাবি করেছিলেন।
এখানে ট্রাম্পের রাজনৈতিক হিসাবও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। সামরিক শক্তি প্রদর্শন তাঁর রাজনীতির একটি পরিচিত বৈশিষ্ট্য হলেও, দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল বিদেশি সংঘাতে জড়িয়ে পড়া তাঁর জন্য সব সময়ই ঝুঁকিপূর্ণ। তাই যুদ্ধবিরতি বাড়ানোকে শুধু মানবিক বা কূটনৈতিক সদিচ্ছা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একই সঙ্গে রাজনৈতিক চাপ সামাল দেওয়া, আঞ্চলিক মিত্রদের অবস্থান বিবেচনায় রাখা, এবং ঘরোয়া সমালোচনা এড়ানোর একটি কৌশলও হতে পারে।
অন্যদিকে ইরানও নিজেদের শর্ত স্পষ্ট করে দিয়েছে। তেহরান প্রকাশ্যে বলেছে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানি বন্দরগামী ও বন্দরত্যাগী জাহাজের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহার না করলে তারা নতুন দফার আলোচনায় যাবে না। কিন্তু ট্রাম্প সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, চূড়ান্ত সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত প্রণালি খোলা হবে না। এখানেই আসল অচলাবস্থা। কারণ উভয় পক্ষই আলোচনায় ফিরতে চাইলে আগে অন্য পক্ষের কাছ থেকে ছাড় চায়। ফলে কূটনীতি এগোতে পারছে না, আবার সরাসরি যুদ্ধও শুরু হচ্ছে না। মধ্যপ্রাচ্যের মতো ভঙ্গুর অঞ্চলে এ ধরনের ঝুলন্ত অবস্থা প্রায়ই বিপজ্জনক, কারণ একটি ভুল হিসাব বা একটি আকস্মিক পদক্ষেপ পুরো পরিস্থিতিকে মুহূর্তে বদলে দিতে পারে।
মঙ্গলবার বিকেলের বৈঠকে ট্রাম্প ও তাঁর সহযোগীরা শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেন যুদ্ধবিরতি বাড়ানো হবে। পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীরা জানিয়েছিল, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আগের বিরতির সময় শেষ হয়ে যাবে, যদিও ট্রাম্পের ধারণা ছিল তা ওয়াশিংটনে বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত চলবে। যাই হোক, নতুন এই বাড়তি সময়ের উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট—ইরানকে নিজেদের ভেতরে একটি একক অবস্থানে পৌঁছানোর সুযোগ দেওয়া। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, এতে সাফল্যের কোনো নিশ্চয়তা নেই। অর্থাৎ সময় বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু সমাধান এখনো আসেনি।
এখানে পাকিস্তানের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামাবাদ একদিকে ইরানকে আলোচনায় ফেরাতে চেষ্টা করেছে, অন্যদিকে ট্রাম্পকে যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে আঞ্চলিক শক্তিগুলোও বুঝতে পারছে, সংঘাত দীর্ঘ হলে অর্থনীতি, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা—সব দিকেই ক্ষতির মাত্রা বাড়বে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধের মতো অবস্থায় থাকলে যুক্তরাষ্ট্র ও তেহরান উভয়ই অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফলে কূটনৈতিক পথ অচল হলেও, বাস্তবতা উভয় পক্ষকে আবার আলোচনার টেবিলে ফেরার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
কিন্তু ইরানের প্রতিক্রিয়া থেকে আশাবাদের খুব বেশি কারণ মেলে না। ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকারের উপদেষ্টা মাহদি মোহাম্মাদি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি বাড়ানো তাদের কাছে অর্থহীন। তাঁর বক্তব্য ছিল, পরাজিত পক্ষ শর্ত চাপিয়ে দিতে পারে না; আর অবরোধ চলতে থাকলে সেটি বোমাবর্ষণের চেয়ে আলাদা কিছু নয়, বরং সামরিক জবাবই তার উত্তর হওয়া উচিত। এই প্রতিক্রিয়া দেখায়, অন্তত ইরানের একাংশ এখনও সমঝোতার ভাষার চেয়ে প্রতিরোধের ভাষাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে আপাত শান্ত পরিবেশের নিচে সংঘাতের আগুন জ্বলতেই আছে।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ট্রাম্প একদিকে যুদ্ধবিরতি বাড়ালেও দিনের শুরুতে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, খুব শিগগিরই আবার ইরানে বোমাবর্ষণ শুরু হতে পারে বলে তিনি মনে করছেন। অর্থাৎ তাঁর অবস্থানে একই সঙ্গে দুটি সুর শোনা যাচ্ছে—একদিকে কূটনীতি, অন্যদিকে শক্তি প্রয়োগের প্রস্তুতি। এই দ্বৈত বার্তা অনেক সময় আলোচনায় চাপ তৈরির জন্য ব্যবহার করা হয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি অনিশ্চয়তাও বাড়ায়। প্রতিপক্ষ যদি মনে করে আলোচনার টেবিল কেবল সময়ক্ষেপণের মঞ্চ, তাহলে সমঝোতা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
ট্রাম্পের নিজের উপদেষ্টারাও নাকি তাঁকে সতর্ক করেছেন—নতুন কোনো সময়সীমা ছাড়া যুদ্ধবিরতি বাড়ালে ইরান আলোচনাকে দীর্ঘায়িত করার সুযোগ পেতে পারে। তাদের আশঙ্কা, এ সময়ের মধ্যে তেহরান যুদ্ধের সময় গোপনে চাপা রাখা কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার বা পুনর্বিন্যাসের সুযোগও নিতে পারে। তাই এই বিরতি একদিকে যেমন শান্তির সম্ভাবনা খুলে দিচ্ছে, অন্যদিকে সেটি প্রতিপক্ষকে পুনর্গঠনের সময়ও দিতে পারে। কূটনীতির এই চিরাচরিত দ্বন্দ্ব এখানেও স্পষ্ট—সময় দেওয়া কি সমাধানের পথ, নাকি ঝুঁকি বাড়ানোর সুযোগ?
এই সপ্তাহেই অন্তত একটি নীতিগত কাঠামো দাঁড় করানোর আশা ছিল আলোচকদের। পরিকল্পনা ছিল, প্রথমে একটি সামগ্রিক বোঝাপড়া হবে, তারপর পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে বিস্তারিত শর্ত নিয়ে আলোচনা চলবে। কিন্তু সেখানেও বড় বড় প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত। ইরান ভবিষ্যতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারবে কি না, তাদের উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতের কী হবে, আর কোন কোন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে—এসব মূল প্রশ্নে এখনো কোনো স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেই। বাস্তবে এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই ঠিক করবে আলোচনার ভবিষ্যৎ।
ট্রাম্পের জন্য আরেকটি রাজনৈতিক সীমারেখাও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি এমন কোনো সমঝোতায় যেতে চান না, যেটিকে ২০১৮ সালে তিনি যেখান থেকে সরে এসেছিলেন সেই পুরোনো ইরান পারমাণবিক চুক্তির দুর্বল সংস্করণ বলে দেখানো যায়। তিনি বহুদিন ধরেই সেই আগের চুক্তিকে দুর্বল বলে সমালোচনা করে এসেছেন। ফলে এখন তাঁর দরকার এমন একটি ফলাফল, যেটিকে তিনি রাজনৈতিক জয় হিসেবে তুলে ধরতে পারেন—শুধু সমঝোতা হলেই হবে না, সেটি তাঁর ভাষায় “আরও ভালো” সমঝোতা হতে হবে। এই কারণেও তাঁর বক্তব্যে প্রায়ই আত্মবিশ্বাসের অতিরিক্ত প্রকাশ দেখা যাচ্ছে।
গত কয়েক দিন ধরে ট্রাম্প নিজেকে এমন একজন আলোচক হিসেবে তুলে ধরছেন, যিনি শেষ পর্যন্ত একটি বড় সমঝোতা আদায় করে নিতে পারবেন। তিনি এমনকি মঙ্গলবার দাবি করেন, তিনি যদি সেই সময়ে প্রেসিডেন্ট থাকতেন, তবে ভিয়েতনাম যুদ্ধও খুব দ্রুত জিতে যেতেন। পরে তিনি আরও বলেন, ইরানের সামনে নাকি বিকল্প নেই; তাদের নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী এবং নেতৃত্বের ওপর বড় আঘাত এসেছে। এই ভাষা আসলে তাঁর কূটনৈতিক অবস্থানের আরেক দিক প্রকাশ করে—তিনি আলোচনাকে সমতার ভিত্তিতে নয়, বরং চাপের ভিত্তিতে দেখতে বেশি স্বচ্ছন্দ। কিন্তু ইতিহাস বলছে, অতিরিক্ত চাপ অনেক সময় প্রতিপক্ষকে নমনীয় না করে বরং আরও কঠোর করে তোলে।
দিনের শেষে আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় ছিল ট্রাম্পের নীরবতা। কলেজ ক্রীড়াবিদদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি যুদ্ধ নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব না দিয়েই বেরিয়ে যান। এই নীরবতা কাকতালীয় নাও হতে পারে। সম্ভবত তাঁর প্রশাসন তখনও বুঝে উঠতে পারছিল না, বাড়ানো যুদ্ধবিরতি সত্যিই নতুন আলোচনার পথ খুলবে, নাকি এটি কেবল বড় এক সংঘাতের আগে ক্ষণিকের বিরতি।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আপাতদৃষ্টিতে শান্তির ইঙ্গিত দিলেও এর নিচে লুকিয়ে আছে আরও গভীর সংকট। যুক্তরাষ্ট্র চায় শর্ত মেনে ইরান আলোচনায় ফিরুক। ইরান চায় অবরোধ শিথিল হোক, তারপর নতুন সংলাপ শুরু হোক। পাকিস্তানসহ আঞ্চলিক পক্ষগুলো বড় সংঘাত ঠেকাতে ব্যস্ত। কিন্তু মূল সমস্যাগুলো—বিশ্বাসের অভাব, নেতৃত্বের বিভাজন, নিরাপত্তা সংশয়, অর্থনৈতিক চাপ, এবং পারমাণবিক প্রশ্নে মৌলিক মতভেদ—এখনো রয়ে গেছে। তাই এই যুদ্ধবিরতি আসলে শান্তির নিশ্চয়তা নয়; বরং এটি এমন এক সময়সীমাহীন বিরাম, যার ভেতরে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ দুলছে কূটনীতি ও সংঘাতের মাঝামাঝি এক বিপজ্জনক রেখায়।

