আগামী সেপ্টেম্বর মাসকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারী ও অর্থনীতিবিদদের নজর এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর দিকে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বিশ্বের প্রধান আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এই মাসেই সুদহার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত জানাবে, যার প্রভাব শুধু নিজ নিজ অর্থনীতিতেই নয়, ছড়িয়ে পড়বে গোটা বিশ্বে।
সেপ্টেম্বরে একাধিক শীর্ষস্থানীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়মিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যেখানে সুদহার বাড়ানো, কমানো বা অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে মুদ্রানীতি কোন দিকে মোড় নিতে পারে, তারও ইঙ্গিত মিলতে পারে এসব বৈঠক থেকে।
এবারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়াটি আগের চেয়ে জটিল, কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে নতুন একটি ঝুঁকি মাথায় রাখতে হচ্ছে—মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনা বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ও দাম নিয়ে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করেছে। জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব কেবল জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না—উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে গিয়ে শেষ পর্যন্ত তা সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দামেও প্রভাব ফেলে। এতে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি আবার মাথাচাড়া দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিও শ্লথ করে দিতে পারে।
বিশ্ববাজারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের সেপ্টেম্বরের বৈঠক। সম্প্রতি দেশটিতে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে এলেও শ্রমবাজারে দুর্বলতার লক্ষণ দেখা দেওয়ায় ফেড এবার সুদহার নিয়ে অপেক্ষাকৃত সতর্ক অবস্থান নিতে পারে। বাজার বিশ্লেষকদের প্রায় ৬৩ শতাংশ ধারণা করছেন, এবার সুদহার অপরিবর্তিতই থাকবে। তবে বছরের শেষ নাগাদ একবার বাড়ানোর সম্ভাবনাও পুরোপুরি বাতিল করা যাচ্ছে না। এদিকে কানাডার কেন্দ্রীয় ব্যাংকও আগামী মাসে সুদহার অপরিবর্তিত রাখতে পারে—গত জুনেই তারা টানা ষষ্ঠবারের মতো হার ২ দশমিক ২৫ শতাংশে ধরে রেখেছিল।
ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্তও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী ১০ সেপ্টেম্বর তারা সুদহার ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়াতে পারে। ইউরোস্ট্যাটের তথ্য বলছে, জুলাইয়ে ইউরোজোনের বার্ষিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৯ শতাংশে, যেখানে গত বছর একই সময়ে ছিল মাত্র ২ শতাংশ। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের জেরে জ্বালানির দাম বৃদ্ধিই এই চাপের মূল কারণ।
একই মাসে যুক্তরাজ্যের ব্যাংক অব ইংল্যান্ড, সুইজারল্যান্ডের সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক এবং রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকও তাদের মুদ্রানীতি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে। যুক্তরাজ্যে জুলাইয়ে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৯ শতাংশে, যা গত চার মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর সঙ্গে দেশটিতে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহ ও খরা পরিস্থিতি আগামী দিনে খাদ্যপণ্যের দাম আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই বাস্তবতায় ব্যাংক অব ইংল্যান্ড সুদহার অপরিবর্তিত রাখতে পারে বলেই ধারণা।
অন্যদিকে তুরস্কের কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগামী ১০ সেপ্টেম্বর তাদের সিদ্ধান্ত জানাবে। জুলাইয়ে তাদের সাপ্তাহিক রেপো নিলাম হার ৩৭ শতাংশেই স্থির ছিল। দেশটিতে মূল্যস্ফীতির গতি কিছুটা কমলেও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে জ্বালানির দাম ফের বাড়তে শুরু করায় এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমে যাওয়ায় লিরার তারল্য পরিস্থিতি সামলাতে ব্যাংকটি সতর্কভাবে এগোচ্ছে।
এশিয়া অঞ্চলে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হবে জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ১৮ সেপ্টেম্বরের সিদ্ধান্ত। ডলারের বিপরীতে ইয়েনের মান সম্প্রতি ৪০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমে যাওয়ার পর সরকারি হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি কিছুটা সামলানো গেলেও ইয়েন এখনো দুর্বল অবস্থায়ই রয়ে গেছে। এই সংকট মোকাবেলায় গত জুনে ব্যাংকটি সুদহার বাড়িয়ে ১ শতাংশে উন্নীত করেছিল, যা গত ৩১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। জুলাইয়ে হার অপরিবর্তিত রাখা হলেও সেপ্টেম্বরের বৈঠকে আরও ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা, এবং বছর শেষের আগে আরেক দফা বৃদ্ধির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এদিকে অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকও আগামী মাসে তাদের সুদহার অপরিবর্তিত রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে সেপ্টেম্বর মাসটি বিশ্ব আর্থিক বাজারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হতে যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির অস্থির বাজার এবং প্রবৃদ্ধি নিয়ে অনিশ্চয়তার এই সময়ে বিনিয়োগকারীরা শুধু তাৎক্ষণিক সুদহারের সিদ্ধান্তই নয়, বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার দিকেও গভীর মনোযোগ দিয়ে নজর রাখবেন।

