ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার হামলার চার বছর পরও একটি প্রশ্ন স্পষ্টভাবে সামনে রয়ে গেছে: পশ্চিমা বিশ্ব কি সত্যিই ক্রেমলিনের কৌশল বুঝতে পেরেছে? এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়, কিন্তু একটি বিষয় ক্রমেই পরিষ্কার হচ্ছে—রাশিয়াকে নিয়ে প্রচলিত দুই ধরনের ব্যাখ্যাই অসম্পূর্ণ, এবং অনেক ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিকর।
একদল মনে করে, রাশিয়ার আচরণ মূলত অযৌক্তিক; সেখানে কোনো সুশৃঙ্খল পরিকল্পনা নেই, তাই মস্কোকে আগে থেকে বোঝা যায় না। অন্যদিকে আরেকদল ধরে নেয়, রাশিয়া বহুদিনের হিসাব কষে এগোচ্ছে; ইউক্রেন শুধু শুরু, সামনে আরও বড় ভূখণ্ড-দাবি বা প্রভাব বিস্তারের প্রকল্প অপেক্ষা করছে। কিন্তু বাস্তবতা সম্ভবত এই দুই প্রান্তের মাঝখানে।
রাশিয়া আবেগের বশে যুদ্ধ শুরু করেনি—আবার এমনও নয় যে তার হাতে পুরো পৃথিবী নতুনভাবে সাজিয়ে তোলার কোনো সুসংহত মহাপরিকল্পনা আছে। এখানেই বিশ্লেষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা: রাশিয়া নিজেকে বড় শক্তি হিসেবে দেখতে চায়, পশ্চিমা উদারতাবাদের বিপরীতে একটি সভ্যতাগত পাল্টা অবস্থান হিসেবে তুলে ধরতে চায়, কিন্তু সেই দৃষ্টিভঙ্গিকে বাস্তব বিশ্বব্যবস্থায় রূপ দেওয়ার মতো অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা আদর্শিক সামর্থ্য তার নেই। ফলে সে এমন এক পথে হাঁটে, যেখানে সরাসরি শাসন বা পূর্ণ আধিপত্যের বদলে বেশি গুরুত্ব পায় বিঘ্ন সৃষ্টি, বিভ্রান্তি ছড়ানো, এবং প্রতিপক্ষের ভেতরের ঐক্য দুর্বল করে দেওয়া।
রাশিয়ার কৌশল আসলে কী
রাশিয়ার আচরণকে এককথায় বোঝাতে গেলে বলা যায়—এটি আধিপত্যের কৌশল নয়, বরং অস্থিরতার কৌশল। মস্কো বুঝে গেছে, সে যে জোটের মুখোমুখি—তার অর্থনৈতিক শক্তি, জোটগত সক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিধি রাশিয়ার চেয়ে বড়। তাই সরাসরি পাল্লা দেওয়ার চেয়ে সে এমন ক্ষেত্র বেছে নেয়, যেখানে তুলনামূলক কম খরচে বেশি চাপ তৈরি করা যায়।
এই কৌশলের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এটি পুরোপুরি এলোমেলো নয়, আবার পুরোপুরি শীতল মাথায় আঁকা দীর্ঘমেয়াদি নকশাও নয়। বরং পরিস্থিতি অনুযায়ী এটি দ্রুত বদলায়, প্রয়োজনে হঠাৎ তীব্র হয়, এবং প্রতিপক্ষের দুর্বল জায়গা খুঁজে আঘাত করে। এতে একদিকে আছে ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা, অন্যদিকে আছে সীমাবদ্ধতার বাস্তব স্বীকারোক্তি।
পুতিনের প্রথম অগ্রাধিকার: শাসনব্যবস্থার টিকে থাকা
এই বিশ্লেষণের কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক ধারণা—রুশ পররাষ্ট্রনীতির সব সিদ্ধান্তের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চালিকা শক্তি হলো শাসনব্যবস্থার ধারাবাহিকতা এবং সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা। অর্থাৎ, বাইরের পৃথিবীতে রাশিয়া কী করছে, তা বোঝার জন্য আগে দেখতে হবে ভেতরে ক্ষমতা কীভাবে টিকে আছে।
এখানে এলিটদের ঐক্য, অভ্যন্তরীণ স্থিতি, এবং রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণক্ষমতা বিশেষ গুরুত্ব পায়। যদি ক্ষমতার কেন্দ্র মনে করে বাইরের চাপ বা ভেতরের অস্থিরতা শাসনব্যবস্থার স্থায়িত্বকে হুমকিতে ফেলছে, তাহলে তার প্রতিক্রিয়াও হবে অনেক বেশি কঠোর। এই জায়গা থেকেই বোঝা যায়, কেন অনেক সময় আন্তর্জাতিক সমালোচনা বা ভাবমূর্তির ক্ষতি সত্ত্বেও ক্রেমলিন কঠিন অবস্থান ছাড়ে না। কারণ তার কাছে বহির্বিশ্বে গ্রহণযোগ্যতার চেয়ে ভেতরে ক্ষমতার বৈধতা এবং শক্তির চিত্র ধরে রাখা বেশি জরুরি।
দ্বিতীয় অগ্রাধিকার: প্রতিবেশী অঞ্চলকে নিজের প্রভাববলয়ে রাখা
রাশিয়ার আরেকটি প্রধান লক্ষ্য হলো তার আশপাশের অঞ্চলকে নিজের নিয়ন্ত্রণক্ষেত্রের বাইরে যেতে না দেওয়া। বিশেষ করে যখন কোনো প্রতিবেশী দেশ পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে চায়, তখন মস্কো সেটিকে শুধু কূটনৈতিক পরিবর্তন হিসেবে দেখে না; বরং তা নিরাপত্তা, প্রভাব এবং মর্যাদার প্রশ্নে সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে ধরে।
এই প্রেক্ষাপটে ইউক্রেন শুধু একটি ভূখণ্ডের প্রশ্ন নয়। এখানে আসল বিষয় হলো অবস্থানগত দিকনির্দেশ। কোনো দেশ কার সঙ্গে কৌশলগতভাবে যুক্ত হবে, কোন নিরাপত্তা ছাতার নিচে যাবে, এবং কার রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বলয়ে থাকবে—রাশিয়ার কাছে সেটিই মুখ্য। সে কারণেই দেখা যায়, পশ্চিমের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার ইঙ্গিত স্পষ্ট হওয়ার পরই ইউক্রেনকে কেন্দ্র করে সংঘাত সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নেয়।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাশিয়া শুধু সীমান্ত টানতে চায় না; সে চায় প্রতিবেশীরা স্বাধীনভাবে নিজেদের ভবিষ্যৎ বেছে নেওয়ার সুযোগ না পাক, যদি সেই পছন্দ তার প্রভাববলয় কমিয়ে দেয়। এই মানসিকতা বুঝতে না পারলে রাশিয়ার পদক্ষেপকে কেবল ভূখণ্ড-লোভ হিসেবে ব্যাখ্যা করা ভুল হবে।
তৃতীয় অগ্রাধিকার: রাশিয়াবিরোধী বৈশ্বিক কাঠামোকে শক্ত হতে না দেওয়া
বিশ্বব্যবস্থাকে নতুন করে গড়ে তোলার ক্ষমতা রাশিয়ার নেই—এই দাবিটিই এখানে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এতে বোঝা যায়, রাশিয়া কেন বিকল্প আন্তর্জাতিক কাঠামোর স্থপতি হওয়ার চেয়ে বিদ্যমান ব্যবস্থার ফাঁকফোকর বড় করতে আগ্রহী।
অর্থনৈতিক ও আদর্শিক আকর্ষণের ঘাটতি, সীমিত জোটশক্তি, এবং দীর্ঘস্থায়ী বৈশ্বিক নেতৃত্ব দেওয়ার অক্ষমতা—সব মিলিয়ে মস্কোর সামনে বাস্তবসম্মত পথ হচ্ছে এক ধরনের বাধা-সৃষ্টিকারী শক্তি হয়ে ওঠা। সে জানে, সে হয়তো নতুন বিশ্বব্যবস্থা চাপিয়ে দিতে পারবে না, কিন্তু পুরনো ব্যবস্থার ঐক্য দুর্বল করতে পারে। আর সেটাই তার লাভের জায়গা।
এই লক্ষ্যে তুলনামূলক কম ব্যয়সাপেক্ষ পদ্ধতি—জ্বালানি চাপ, সাইবার অভিযান, তথ্যযুদ্ধ, বিভাজনমুখী রাজনীতিকে উৎসাহ, কৌশলগত ভয়-সংকেত—এসবকে বেশি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয়। প্রচলিত যুদ্ধের তুলনায় এগুলো সস্তা, দ্রুত, এবং বহু ফ্রন্টে একসঙ্গে ব্যবহার করা যায়।
ইউরোপে লক্ষ্য দখল নয়, ভেতরের সংহতিকে নাড়িয়ে দেওয়া
ইউরোপের ক্ষেত্রে রাশিয়ার আচরণকে যদি শুধু ভূখণ্ড দখলের মানচিত্রে বোঝার চেষ্টা করা হয়, তাহলে বড় অংশ বাদ পড়ে যাবে। কারণ ইউরোপে তার মূল লক্ষ্য সব সময় ট্যাঙ্ক নিয়ে ঢুকে পড়া নয়; বরং এমন চাপ তৈরি করা, যাতে দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ ঐক্য দুর্বল হয়, নীতিগত অবস্থান ভেঙে পড়ে, এবং যৌথ প্রতিক্রিয়া দিতে দেরি হয়।
জ্বালানি নিয়ে চাপ সৃষ্টি, সাইবার হামলা, বিভাজন বাড়ায় এমন রাজনীতিক শক্তিকে সহায়তা, অথবা রাশিয়াপন্থী অবস্থানকে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে তুলে আনা—এসবের লক্ষ্য একটাই: প্রতিপক্ষকে ভেতর থেকে ব্যস্ত রাখা। ইউক্রেনে যেমন বোমা নিক্ষেপ সরাসরি ধ্বংস ডেকে আনে, তেমনি ইউরোপে এই অপ্রচলিত পদ্ধতিগুলো রাজনৈতিক সমন্বয়, নীতিগত ঐক্য এবং সামাজিক আস্থা দুর্বল করে দেয়।
অর্থাৎ, রাশিয়া এখানে যুদ্ধক্ষেত্রকে শুধু সীমান্তে সীমাবদ্ধ রাখছে না; সে সিদ্ধান্তগ্রহণের ভেতরে, জনমতের মধ্যে, এবং প্রতিষ্ঠানের আস্থার জায়গায় প্রবেশ করার চেষ্টা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক: প্রান্তসীমা পর্যন্ত ঠেলে দেওয়া, কিন্তু পুরোপুরি ভেঙে না ফেলা
যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে রাশিয়ার কৌশল আরও সূক্ষ্ম। এখানে সরাসরি সংঘর্ষের বদলে গুরুত্ব পায় হিসাব করে উত্তেজনা বাড়ানো। বিশেষ করে পারমাণবিক ইঙ্গিত এবং অস্ত্রনিয়ন্ত্রণ নিয়ে কূটনীতি—এসবকে রাশিয়া মর্যাদার প্রদর্শনী হিসেবে নয়, বরং নিজের অপরিহার্যতা প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।
মস্কোর বার্তা এখানে মোটামুটি এমন: তাকে উপেক্ষা করা যাবে না, কারণ সে এখনো এমন এক শক্তি যার সঙ্গে হিসাব করতেই হবে। তার লক্ষ্য পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার অংশ হয়ে যাওয়া নয়; বরং সেই ব্যবস্থার বাইরে থেকেও আলোচনার টেবিলে নিজের জন্য বাধ্যতামূলক জায়গা নিশ্চিত করা।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব কাজ করে। রাশিয়া চায় না তাকে প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হোক। তাই সে এমন সব পদক্ষেপ নেয়, যাতে উত্তেজনা বাড়ে ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে অন্য পক্ষও বুঝে যে তাকে বাদ দিয়ে নিরাপত্তা সমীকরণ স্থিতিশীল করা যাবে না।
মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় রাশিয়ার পদক্ষেপ: বড় আদর্শ নয়, সস্তায় প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ
মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার কিছু অংশে রাশিয়ার পদক্ষেপকে আদর্শিক প্রকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ কম। সেখানে বেশি কাজ করে সুযোগসন্ধানী বাস্তবতা। যেখানে তুলনামূলক কম খরচে প্রভাব বাড়ানো যায়, যেখানে সামান্য হস্তক্ষেপে কূটনৈতিক অবস্থান শক্ত করা যায়, যেখানে নমনীয়তা বজায় রেখে উপস্থিতি বাড়ানো যায়—সেখানেই মস্কো সক্রিয় হয়।
সিরিয়ায় হস্তক্ষেপ রাশিয়ার আঞ্চলিক প্রোফাইল বাড়িয়েছিল তুলনামূলক সীমিত খরচে। একইভাবে ইরানের সঙ্গে লেনদেনভিত্তিক সম্পর্ক এমন এক কাঠামো তৈরি করে, যা পশ্চিমা প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করার পরিবেশ তৈরি করে, আবার রাশিয়াকেও নিজস্ব জায়গা ধরে রাখতে সাহায্য করে। তবে এখানে লক্ষ্য পুরো আঞ্চলিক শৃঙ্খলা নতুনভাবে নির্মাণ নয়; বরং নিজের উপস্থিতি বাড়ানো, দরকষাকষির শক্তি অর্জন করা, এবং প্রয়োজনে দ্রুত অবস্থান বদলানোর সুযোগ রাখা।
উচ্চাকাঙ্ক্ষা আছে, কিন্তু আছে সংযমও
রাশিয়ার আচরণকে অনেক সময় একমুখী আগ্রাসন হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু এই বিশ্লেষণ বলছে, বিষয়টি এত সরল নয়। রাশিয়া কখন তীব্র হবে আর কখন লেনদেনমুখী হবে, তা নির্ভর করে সে কোন ইস্যুকে নিজের মৌলিক স্বার্থের অংশ হিসেবে দেখছে তার ওপর।
যেখানে শাসনব্যবস্থার নিরাপত্তা, প্রভাববলয়, বা কৌশলগত গভীরতার প্রশ্ন আছে, সেখানে মস্কো অনেক বড় মূল্য দিতেও প্রস্তুত। কিন্তু যেখানে বিষয়টি অস্তিত্বগত নয়, সেখানে তার আচরণ বেশি ব্যবহারিক, নমনীয় এবং দর-কষাকষিভিত্তিক। এই দ্বৈততা না বুঝলে রাশিয়াকে কখনও অতিরিক্ত ভয়ঙ্কর, কখনও আবার অতিরিক্ত দুর্বল বলে ভুল বিচার করা হয়।
পশ্চিমা বিশ্বের ভুল কোথায়
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই। যদি পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়ার উদ্দেশ্য সঠিকভাবে না বোঝে, তাহলে তার নীতিগত প্রতিক্রিয়াও ভুল হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। এই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সেই ভুল কয়েকটি স্তরে দেখা যায়।
প্রথমত, উত্তেজনা কত দূর যেতে পারে সে বিষয়ে প্রস্তুতির ঘাটতি থাকে। যদি ধরে নেওয়া হয় রাশিয়া অযৌক্তিক, তাহলে নীতি-প্রতিক্রিয়া হয় সতর্ক কিন্তু অস্পষ্ট। আবার যদি ধরে নেওয়া হয় তার একমাত্র লক্ষ্য ক্রমাগত ভূখণ্ড দখল, তাহলে প্রতিরোধের কৌশলও একমাত্র মানচিত্র-ভিত্তিক হয়ে পড়ে। অথচ রাশিয়ার বড় শক্তি অনেক সময় মানচিত্রে নয়, ভাঙনের রাজনীতিতে।
দ্বিতীয়ত, নিষেধাজ্ঞা নিয়ে অতিরিক্ত আস্থা সমস্যাজনক হতে পারে। যখন কোনো শাসনব্যবস্থা নিজের বৈধতার অংশ তৈরি করে এই দাবি থেকে যে বাইরের শক্তি তার সভ্যতা বা রাষ্ট্রকে ধ্বংস করতে চায়, তখন বাইরের অর্থনৈতিক চাপ অনেক সময় উল্টো সেই বয়ানকেই শক্তিশালী করে। এতে জনগণের চোখে শাসকগোষ্ঠী বলতে পারে—দেখো, আমরা যা বলছিলাম, সেটাই সত্য। ফলে যে চাপ শাসনকে দুর্বল করার জন্য দেওয়া হয়, তা কখনও কখনও শাসনের প্রতিরক্ষামূলক বক্তব্যকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।
তৃতীয়ত, সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ধারণা বারবার ফিরে আসে, কারণ উত্তেজনাকে প্রায়ই ভঙ্গির সমস্যা হিসেবে দেখা হয়, উদ্দেশ্যের সংঘর্ষ হিসেবে নয়। অথচ যদি দ্বন্দ্বের মূল কারণই কৌশলগত লক্ষ্যভেদ হয়, তাহলে শুধু ভাষা নরম করলেই সম্পর্কের ভিত বদলায় না।
মাঝারি শক্তি ও উদীয়মান অর্থনীতির জন্য শিক্ষা
এই বিশ্লেষণ ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকার মধ্যেই আটকে নেই। মাঝারি শক্তি ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জন্যও এর বড় তাৎপর্য আছে। কারণ রাশিয়া যখন প্রভাব বাড়ানোর জন্য ভাঙন, দুর্বলতা ও সমন্বয়হীনতাকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে, তখন যে কোনো নাজুক প্রতিষ্ঠান, বিভক্ত রাজনীতি বা দুর্বল আঞ্চলিক সহযোগিতা তার জন্য প্রবেশের দরজা খুলে দেয়।
এখানে শিক্ষা খুব স্পষ্ট: স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে হবে। শুধু সামরিক অর্থে নয়; রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, সামাজিক আস্থা, নীতিগত সমন্বয় এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও। রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি বন্ধ করাই সব সময় একমাত্র পথ নয়, কারণ যেখানে তার স্বার্থ অস্তিত্বগত নয়, সেখানে দর-কষাকষির সুযোগ থাকতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে দেশগুলো তার প্রভাব সীমিত করেও লাভ তুলতে পারে। কিন্তু সেই সম্পর্ক হতে হবে চোখ বুজে নয়, ঝুঁকি বুঝে।
কারণ বিভক্ত সমাজকে চাপ দেওয়া সহজ, দুর্বল প্রতিষ্ঠানকে আটকে দেওয়া সহজ, আর ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন সমন্বয়কে ভেঙে ফেলা আরও সহজ। রাশিয়া এই সত্য খুব ভালোভাবেই বোঝে, এবং বারবার দেখিয়েছে কীভাবে সমন্বয় নষ্ট করে, বিভাজন গভীর করে, এবং প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে নিজের জন্য জায়গা তৈরি করা যায়।
রাশিয়া আজ এমন কোনো শক্তি নয়, যে নিজের মতো করে একটি পূর্ণাঙ্গ বিকল্প বিশ্বব্যবস্থা নির্মাণ করতে পারবে। কিন্তু সে এমন একটি শক্তি, যে বিদ্যমান ব্যবস্থার ভেতরের সংহতি ক্ষয় করতে পারে, ঐক্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে, এবং প্রতিপক্ষকে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার মধ্যে রেখে দিতে পারে।
এই কারণেই রাশিয়াকে বোঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সংশোধনটি দরকার দৃষ্টিভঙ্গিতে। তাকে কেবল একটি সম্প্রসারণবাদী মানচিত্র-শক্তি হিসেবে দেখলে চলবে না, আবার পুরোপুরি অযৌক্তিক বলেও এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। বরং তাকে দেখতে হবে একটি সীমাবদ্ধ কিন্তু বিপজ্জনক ক্ষমতাসম্পন্ন রাষ্ট্র হিসেবে—যে বিশ্বকে নতুন করে গড়তে না পারলেও, বিদ্যমান কাঠামোকে নাড়িয়ে দেওয়ার মতো দক্ষতা রাখে।
পশ্চিমা বিশ্বের জন্য, এবং আসলে সবার জন্য, এখানেই মূল বার্তা: সামনে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন, চাপ, বিভাজন ও কৌশলগত ঝাঁকুনির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় শুধু শক্তি প্রদর্শন নয়; বরং ভেতরের স্থিতি, পারস্পরিক সহযোগিতা, এবং রাজনৈতিক সংহতি শক্ত করা।

