বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্রে ইন্দো-পেসফিক অঞ্চল এখন কেবল একটি ভৌগোলিক পরিভাষা নয়, বরং বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, সামুদ্রিক ও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বড় রণাঙ্গন। এই পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বঙ্গোপসাগরের উত্তর প্রান্তে অবস্থিত কৌশলগত অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। দ্য ডেইলি অবজারভার-এ প্রকাশিত রাফসান জানির একটি বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধের আলোকে বলা যায়, ইন্দো-পেসফিক অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান এই ক্ষমতার লড়াইয়ের মাঝে বাংলাদেশ কীভাবে তার জাতীয় স্বার্থ, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এবং অর্থনৈতিক সুযোগগুলো রক্ষা করবে, সেটাই এখন দেশের নীতিনির্ধারকদের সামনে সবচেয়ে বড় নীতিগত প্রশ্ন। ২০২৩ সালে ঘোষিত ১৫ দফার ইন্দো-পেসফিক আউটলুকের মূল নীতিগুলোকে সামনে রেখে বাংলাদেশকে এখন কেবল কূটনৈতিক বিবৃতি নয়, বরং প্রকৃত জাতীয় সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ অনুভব করতে হবে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কৌশলগত সম্পদ হলো এর ভৌগোলিক অবস্থান। ভারত মহাসাগরকে বৃহত্তর আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুটগুলোর ঠিক প্রবেশদ্বারে বসে রয়েছে আমাদের দেশ। এই প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতিতে দেশের সমুদ্রবন্দর, উপকূলীয় অঞ্চল এবং লজিস্টিকস নেটওয়ার্কগুলোর গুরুত্ব এখন কেবল সাধারণ উন্নয়ন প্রকল্পের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই; এগুলো সরাসরি দেশের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক সুরক্ষার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ইন্দো-পেসফিকে সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও নিরাপদ সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ শৃঙ্খল বজায় রাখা এখন অত্যন্ত জরুরি। এর ফলে একদিকে যেমন আঞ্চলিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের ভূমিকা জোরালো হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে বড় শক্তিগুলোর নজরদারি ও কৌশলগত আগ্রহও বহুলাংশে বেড়ে গেছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতি ও অর্থনৈতিক বাস্তুতন্ত্রের সবচেয়ে বড় অংশজুড়ে রয়েছে চীন। দেশের শিল্পখাত কাঁচামাল এবং মধ্যবর্তী পণ্যের জন্য চীনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক একটি নতুন মাত্রায় উন্নীত হয়েছে, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি অভিন্ন ভবিষ্যতের রূপরেখা এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ নিয়ে কাজ চলছে। তবে এই গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি কৌশলগত সতর্কতা বজায় রাখাও সমানভাবে প্রয়োজন। অন্যদিকে, নিকটতম প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের সঙ্গে সীমান্ত, অভিন্ন নদী, জ্বালানি ও নিরাপত্তার স্বার্থ গভীরভাবে সংযুক্ত। চীন ও ভারতের এই দ্বান্দ্বিক প্রতিযোগিতাকে কোনোভাবেই জিরো-সাম গেম হিসেবে দেখা বাস্তবসম্মত নয়। দিল্লির আঞ্চলিক বাজার এবং বেইজিংয়ের শিল্প উৎপাদন ক্ষমতা; উভয়কেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির স্বার্থে সুষমভাবে কাজে লাগাতে হবে।
আমেরিকার পরিবর্তিত বাণিজ্য নীতির আওতায় বাংলাদেশের সাথে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি বা পারসিপ্রোকাল ট্রেড এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষরের বিষয়টির মাধ্যমে অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশে সম্পূর্ণ নতুন একটি মাত্রা যোগ হয়েছে। ঐতিহ্যগত নিরাপত্তা চিন্তার বাইরে গিয়ে এখন বাণিজ্য নীতি, বাজার প্রবেশাধিকার এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তাই হয়ে উঠেছে মূল কৌশলগত হাতিয়ার। একই সঙ্গে জাপানের সঙ্গে সদ্য জোরদার হওয়া কৌশলগত অংশীদারিত্ব এবং বিগ-বি (BIG-B) উদ্যোগ বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং গ্রিন এনার্জি খাতের প্রসারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বৈশ্বিক বাজারের এই পরাশক্তিগুলোকে প্রতিপক্ষ হিসেবে না দেখে বরং অর্থনৈতিক পারস্পরিকতার জালে যুক্ত রাখাই ঢাকার মূল কূটনৈতিক দক্ষতা।
বিশ্লেষকদের মতে, কেবল ‘ভারসাম্য রক্ষা’ বা ব্যালেন্সিং পলিসি বললেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। বাংলাদেশকে তার নিজস্ব অর্থনৈতিক সক্ষমতা, সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং ব্লু-ইকোনমি বা নীল অর্থনীতির পরিধি বহুগুণ বাড়াতে হবে। শুধু অবকাঠামো নির্মাণে আটকে না থেকে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের একটি অপরিহার্য ও নির্ভরযোগ্য অংশ হয়ে উঠতে হবে। বিমসটেক (BIMSTEC) এবং আইওরা (IORA)-এর মতো বহুপক্ষীয় ফোরামগুলোতে জোরালো ভূমিকা পালনের মাধ্যমে অতিরিক্ত নির্ভরতা এড়িয়ে বহুমাত্রিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলাই হবে ভবিষ্যতের মূল চাবিকাঠি। ইন্দো-পেসফিক অঞ্চলের এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনার বিকল্প নেই।

