দশকের পর দশক ধরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য একটি সাধারণ ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল—রাজনৈতিক উত্তেজনা বা রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিরোধ থাকলেও পণ্যবাহী জাহাজ গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ দিয়ে চলাচল করতে পারবে। যুদ্ধ ও কূটনৈতিক বিরোধের মধ্যেও সমুদ্রপথকে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য যতটা সম্ভব উন্মুক্ত রাখা হবে।
কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই ধারণাকে ক্রমেই দুর্বল করে দিচ্ছে। লোহিত সাগর, কৃষ্ণসাগর, হরমুজ প্রণালি, সুয়েজ খাল এবং পানামা খালের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ এখন শুধু পণ্য পরিবহনের মাধ্যম নয়; এগুলো বড় শক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক চাপ, সামরিক প্রতিযোগিতা এবং দর-কষাকষির হাতিয়ারেও পরিণত হচ্ছে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে সংঘাত শুরু হলে তার প্রভাব শুধু আশপাশের দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের দেশেও পণ্য পৌঁছাতে দেরি হয়, পরিবহন ব্যয় বাড়ে, জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বেড়ে যায় এবং সাধারণ মানুষকে সেই বাড়তি মূল্য দিতে হয়।
বাংলাদেশের মতো আমদানি ও রপ্তানিনির্ভর দেশের জন্য এ ধরনের সংকট আরও বেশি উদ্বেগজনক। দেশের জ্বালানি, সার, খাদ্যপণ্য ও শিল্পের কাঁচামালের বড় অংশ সমুদ্রপথে আসে। একইভাবে তৈরি পোশাকসহ রপ্তানি পণ্যও জাহাজে করে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য বাজারে পাঠানো হয়। ফলে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ কোনো সমুদ্রপথে অস্থিরতা তৈরি হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি সরাসরি চাপের মুখে পড়ে।
বিশ্বের বাণিজ্যধমনিগুলো কেন চাপে
বিশ্ববাণিজ্যের বড় অংশ কয়েকটি সংকীর্ণ সামুদ্রিক পথের ওপর নির্ভরশীল। ভৌগোলিকভাবে এসব পথ সরু হলেও অর্থনৈতিকভাবে এগুলোর গুরুত্ব বিশাল। একটি প্রণালি বা খাল দিয়ে প্রতিদিন শত শত জাহাজ যাতায়াত করে। এসব জাহাজে থাকে অপরিশোধিত তেল, তরলীকৃত গ্যাস, খাদ্যশস্য, সার, শিল্পের কাঁচামাল এবং ভোগ্যপণ্য।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করা এই প্রণালিতে যেকোনো বাধা সৃষ্টি হলে প্রথম এবং সবচেয়ে বড় আঘাত পড়ে এশিয়ার দেশগুলোর ওপর।
কারণ এশিয়ার অনেক দেশ জ্বালানির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। বাংলাদেশও মধ্যপ্রাচ্য থেকে অধিকাংশ জ্বালানি ও সারের চালান আনতে হরমুজ এবং বাব এল-মান্দেব প্রণালির ওপর নির্ভর করে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে হরমুজ প্রণালিকে তুলনামূলক নিরাপদ ও স্থিতিশীল পথ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু সংঘাত শুরু হওয়ার পর এই গুরুত্বপূর্ণ পথটি আবারও আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে।
সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা কমে যায়, যুদ্ধঝুঁকির বিমা ব্যয় বেড়ে যায় এবং জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য হয়। এতে শুধু তেল ও গ্যাস সরবরাহই বাধাগ্রস্ত হয় না, বরং বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্য নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
লোহিত সাগর ও কৃষ্ণসাগরে একই সংকট
হরমুজ প্রণালি একমাত্র ঝুঁকিপূর্ণ সামুদ্রিক পথ নয়। লোহিত সাগর ও কৃষ্ণসাগরও যুদ্ধ এবং সামরিক সংঘাতের কারণে বারবার অনির্ভরযোগ্য হয়ে উঠছে।
২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে কৃষ্ণসাগরে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে বাংলাদেশে গম, সার ও রাসায়নিক পণ্যের সরবরাহ কমে যায়। কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চল বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যশস্য ও সারের উৎস হওয়ায় সেখানে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার প্রভাব দ্রুত আন্তর্জাতিক বাজারে ছড়িয়ে পড়ে।
২০২৪ সালে হুতিদের জাহাজে হামলার কারণে লোহিত সাগরের পথও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য ইউরোপে পাঠাতে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায় এবং অনেক জাহাজকে দীর্ঘ বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হয়।
এখন দুই সমুদ্রপথই আবার বিশ্ববাণিজ্যের জন্য অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। হরমুজ সংকট চলার মধ্যেই ইরান-সমর্থিত হুতিরা সৌদি আরবের একটি তেলবাহী জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এই ঘটনার পর বিশ্বের অনেক বড় জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান লোহিত সাগরের পথ এড়িয়ে চলতে শুরু করেছে।
অন্যদিকে ইউক্রেন রাশিয়ার জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা বাড়ানোর পর কৃষ্ণসাগরের রুশ জলসীমায় নৌচলাচল আবারও বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে।
একই সময়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি হওয়ায় বিশ্বের বাণিজ্যব্যবস্থা বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। একটি পথ বন্ধ হলে জাহাজ অন্য পথ ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু একসঙ্গে কয়েকটি পথ অনিরাপদ হয়ে উঠলে বিকল্পের সংখ্যাও কমে যায়।
সমুদ্রপথকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার নতুন নয়
ভূরাজনৈতিক সংঘাতে সমুদ্রপথকে চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা ইতিহাসে নতুন ঘটনা নয়। প্রাকৃতিক প্রণালি এবং মানুষের তৈরি খাল—দুই ধরনের পথই অতীতে রাজনৈতিক ও সামরিক বিরোধের কেন্দ্র হয়েছে।
মিসরের নিয়ন্ত্রণাধীন সুয়েজ খাল ১৯৫০-এর দশক থেকে মিসর, ইসরায়েল, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং কয়েকটি আরব দেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনটি বড় যুদ্ধের কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। একটি ঘটনায় খালটি টানা আট বছর বন্ধ ছিল।
সুয়েজ খাল ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত সামুদ্রিক সংযোগগুলোর একটি। এটি বন্ধ হলে জাহাজকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে যেতে হয়। এতে যাত্রার সময় ও জ্বালানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
পানামা কয়েক দশক আগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে পানামা খালের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পেলেও সেখানে চীনের শক্তিশালী উপস্থিতি নিয়ে দেশটি এখনো যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে রয়েছে।
এসব ঘটনা দেখায়, একটি সামুদ্রিক পথের আইনগত নিয়ন্ত্রণ কোনো দেশের হাতে থাকলেও তার অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্বের কারণে বড় শক্তিগুলো সেই পথের ব্যবস্থাপনায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে।
হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক আইনের পরীক্ষা
মানুষের তৈরি খাল সাধারণত একটি নির্দিষ্ট দেশের নিয়ন্ত্রণে থাকে। কিন্তু আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য ব্যবহৃত প্রাকৃতিক প্রণালিগুলোকে বিশ্ববাণিজ্যের অভিন্ন পথ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সমুদ্র আইনবিষয়ক জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক প্রণালি দিয়ে জাহাজের নিরীহ বা অবাধ চলাচলের অধিকার রয়েছে। উপকূলীয় দেশগুলোর এই চলাচল বাধাগ্রস্ত না করার কথা এবং জাহাজ চলাচলের জন্য বাধ্যতামূলক পথকর আরোপ করার সুযোগও সীমিত।
কিন্তু যুদ্ধ শুরু হলে আইনের এই সুরক্ষা অনেক সময় কার্যকর থাকে না। হরমুজ প্রণালির বর্তমান পরিস্থিতি তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
জুন মাসে একটি অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি হলেও তা এখন কার্যত অকার্যকর এবং বারবার লঙ্ঘিত হচ্ছে। ফলে প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিরোধের অন্যতম প্রধান বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তারক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায় এবং ইরানের বন্দর ও জাহাজ চলাচলের পথের বিরুদ্ধে পুনরায় নৌ অবরোধ দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। এর বিপরীতে ইরান প্রণালিটির ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেছে।
ইরান ও ওমান প্রণালিটি পরিচালনা এবং কিছু অনির্দিষ্ট সেবার জন্য অর্থ সংগ্রহের অধিকার দাবি করছে। যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য হলো, জাহাজের কাছ থেকে বাধ্যতামূলক অর্থ নেওয়া আন্তর্জাতিক প্রণালিতে চলাচলের অধিকারসংক্রান্ত আইনের লঙ্ঘন হবে।
মঙ্গলবার ওমান আঞ্চলিকভাবে প্রণালি পরিচালনা এবং জাহাজ থেকে স্বেচ্ছামূলক অর্থ সংগ্রহের একটি পরিকল্পনা দিয়েছে। এই প্রস্তাব মালাক্কা প্রণালির ব্যবস্থাপনার সঙ্গে কিছুটা মিল রয়েছে।
মালাক্কা প্রণালির উপকূলবর্তী ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর সমুদ্রপথটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য নিরাপদ ও উন্মুক্ত রাখার বিষয়ে সম্মত। একই সঙ্গে নৌনির্দেশনা, পরিবেশ রক্ষা এবং অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার ব্যয় বহনে জাহাজগুলোর কাছ থেকে স্বেচ্ছামূলক অর্থ চাওয়া হয়।
তবে বিশ্ববাণিজ্যের জন্য অর্থের চেয়ে নিরাপত্তাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একটি জাহাজ সামান্য অর্থ দিতে রাজি হতে পারে, কিন্তু ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, আটক বা সামরিক সংঘর্ষের ঝুঁকি নিয়ে কোনো পথে চলতে চাইবে না।
আইন থাকলেও প্রয়োগের ক্ষমতা দুর্বল
বর্তমান সংকটের মূল সমস্যা আন্তর্জাতিক আইনের অনুপস্থিতি নয়। সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল, উপকূলীয় রাষ্ট্রের অধিকার এবং আন্তর্জাতিক প্রণালি ব্যবহারের নিয়ম আগে থেকেই রয়েছে।
সমস্যা তৈরি হয় যখন এই আইন কোনো বড় রাষ্ট্রের সামরিক বা ভূরাজনৈতিক স্বার্থের মুখোমুখি হয়।
আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো দেশকে আইন মানতে আহ্বান জানাতে পারে। কিন্তু কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্র বা সামরিক গোষ্ঠী সমুদ্রপথ বন্ধ করে দিলে কিংবা জাহাজে হামলা চালালে দ্রুত এবং নিরপেক্ষভাবে আইন কার্যকর করার ব্যবস্থা দুর্বল।
একই সঙ্গে সমুদ্রপথ রক্ষার নামে কোনো একটি বড় শক্তির সামরিক উপস্থিতিও নতুন বিরোধ তৈরি করতে পারে। সংশ্লিষ্ট দেশ সেটিকে নিরাপত্তা নয়, বরং নিজের সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি হিসেবে দেখতে পারে।
ফলে নিরাপদ জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার উদ্যোগই কখনো কখনো সংঘাত আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
এই বাস্তবতা দেখায়, আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন কার্যকর রাখতে শুধু আইনি ধারা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন আঞ্চলিক সহযোগিতা, নিরপেক্ষ তদারকি এবং সংঘাতে জড়িত পক্ষগুলোর মধ্যে কার্যকর সমঝোতা।
বিকল্প পথে গেলে কতটা বাড়ে খরচ
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের তথ্য দেখায়, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে সংঘাত শুরু হলে জাহাজ চলাচল দ্রুত কমে যায়।
সাম্প্রতিক লোহিত সাগর সংঘাতের সময় সুয়েজ খাল এবং এডেন উপসাগর দিয়ে জাহাজের মোট বহনক্ষমতা ৭০ শতাংশের বেশি কমে যায়। নিরাপত্তার আশঙ্কায় জাহাজগুলো ওই এলাকা এড়িয়ে চলতে শুরু করে।
সুয়েজ খাল ব্যবহার না করে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্তের উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে গেলে একটি সাধারণ সমুদ্রযাত্রায় ১০ দিন বা তারও বেশি সময় যোগ হয়।
দীর্ঘ পথের কারণে বিশ্বজুড়ে জাহাজের বহনক্ষমতা ও অতিক্রান্ত দূরত্বের সম্মিলিত পরিমাপ প্রায় ৬ শতাংশ বেড়ে যায়।
অতিরিক্ত পথের অর্থ বেশি জ্বালানি, বেশি কর্মঘণ্টা, বেশি জাহাজভাড়া এবং পণ্য পৌঁছাতে দীর্ঘ সময়। জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো শেষ পর্যন্ত এই বাড়তি ব্যয় আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের কাছ থেকে আদায় করে।
বিভিন্ন পরিমাণগত গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, জাহাজের বিলম্ব ও পথ পরিবর্তনের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রতিবছর প্রায় ১ হাজার ৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়।
এর সঙ্গে বাড়তি পরিবহন ব্যয় হিসেবে প্রতিবছর আরও প্রায় ৩৪০ কোটি মার্কিন ডলার যোগ হয়।
এই হিসাবের বাইরেও যুদ্ধঝুঁকির বিমা, অতিরিক্ত জ্বালানি, জাহাজ ও নাবিকের নিরাপত্তা এবং পণ্য নষ্ট হওয়ার মতো ব্যয় রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য সরাসরি আঘাত
লোহিত সাগরে সর্বশেষ হামলার প্রভাব ইতিমধ্যে বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহে পড়তে শুরু করেছে।
সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশের জন্য আসা অপরিশোধিত তেলের একটি চালান নিরাপত্তার ঝুঁকির কারণে লোহিত সাগর ও বাব এল-মান্দেব প্রণালি ব্যবহার করতে পারেনি।
জাহাজটিকে জিব্রাল্টার প্রণালি হয়ে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্তের উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে বাংলাদেশে আসতে হচ্ছে। প্রায় ৯ হাজার নৌমাইলের এই অতিরিক্ত যাত্রার কারণে তেল পৌঁছাতে প্রায় এক মাস দেরি হতে পারে।
শুধু পরিবহন খাতেই বাড়তি প্রায় ৫০ লাখ মার্কিন ডলার খরচ হতে পারে। দেশের চলমান জ্বালানি সমস্যার মধ্যে এই বিলম্ব ও ব্যয় নতুন চাপ সৃষ্টি করবে।
লোহিত সাগর বাংলাদেশের সঙ্গে সৌদি আরবের বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরব শুধু অপরিশোধিত তেলের উৎস নয়, বাংলাদেশের জন্য সারেরও একটি বড় সরবরাহকারী।
এই পথে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা থাকলে জ্বালানি ও সারের সরবরাহ দেরি হতে পারে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব বিদ্যুৎ, কৃষি, শিল্প উৎপাদন এবং ভোক্তা পর্যায়ের দামের ওপর পড়বে।
বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরাও জাহাজে পণ্য পাঠানোর সময় বুকিং পেতে দেরি এবং বাড়তি ব্যয়ের অভিযোগ করছেন। বড় জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে নিরাপত্তাঝুঁকি ও বিধিনিষেধের কারণে জাহাজের চলাচল সীমিত হয়েছে।
ফলে প্রয়োজনের তুলনায় জাহাজের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। জাহাজসংকট তৈরি হলে পরিবহন ভাড়া বাড়ে এবং পণ্য পাঠানোর জন্য রপ্তানিকারকদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।
তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নতুন ঝুঁকি
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বড় বাজার ইউরোপ। ইউরোপে দ্রুত পণ্য পাঠানোর জন্য সুয়েজ খাল ও লোহিত সাগরের পথ গুরুত্বপূর্ণ।
এই পথ এড়িয়ে আফ্রিকা ঘুরে যেতে হলে পণ্য পৌঁছাতে অতিরিক্ত সময় লাগে। তৈরি পোশাক ব্যবসায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য পৌঁছানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইউরোপের পোশাক বিক্রি মৌসুম ও নির্দিষ্ট সময়ের চাহিদার ওপর নির্ভরশীল।
পণ্য পৌঁছাতে দেরি হলে ক্রেতা মূল্য কমিয়ে দিতে পারে, চালান বাতিল করতে পারে অথবা ভবিষ্যতের ক্রয়াদেশ অন্য দেশে সরিয়ে নিতে পারে।
জাহাজের বিলম্ব সামাল দিতে অনেক ক্ষেত্রে পণ্য উড়োজাহাজে পাঠাতে হয়, যার ব্যয় সমুদ্রপথের তুলনায় অনেক বেশি।
ফলে সামুদ্রিক সংঘাত বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের শুধু বর্তমান খরচ বাড়ায় না; এটি আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকেও দুর্বল করতে পারে।
বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত কে বহন করে
একটি জাহাজকে দীর্ঘ পথ ব্যবহার করতে হলে পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত জ্বালানি, কর্মী, বিমা এবং সময়ের জন্য বেশি অর্থ নেয়। আমদানিকারক সেই বাড়তি খরচ পণ্যের দামের সঙ্গে যোগ করে।
এর ফলে জ্বালানি, সার, খাদ্যশস্য, শিল্পের কাঁচামাল এবং অন্যান্য আমদানি পণ্যের দাম বেড়ে যায়।
একইভাবে রপ্তানি পণ্য পাঠানোর ব্যয় বাড়লে উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের লাভ কমে যায়। প্রতিষ্ঠান সেই ব্যয় সামাল দিতে পণ্যের দাম বাড়াতে, শ্রমিকের খরচ কমাতে কিংবা উৎপাদন সীমিত করতে পারে।
শেষ পর্যন্ত সমুদ্রপথের সংঘাতের খরচ শুধু সরকার বা বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান বহন করে না। সাধারণ ভোক্তাকেও বাড়তি মূল্য দিতে হয়।
জ্বালানির দাম বাড়লে পণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়ে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে খাদ্য ও নিত্যপণ্যের দামও বাড়ে। সার দেরিতে পৌঁছালে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে এবং খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
এই কারণে সংঘাতের স্থান বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে হলেও তার আর্থিক চাপ দেশের সাধারণ মানুষের বাজারের ব্যাগ পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
খাদ্যনিরাপত্তাও হুমকির মুখে
কৃষ্ণসাগর, লোহিত সাগর এবং হরমুজ প্রণালি শুধু জ্বালানি পরিবহনের পথ নয়। এসব পথ দিয়ে খাদ্যশস্য, সার ও কৃষির বিভিন্ন উপকরণও পরিবহন করা হয়।
কৃষ্ণসাগরে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে গম ও অন্যান্য খাদ্যশস্যের আন্তর্জাতিক সরবরাহ কমতে পারে। হরমুজ বা লোহিত সাগরে বাধা সৃষ্টি হলে সার ও জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হতে পারে।
সারের দাম বাড়লে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়ে। জ্বালানি ব্যয় বাড়লে সেচ, পরিবহন ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের খরচও বাড়ে।
এভাবে সমুদ্রপথের সংকট এক পর্যায়ে খাদ্যের মূল্য বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের দেশ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কারণ তারা আয়ের বড় অংশ খাদ্য কিনতে ব্যয় করে।
বাংলাদেশের সামনে করণীয়
বাংলাদেশ এককভাবে হরমুজ, লোহিত সাগর বা কৃষ্ণসাগরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না। তবে সম্ভাব্য ঝুঁকি কমাতে পরিকল্পিত পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব।
জ্বালানি, খাদ্যশস্য, সার এবং শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের উৎস বহুমুখী করা প্রয়োজন। একটি নির্দিষ্ট দেশ বা সমুদ্রপথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থাকলে সেই পথ বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো সরবরাহব্যবস্থা চাপের মুখে পড়ে।
জরুরি পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্রপথে বিলম্ব হলে দেশ কত দিন নিজস্ব মজুত দিয়ে চাহিদা মেটাতে পারবে, তার নিয়মিত মূল্যায়ন প্রয়োজন।
জাহাজের পথ, বন্দর এবং পরিবহন প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে রপ্তানিকারকদের বাড়তি পরিবহন ব্যয় ও বিলম্বের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে আগাম পরিকল্পনা করতে হবে।
বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিরাপদ ও অবাধ সমুদ্র চলাচলের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। ছোট ও বাণিজ্যনির্ভর দেশগুলোর সম্মিলিত কণ্ঠ জোরালো হলে বড় শক্তিগুলোর ওপর সমুদ্রপথ উন্মুক্ত রাখার চাপ বাড়তে পারে।
বিশ্বের বর্তমান বাণিজ্যব্যবস্থা এই বিশ্বাসের ওপর তৈরি হয়েছে যে রাজনৈতিক উত্তেজনা থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথগুলো সচল থাকবে।
কিন্তু সুয়েজ খাল, লোহিত সাগর, কৃষ্ণসাগর এবং হরমুজ প্রণালিতে বারবার ঘটে যাওয়া ঘটনা সেই বিশ্বাসকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
প্রতিটি বাধা জাহাজের পথ দীর্ঘ করে, পরিবহন ব্যয় বাড়ায়, পণ্য সরবরাহে বিলম্ব ঘটায় এবং বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি উসকে দেয়। একই সঙ্গে জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তাকে অনিশ্চিত করে তোলে।
আন্তর্জাতিক নিয়ম রয়েছে, কিন্তু ভূরাজনৈতিক স্বার্থের মুখে সেই নিয়ম কার্যকর করার ক্ষমতা দুর্বল। এটিই বর্তমান সংকটের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।
আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলো যদি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথকে সামরিক চাপ ও রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার হওয়া থেকে রক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করতে না পারে, তাহলে বিশ্ববাণিজ্য বারবার একই ধরনের সংকটের মুখোমুখি হবে।
আর প্রতিবার সেই সংঘাতের সবচেয়ে বড় মূল্য শুধু যুদ্ধরত দেশগুলো নয়, বিশ্বজুড়ে সাধারণ ভোক্তারাই পরিশোধ করবে।
বাংলাদেশের জন্য বার্তাটি স্পষ্ট। দূরের সমুদ্রপথে সংঘাতকে শুধু আন্তর্জাতিক রাজনীতির খবর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। হরমুজে উত্তেজনা, লোহিত সাগরে হামলা কিংবা কৃষ্ণসাগরে অবরোধ—সবকিছুর প্রভাব শেষ পর্যন্ত দেশের জ্বালানি সরবরাহ, রপ্তানি আয়, কৃষি উৎপাদন এবং নিত্যপণ্যের দামে এসে পড়ে।
সমুদ্রপথ যখন যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়, তখন কোনো দেশই সত্যিকার অর্থে সংঘাত থেকে দূরে থাকে না।

