কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সমঝোতা হয়েছে বা হতে যাচ্ছে, এমন গুঞ্জন চলছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। তবে এ ধরনের কোনো জোট বা বোঝাপড়ার সম্ভাবনা সরাসরি নাকচ করেছে জামায়াত। দলটির বক্তব্য, ফ্যাসিবাদের সঙ্গে কোনো আপসের সুযোগ নেই।
জামায়াতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং একসময়ের মিত্র বিএনপির সঙ্গে দলটির চলমান টানাপোড়েনকে ঘিরে এই আলোচনা নতুন করে জোর পেয়েছে।
গত ১ অক্টোবর ফেনীর ফুলগাজীতে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করতে স্বৈরাচার ও গুপ্তদল আবার একত্র হয়েছে। উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে এবং বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে তিনি জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
এর আগে জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের সরকারি বাসভবনে ‘জুলাই এখনো শেষ হয়নি’ শিরোনামে একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনী হয়। সেটি ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়। প্রদর্শনীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণের ছবি থাকলেও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কোনো ছবি ছিল না। এ নিয়ে প্রশ্ন তোলে বিএনপি। পরে জামায়াতের পক্ষ থেকে এর ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। এরপর থেকেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের কথিত ‘অ্যালায়েন্স’ নিয়ে আলোচনা বাড়তে থাকে।
জামায়াতের সাম্প্রতিক কর্মসূচির প্রকাশ্য বক্তব্যে মূলত কয়েকটি দাবি সামনে এসেছে। এর মধ্যে আছে জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার, নিত্যপণ্যের দাম, জ্বালানি সংকট এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। সেপ্টেম্বরে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রংপুরে লংমার্চ করে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। কর্মসূচির কেন্দ্রেও ছিল এসব দাবি।
নির্বাচন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে বিভিন্ন দলের মাঠপর্যায়ের নেতাদের মধ্যে যোগাযোগের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। আওয়ামী লীগের তৃণমূলের কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন, গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের সময় জামায়াতের একটি অংশ তাঁদের স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। তাঁদের দাবি, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরেও একই ধরনের যোগাযোগের চেষ্টা চলছে। এ দাবির বিষয়ে জামায়াতের আলাদা কোনো প্রতিক্রিয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য ধারাবাহিকভাবে মাঠে কর্মসূচি পালন করছে। জোটের একাধিক সূত্র জানায়, গত আগস্টে গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ নানা দাবিতে জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সারা দেশে লংমার্চ কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামে। এর ধারাবাহিকতায় আরও তিনটি বিভাগে লংমার্চ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
জোটের একটি সূত্র জানায়, আগামী ১৪ নভেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশের যে দিনক্ষণ ঠিক করা আছে, তা বদলে যেতে পারে। দেশজুড়ে লংমার্চ চলায় এ পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ঘোষিত চার বিভাগের কর্মসূচির সঙ্গে বরিশাল, রাজশাহী ও ময়মনসিংহ বিভাগেও লংমার্চ যুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা চলছে। শিগগিরই দিনক্ষণ চূড়ান্ত করে জানানো হবে। লংমার্চ শেষে ডিসেম্বরে ঢাকার মহাসমাবেশ থেকে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা হতে পারে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত জোট ৭৭টি আসন পেয়ে বিরোধী দলের আসনে বসেছে। সংরক্ষিত আসনে আছেন আরও ১২ জন নারী সংসদ সদস্য। সংসদের ভেতরে সরকারের নীতিনির্ধারণ ও আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় নজরদারি, বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন তোলা এবং সংসদীয় কমিটিতে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি রাজপথেও কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার কৌশল নিয়ে জোটের মধ্যে আলোচনা চলছে।
আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের মানবজমিনকে বলেন, দেশ ও জাতি একটি সুষ্ঠু, সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক পরিবেশ দেখতে চায়। তাঁর ভাষ্য, ফ্যাসিবাদ দেশের অনেক ক্ষতি করেছে। এখন ক্ষমতায় থেকে কেউ ফ্যাসিবাদের বয়ান আওড়ালে তা ওই ব্যক্তি, তাঁর দল ও দেশবাসী, কারও জন্যই কল্যাণকর হবে না। তিনি এটিকে হতাশাজনক বলেও উল্লেখ করেন।
আওয়ামী লীগের সঙ্গে অ্যালায়েন্সের কোনো সুযোগ নেই জানিয়ে এই নেতা বলেন, জনগণকে যারা হত্যা করেছে এবং ২০২৪ সালের গণহত্যার দায়ে যাঁরা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি, তাঁদের যথাযথ বিচারের ব্যবস্থা দেশবাসীই করবে। জামায়াত দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে সেই প্রস্তুতি রেখেছে। ফ্যাসিবাদের সঙ্গে কোনো ধরনের আপসের সুযোগ নেই। যারা হত্যাকারী ও ফ্যাসিবাদী, তারা দেশ ও জাতির শত্রু।
জুবায়ের আরও বলেন, জামায়াতে ইসলামী জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন করছে। তাদের রাজনীতি অত্যন্ত স্পষ্ট ও স্বচ্ছ। তিনি জানান, দলটি সব সময় স্বচ্ছ ও সুন্দর রাজনীতি করে আসছে এবং এটাই তাদের নীতি।

