যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেল মজুত বা স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ (এসপিআর) চার দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। দ্রুত মজুত কমে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ লবণ গুহাগুলোর স্থায়িত্ব এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত তেল উত্তোলনের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
মার্কিন জ্বালানি বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এসপিআরে মজুত তেলের পরিমাণ প্রথমবারের মতো ৩০ কোটি ব্যারেলের নিচে নেমেছে। ইরান যুদ্ধের কারণে সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র রিজার্ভ থেকে ১৭ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই উত্তোলন শেষ হলে এসপিআরে প্রায় ২৪ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেল অবশিষ্ট থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা ও টেক্সাসের উপসাগরীয় উপকূলে চারটি স্থাপনায় ৬০টি ভূগর্ভস্থ লবণ গুহায় এসপিআরের তেল সংরক্ষণ করা হয়। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, দ্রুত তেল উত্তোলনের ফলে এসব গুহার কাঠামোগত স্থায়িত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে ভবিষ্যতে বড় ধরনের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় রিজার্ভ ব্যবহারের সক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মার্কিন জ্বালানি বিভাগ বলছে, গুহাগুলো নিরাপদে পরিচালনার জন্য অন্তত ৭ কোটি ব্যারেল তেল থাকা প্রয়োজন। তবে সাবেক মার্কিন জ্বালানি উপদেষ্টা আমোস হকস্টেইন এ সীমা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, মজুত ৭ কোটি ব্যারেলে নেমে গেলে এসপিআরকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।
টেক্সাস এঅ্যান্ডএম বিশ্ববিদ্যালয়ের পেট্রোলিয়াম প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সিদ্ধার্থ মিশ্র বলেন, ৭ কোটি ব্যারেল শারীরিকভাবে প্রয়োজনীয় সর্বনিম্ন মাত্রা হলেও কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য এসপিআরে ২৫ কোটি থেকে ৩০ কোটি ব্যারেল তেল থাকা উচিত। বর্তমান মজুতের পর্যায়ে গুহাগুলোর স্থায়িত্ব ও পুরো রিজার্ভ ব্যবস্থার কার্যক্ষমতা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মিশ্রের মতে, মজুত ৩০ কোটি ব্যারেলের নিচে নেমে গেলে জরুরি সময়ে দ্রুত তেল উত্তোলনের সক্ষমতা কমে যেতে পারে। তেলের স্তর পাতলা হয়ে গেলে পাইপ ও পাম্পেরও ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
এসপিআর থেকে তেল উত্তোলনের সময় ভূগর্ভস্থ গুহায় পানি প্রবেশ করিয়ে অপরিশোধিত তেলকে ওপরে তুলে আনা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত ও বারবার পানি প্রবেশ করানোর ফলে লবণ গুহার দেয়াল ক্ষয় হতে পারে। এতে গুহার আকৃতি পরিবর্তনের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী গুহাগুলোর মধ্যবর্তী লবণের স্তম্ভ দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
মার্কিন সরকারি হিসাবরক্ষণ দপ্তর (জিএও) জানিয়েছে, বারবার আংশিক তেল উত্তোলন ও পরে মজুত পুনরায় পূরণের ফলে গুহার নির্দিষ্ট অংশে অতিরিক্ত ক্ষয় হতে পারে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে গুহাগুলোর স্থায়িত্ব কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে ২০২২ সালে বড় পরিমাণ তেল উত্তোলনের পর এসপিআরের অধিকাংশ গুহাকে ভালো অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল।
অন্যদিকে, গুহাগুলো ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে—এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে মার্কিন জ্বালানি বিভাগ। বিভাগের মুখপাত্র বেন ডাইটেরডিচ বলেন, গুহাগুলো সবসময়ই পূর্ণ থাকে; শুধু তেল ও পানির অনুপাত পরিবর্তিত হয়। ট্রাম্প প্রশাসন জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে এসপিআরকে দায়িত্বশীলভাবে পরিচালনা করছে বলেও দাবি করেন তিনি।
জিএওর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এসপিআরের মোট মজুতের এক-চতুর্থাংশের বেশি বিভিন্ন নির্মাণকাজ ও গুহা-সংক্রান্ত সমস্যার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে উত্তোলনযোগ্য ছিল না।
বিশ্লেষকদের ধারণা, এসপিআরের কার্যকর মজুতের একটি ‘নরম সীমা’ প্রায় ১৭ কোটি ব্যারেল। এর নিচে নেমে গেলে গুহার স্থায়িত্ব ও তেল উত্তোলন অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে আরও তেল ছাড়ার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
হকস্টেইন সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান মজুতের পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো বড় দুর্যোগের মুখে পড়লে ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে উপসাগরীয় উপকূলে বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানলে ৩০ কোটি ব্যারেলের নিচে থাকা এসপিআর থেকে দ্রুত তেল সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

