বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে সামান্য নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক থাকা এবং জি-৭ জোটের কৌশলগত মজুত থেকে জরুরি ভিত্তিতে তেল ছাড়ার ঘোষণার পর বাজারে সরবরাহসংক্রান্ত উদ্বেগ কিছুটা কমেছে। তবে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত থাকায় এই স্বস্তিকে স্থায়ী প্রবণতা হিসেবে দেখার সুযোগ তৈরি হয়নি।
মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর গ্রিনিচ মান সময় রাত ১২টা ৩ মিনিটে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৪ সেন্ট কমে ১০০ ডলার ২৮ সেন্টে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট অপরিশোধিত তেলের দাম ১১ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ১ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৮৯ ডলার ৩৩ সেন্টে নেমে আসে।
দামের এই পতন খুব বড় নয়। তবে বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সামান্য পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং তেল পরিবহণের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সাম্প্রতিক সময়ে বাজারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের অবকাঠামো লক্ষ্য করে হুথিদের ধারাবাহিক হামলার কারণে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে—এমন আশঙ্কা বাজারে রয়েছে।
এর মধ্যেই জি-৭ জোটের কৌশলগত মজুত থেকে জরুরি তেল ছাড়ার ঘোষণা বাজারে কিছুটা স্বস্তি এনেছে। জোটটি জরুরি মজুত থেকে ১০ কোটি ব্যারেল জ্বালানি ছাড়ার কথা জানিয়েছে। বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় তাৎক্ষণিক ঘাটতির আশঙ্কা কিছুটা প্রশমিত হয়েছে। ফলে ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যে তীব্র সরবরাহভীতি তৈরি হয়েছিল, সেটিও কিছুটা কমেছে।
তবে শুধু কৌশলগত মজুত থেকে তেল ছাড়ার ঘোষণাই বাজারের বর্তমান পরিস্থিতির একমাত্র কারণ নয়। সামুদ্রিক পরিবহণের সাম্প্রতিক তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিচ্ছে। সোমবার প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল পরিবহণ এখনো উল্লেখযোগ্য মাত্রায় সচল রয়েছে। গত মাসের শেষ দিকে টানা চার দিন অঞ্চলটি থেকে তেল পরিবহণের পরিমাণ সংঘাত শুরুর আগের সময়ের তুলনায় বেশি ছিল।
এই তথ্য তেলের বাজারের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও বাস্তবে প্রধান জ্বালানি পরিবহণপথগুলো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি এবং কিছু ক্ষেত্রে বিঘ্ন তৈরি হলেও তেলবাহী জাহাজের চলাচল অব্যাহত রয়েছে। ফলে বাজারে তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের সরবরাহসংকট তৈরির আশঙ্কা আপাতত কিছুটা দুর্বল হয়েছে।
তবু পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক বলা যাচ্ছে না। এর প্রধান কারণ হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য এই সমুদ্রপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ তেল আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে এই পথ ব্যবহৃত হয়। ফলে এখানে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হলে তার প্রভাব দ্রুত আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বর্তমানে বাজারে তাই দুটি বিপরীতমুখী প্রভাব একসঙ্গে কাজ করছে। একদিকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ অব্যাহত থাকা এবং জি-৭-এর জরুরি মজুত ব্যবহারের ঘোষণা দাম কমাতে সহায়তা করছে। অন্যদিকে সৌদি অবকাঠামোয় হামলা এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দামকে বড় ধরনের পতন থেকে আটকে রাখতে পারে।
এ কারণেই ব্রেন্ট ক্রুডের দাম মাত্র ৪ সেন্ট এবং ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দাম ১১ সেন্ট কমার বিষয়টিকে শুধু সাধারণ মূল্যপতন হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি বোঝা যাবে না। বরং এটি এমন একটি বাজারের প্রতিফলন, যেখানে সরবরাহ আপাতত সচল থাকলেও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
তেলের বাজার সাধারণত বর্তমান সরবরাহের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ ঝুঁকিকেও দ্রুত মূল্যের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদনকেন্দ্র, বন্দর কিংবা পরিবহণপথ হুমকির মুখে পড়লে প্রকৃত সরবরাহ বন্ধ হওয়ার আগেই বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হতে পারে। আবার সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে অথবা বড় অর্থনীতিগুলো মজুত থেকে তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলে সেই ঝুঁকির চাপ কিছুটা কমে আসে। বর্তমান বাজারে অনেকটা এমন পরিস্থিতিই দেখা যাচ্ছে।
বিশেষভাবে নজরে থাকবে সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা। সেখানে হামলার মাত্রা বাড়লে উৎপাদন বা পরিবহণ ব্যবস্থা নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি হতে পারে। একইভাবে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি হলে বর্তমান পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেলবাহী জাহাজের চলাচল যদি বর্তমান গতিতে অব্যাহত থাকে এবং জি-৭ ঘোষিত ১০ কোটি ব্যারেল জ্বালানি পর্যায়ক্রমে বাজারে আসে, তাহলে সরবরাহ নিয়ে তাৎক্ষণিক চাপ আরও কমতে পারে। সে ক্ষেত্রে বাজারের নজর ধীরে ধীরে ভূরাজনৈতিক উদ্বেগের পাশাপাশি প্রকৃত সরবরাহ ও চাহিদার হিসাবের দিকে ফিরতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতি তাই তেলের বাজারে পুরোপুরি স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে না, আবার তাৎক্ষণিক বড় সংকটের চিত্রও তুলে ধরছে না। সরবরাহব্যবস্থা এখনো কার্যকর থাকায় দাম সামান্য কমেছে, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত বাজারের ওপর ঝুঁকির ছায়া ধরে রেখেছে।
সব মিলিয়ে ৬ অক্টোবরের বাজারচিত্র বলছে, আন্তর্জাতিক তেলের বাজার আপাতত সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ব্রেন্ট ক্রুড ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ২৮ সেন্ট এবং ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট ৮৯ ডলার ৩৩ সেন্টে নেমে এলেও পরবর্তী মূল্যগত দিকনির্দেশ অনেকটাই নির্ভর করবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ কতটা নির্বিঘ্ন থাকে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের পরিস্থিতি কেমন হয় এবং জি-৭-এর জরুরি মজুত থেকে তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত বাজারে কত দ্রুত কার্যকর প্রভাব ফেলে তার ওপর।
অর্থাৎ, আপাতত দামে কিছুটা স্বস্তি মিললেও আন্তর্জাতিক তেলের বাজার থেকে অনিশ্চয়তা এখনো দূর হয়নি।

