বিশ্ব অর্থনীতি এখন এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যখন পুরোনো নিয়মে আর নতুন সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। জলবায়ু সংকট, জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য ও পানি ব্যবস্থাপনা, জনস্বাস্থ্য, বৈশ্বিক ঋণচাপ এবং জীবনযাত্রার ব্যয়—সবকিছু মিলিয়ে অর্থনীতি এখন কেবল বাজারের ওঠানামার বিষয় নয়। এটি রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগ, ন্যায়বিচার এবং মানুষের জীবনমানের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক অবস্থান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বহু দশক ধরে সংস্থাটি উন্নয়নশীল দেশগুলোকে অর্থনীতিতে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ কমানোর পরামর্শ দিয়ে এসেছে। কিন্তু ২০২৬ সালের বসন্তকালীন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংক বৈঠকের আগে আলোচনার বড় বিষয় হয়ে ওঠে—বিশ্বব্যাংক এখন শিল্পনীতির পক্ষে কথা বলছে। অর্থাৎ, রাষ্ট্র শুধু বাজার ব্যর্থ হলে সামান্য মেরামত করবে—এই পুরোনো ধারণা থেকে সংস্থাটি কিছুটা সরে আসছে।
তবে এই পরিবর্তন কতটা গভীর, সেটিই আসল প্রশ্ন। বিশ্বব্যাংক স্বীকার করছে যে শিল্পনীতি সব সময় ব্যর্থতার পথ নয়; বরং সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটি উন্নয়ন, উৎপাদন, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো, সংস্থাটি এখনো শিল্পনীতিকে সীমিত, সাময়িক এবং নির্দিষ্ট খাতে প্রয়োগযোগ্য একটি ব্যবস্থা হিসেবে দেখছে। অথচ একুশ শতকের চ্যালেঞ্জগুলো খাতভিত্তিক নয়; এগুলো পুরো অর্থনীতির কাঠামো বদলানোর দাবি রাখে।
১৯৯৩ সালে প্রকাশিত পূর্ব এশীয় মিরাকল প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক শিল্পনীতির ব্যাপারে সতর্ক অবস্থান নিয়েছিল। তখন বাজারনির্ভর উন্নয়নকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, কেবল বাজারের ওপর নির্ভর করে উন্নয়নশীল দেশগুলো টেকসই অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশই রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা, লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগ, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রপ্তানিমুখী শিল্পায়নের মাধ্যমে উন্নয়নের পথে এগিয়েছে। ফলে আজ বিশ্বব্যাংকের নতুন অবস্থান আসলে সেই বাস্তবতারই স্বীকৃতি।
কিন্তু শুধু স্বীকৃতি যথেষ্ট নয়। নতুন সিদ্ধান্ত মানেই নতুন অর্থনীতি নয়। অর্থনীতির চিন্তাধারায় যদি মৌলিক পরিবর্তন না আসে, তাহলে পুরোনো কাঠামোর ভেতরে সামান্য নীতি পরিবর্তন বড় ফল দেবে না। রাষ্ট্রকে শুধু বাজারের ভুল সংশোধনকারী হিসেবে দেখলে চলবে না। রাষ্ট্রকে বাজার গঠনকারী, বিনিয়োগ নির্দেশক এবং জনস্বার্থ রক্ষাকারী সক্রিয় শক্তি হিসেবে দেখতে হবে।
এখানেই নতুন অর্থনীতির মূল প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ: আমরা কী ধরনের অর্থনীতি গড়তে চাই? এমন অর্থনীতি, যেখানে শুধু মুনাফা বাড়বে? নাকি এমন অর্থনীতি, যেখানে উৎপাদন, কর্মসংস্থান, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য, ন্যায্যতা এবং সামাজিক নিরাপত্তা একসঙ্গে গুরুত্ব পাবে? রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ কোন জনস্বার্থকে সামনে রেখে পরিচালিত হবে? বেসরকারি খাতকে সহায়তা দিলে তার বিনিময়ে সমাজ কী পাবে? এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া শিল্পনীতি কেবল ভর্তুকি বা করছাড়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে।
বিশ্বব্যাংক এখন বলছে, বেসরকারি খাতকে সহায়তা দিলে তার সঙ্গে শর্ত থাকতে হবে। ভালো কাজ করলে প্রণোদনা, আর ব্যর্থ হলে সহায়তা প্রত্যাহার—এ ধরনের নীতি দরকার। এটি ইতিবাচক দিক। কারণ রাষ্ট্রীয় অর্থ বা সহায়তা কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত লাভ বাড়ানোর জন্য নয়; এর লক্ষ্য হওয়া উচিত উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি, নতুন প্রযুক্তি তৈরি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামগ্রিক অর্থনীতির শক্তি বাড়ানো।
তবে এখানেও সীমাবদ্ধতা আছে। বিশ্বব্যাংক এখনো রাজস্বনীতি বা সরকারি ব্যয়ের সক্ষমতাকে একটি স্থির সীমা হিসেবে ধরে। যেন রাষ্ট্রের হাতে আগে থেকেই নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গা আছে, তার বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তবে উৎপাদনশীল বিনিয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্র নিজেই আর্থিক সক্ষমতা তৈরি করতে পারে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জ্বালানি, পানি, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোতে সঠিক বিনিয়োগ ভবিষ্যতের আয়, উৎপাদন এবং স্থিতিশীলতা বাড়ায়। তাই রাজস্ব সক্ষমতা শুধু বাজারের নির্ধারিত সীমা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ফল।
জ্বালানি রূপান্তর, পানি নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা—এসব বিষয় কোনো একক খাতের সমস্যা নয়। এগুলো পুরো অর্থনীতিকে জড়িয়ে রাখে। তাই এগুলোর জন্য দরকার মিশনভিত্তিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনা। অর্থাৎ, শুধু কোনো একটি শিল্পকে সহায়তা করা নয়; বরং একটি বড় জাতীয় লক্ষ্য নির্ধারণ করে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ, গবেষণা, অবকাঠামো, শিক্ষা ও নীতিকে একসঙ্গে যুক্ত করা।
বিশ্বব্যাংক নিজেও এখন মিশনভিত্তিক ভাষা ব্যবহার করছে। আফ্রিকায় বিদ্যুৎ সুবিধা বাড়ানোর জন্য মিশন ৩০০ এবং পানি নিরাপত্তা নিয়ে ওয়াটার ফরওয়ার্ড—এ ধরনের উদ্যোগ বড় সমস্যাকে কেন্দ্র করে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, লক্ষ্য বড় হলেও কাঠামো এখনো খাতভিত্তিক রয়ে গেছে। অর্থাৎ সমস্যা পুরো ব্যবস্থার, কিন্তু সমাধানের পদ্ধতি এখনো সংকীর্ণ।
শুধু বিশ্বব্যাংক নয়, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা দেখা যায়। সংস্থাটির নিজস্ব অর্থনীতিবিদরাও দেখিয়েছেন যে কঠোর ব্যয়সংকোচন ও অতিরিক্ত উদারীকরণ সব সময় কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন আনে না। তবুও বাস্তব নীতিতে সেই শিক্ষা ধারাবাহিকভাবে প্রতিফলিত হয়নি। ফলে নীতির ভাষা বদলালেও কার্যক্রমের ধরনে পুরোনো অর্থনীতির প্রভাব থেকে যায়।
এই দুই প্রতিষ্ঠান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কেন্দ্রে অবস্থান করে। তারা শুধু পরামর্শ দেয় না; তারা নির্ধারণ করে কোন দেশ কতটা ঋণ পাবে, কী শর্তে পাবে, কোন দেশের ঋণ টেকসই বলে বিবেচিত হবে, কোন ধরনের সরকারি বিনিয়োগ বিশ্বাসযোগ্য ধরা হবে এবং কোন দেশের নীতিগত স্বাধীনতা সীমিত হবে। তাই তাদের অর্থনৈতিক চিন্তাধারা উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভবিষ্যতের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
তবে এই পুরোনো অর্থনীতির ক্ষতি শুধু দরিদ্র দেশগুলোতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রেও একই ধরনের চিন্তা বহু বছর ধরে সরকারি বিনিয়োগ কমিয়েছে, জনসেবা দুর্বল করেছে, মজুরিকে চাহিদা তৈরির শক্তি না ভেবে শুধু খরচ হিসেবে দেখেছে এবং পরিবারগুলোকে বাজারের ধাক্কার মুখে অরক্ষিত রেখে দিয়েছে। এর ফল এখন জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট এবং রাজনৈতিক অস্থিরতায় স্পষ্ট।
যখন সাধারণ মানুষ দেখে যে তাদের আয় বাড়ছে না, জনসেবা দুর্বল হচ্ছে, ঘরভাড়া ও জ্বালানি খরচ বাড়ছে, তখন অর্থনৈতিক অসন্তোষ রাজনৈতিক ক্ষোভে পরিণত হয়। অনেক দেশে এই ক্ষোভ ডানপন্থী উগ্র রাজনীতিকে শক্তিশালী করেছে। অর্থাৎ উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর চাপিয়ে দেওয়া নীতির ব্যর্থতা আজ ধনী দেশগুলোর ভেতরেও ফিরে এসেছে।
ইউরোপের ২০২২ সালের জ্বালানি ধাক্কা এই বাস্তবতার বড় উদাহরণ। ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলো এবং যুক্তরাজ্য অতিরিক্ত ১.৮ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়ের মুখে পড়ে। এই খরচের বড় অংশ সরকারি বাজেট বহন করে, আর বেশি দামের সুবিধা যায় শেয়ারহোল্ডারদের কাছে। এতে বোঝা যায়, বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা সাধারণ মানুষ ও রাষ্ট্রের ওপর চাপ বাড়ায়, কিন্তু লাভের বড় অংশ বেসরকারি মালিকানার দিকে চলে যায়।
এই পরিস্থিতিতে স্পেন একটি ভিন্ন উদাহরণ দেখিয়েছে। দেশটি জ্বালানি নিরাপত্তাকে শুধু ভর্তুকির বিষয় হিসেবে দেখেনি; বরং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় মিশন হিসেবে নিয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের ফলে দেশটি এখন তার বিদ্যুতের অর্ধেকের বেশি নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদন করছে। এর ফলে সাম্প্রতিক জ্বালানি ধাক্কায় স্পেন অনেক প্রতিবেশী দেশের তুলনায় বেশি সুরক্ষিত ছিল।
এই উদাহরণ দেখায়, অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা কোনো দুর্ঘটনাজনিত সাফল্য নয়; এটি পরিকল্পনা, বিনিয়োগ ও নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গির ফল। রাষ্ট্র যদি দীর্ঘমেয়াদি জনস্বার্থকে সামনে রেখে বাজারকে দিকনির্দেশনা দেয়, তাহলে অর্থনীতি শুধু বড় হয় না, বরং বেশি নিরাপদ ও ন্যায্য হয়।
এখন দরকার এমন অর্থনৈতিক কাঠামো, যেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু সংকটের সময় উদ্ধারকর্তা নয়; বরং ভবিষ্যৎ নির্মাণের সক্রিয় চালিকা শক্তি। রাষ্ট্রের বিনিয়োগ সক্ষমতা, নীতি সমন্বয়, বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং জনস্বার্থ রক্ষার ক্ষমতা বাড়াতে হবে। অর্থায়ন ব্যবস্থাকে শুধু ঋণের অনুপাত দিয়ে বিচার না করে জাতীয় মিশন, উৎপাদনশীলতা, পরিবেশগত নিরাপত্তা এবং সামাজিক ন্যায্যতার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
নতুন অর্থনীতির ভিত্তি হওয়া উচিত ন্যায়বিচার, সমতা, স্থায়িত্ব এবং বৈশ্বিক সংহতি। শুধু প্রবৃদ্ধি বাড়লেই উন্নয়ন হয় না। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা মানুষের জীবনে নিরাপত্তা আনে, বৈষম্য কমায়, পরিবেশ রক্ষা করে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সক্ষম অর্থনীতি তৈরি করে।
গ্লোবাল প্রগ্রেসিভ মোবিলাইজেশন এবং একুশ শতকের নতুন অর্থনীতি বিষয়ক বৈশ্বিক পরিষদের মতো উদ্যোগগুলো এই নতুন চিন্তার দিকেই ইঙ্গিত করছে। মারিয়ানা মাজ্জুকাতো ও কার্লোস কুয়েরপোসহ নীতিনির্ধারক ও অর্থনীতিবিদরা এমন একটি কাঠামো তৈরির কথা বলছেন, যেখানে অর্থনীতি শুধু বাজারের ভাষায় নয়, জনকল্যাণের ভাষায় পরিচালিত হবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, শিল্পনীতির পক্ষে বিশ্বব্যাংকের অবস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। কিন্তু এটি শেষ কথা নয়। আসল পরিবর্তন তখনই আসবে, যখন আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রকে দুর্বল করার বদলে সক্ষম করবে, জনস্বার্থভিত্তিক বিনিয়োগকে সন্দেহের চোখে না দেখে উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করবে, এবং বাজারকে একমাত্র সমাধান না ভেবে মানুষের প্রয়োজনকে অর্থনীতির কেন্দ্রে রাখবে।
একুশ শতকের অর্থনীতি তাই শুধু নতুন নীতি চায় না; চায় নতুন কল্পনা। এমন কল্পনা, যেখানে রাষ্ট্র, বাজার ও সমাজ একসঙ্গে কাজ করে। যেখানে উন্নয়ন মানে শুধু পরিসংখ্যান নয়, বরং মানুষের জীবন, নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। পুরোনো অর্থনীতির সীমাবদ্ধতা এখন স্পষ্ট। নতুন অর্থনীতির যুক্তি ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। এখন প্রয়োজন সেই যুক্তিকে বাস্তব নীতিতে রূপ দেওয়ার সাহস।
সিভি/এইচএম

