যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ইরানের বিরুদ্ধে একটি বড় আর্থিক পদক্ষেপ নিয়েছে। নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে কালোবাজারে অপরিশোধিত তেল বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ পাচারের অভিযোগে ৬১ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৭৪৫ কোটি টাকা) মূল্যের ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজেয়াপ্ত করতে দেওয়ানি মামলা করেছে মার্কিন বিচার বিভাগ। ম্যানহাটনের দক্ষিণ নিউইয়র্ক জেলা আদালতে সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দায়ের করা এই মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, ইরান সরকার একটি আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টোকারেন্সি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি অবৈধ তেলের অর্থ পাচার করেছে, যা ইরানের সামরিক বাহিনী, বিশেষ করে ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে অর্থায়নে ব্যবহার করা হচ্ছে।
মার্কিন প্রসিকিউটরদের অভিযোগ অনুযায়ী, চীনের দুটি প্রতিষ্ঠান; ব্লেসড ট্রাস্ট এবং হেক্সা হোয়েল; সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ বাইন্যান্সে তাদের ট্রেডিং অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে ইরানের তেল বিক্রির অর্থ পাচার করেছে। এই দুটি কোম্পানিই আবার নিজেদেরকে ‘প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা’ হিসেবে উপস্থাপন করত, ব্লেসড ট্রাস্ট নিজেকে দেখাত সম্পদ ব্যবস্থাপনা বা ভার্চুয়াল অ্যাসেট কাস্টডি প্রতিষ্ঠান হিসেবে, আর হেক্সা হোয়েল নিজেকে পণ্য দালাল বা কমোডিটি ব্রোকারেজ ফার্ম হিসেবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা ইরানের অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য বিক্রির অর্থ গ্রহণ ও স্থানান্তর করত এবং ফিয়াট মুদ্রাকে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তরের ‘অন-র্যাম্প’ সেবা দিত। এদের ক্লায়েন্টদের মধ্যে ছিল চীনের পেট্রোলিয়াম ও পেট্রোলিয়াম পণ্য খাতের কোম্পানিগুলো।
তদন্তে দেখা গেছে, ‘এনটিটি এ’ নামে চিহ্নিত ১০টি আন্তঃসংযুক্ত ক্রিপ্টোকারেন্সি অ্যাড্রেস বা ওয়ালেট মিলে ১ দশমিক ৫ বিলিয়নেরও বেশি ইরানি তেলের অর্থ গ্রহণ ও বিতরণ করেছে। এই অর্থগুলো প্রথমে আইআরজিসি-সম্পর্কিত মানি সার্ভিস ব্যবসা, আইআরজিসি-সংক্রান্ত ক্রিপ্টো ঠিকানা এবং ইরানের একটি ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জে পাঠানো হয়েছে। অপরাধীরা লেনদেনের প্রকৃতি, উৎস ও মালিকানা গোপন করতে ইচ্ছাকৃতভাবে জটিল লেনদেন ও ক্রিপ্টো অ্যাড্রেস ব্যবহার করত, যাতে কেউ সন্দেহ না করে। জব্দ করা অর্থ ১০টি ট্রন নেটওয়ার্ক অ্যাড্রেসে রাখা ৬১ মিলিয়ন ডলারের ইউএসডিটি (টেদার) স্টেবলকয়েন। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ওয়ালেটে ১২ দশমিক ৭৬ মিলিয়ন ডলার এবং সবচেয়ে ছোটটিতে ১ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি রাখা ছিল। ইতিমধ্যেই টেদার কর্তৃপক্ষ এই অর্থ জব্দ করেছে এবং ১৪ সেপ্টেম্বরের জব্দি পরোয়ানা অনুযায়ী এফবিআইকে সম্পদ জব্দের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
এই মামলাটি কেবল একটি আর্থিক জব্দি নয়, এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক লড়াইয়ের অংশ। গত ফেব্রুয়ারি থেকে দুই দেশের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর মার্কিন ট্রেজারি ইরানের ‘ছায়া তেল অর্থনীতি’র ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আসছে। ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টের নেতৃত্বে ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামের এই অভিযানে ইতিমধ্যেই প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ইরানি ক্রিপ্টো সম্পদ জব্দ করা হয়েছে এবং সামরিক জাহাজ চলাচল অবরোধের মাধ্যমে ইরানের তেল আয় প্রায় ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার কমিয়ে আনা হয়েছে বলে পেন্টাগনের তথ্য। এই মামলাটি এমন সময়ে এলো যখন বাইন্যান্সের বিরুদ্ধে ইরান-সংক্রান্ত লেনদেনের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। গত মার্চ মাসে বাইন্যান্সের সহ-সিইও রিচার্ড টেং এই অভিযোগকে ‘মিথ্যা ও মানহানিকর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন এবং দাবি করেছিলেন, কোনো ইরানি প্রতিষ্ঠানের অর্থ সরাসরি বাইন্যান্সের প্ল্যাটফর্মে আসেনি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের তদন্তে যে দুটি চীনা প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছিল, সোমবারের মামলায় ঠিক সেই দুটির বিরুদ্ধেই অভিযোগ আনা হয়েছে। উল্লেখ্য, বাইন্যান্স ২০২৩ সালে নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের দায়ে দোষ স্বীকার করে এবং ৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার জরিমানা দিতে সম্মত হয়।
মার্কিন ডেপুটি অ্যাটর্নি শন এস বাকলি বলেছেন, ‘আজকের এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে ইরান সরকার ও তার সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো যেসব অবৈধ অর্থের ওপর নির্ভর করে যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বজুড়ে মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করছে, তা কেড়ে নেওয়ার ব্যাপারে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’ এফবিআইয়ের নিউইয়র্ক ফিল্ড অফিসের সহকারী পরিচালক জেমস সি বার্নাকল জুনিয়র বলেছেন, ‘আজকের অভিযোগ প্রমাণ করে যে এফবিআই অর্থের গতিপথ অনুসরণ করে অবৈধ চক্র উদ্ঘাটন করতে সক্ষম এবং যে কোনো সরকার যারা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে বা সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাতে চায়, তাদের কাছে ক্রিপ্টোকারেন্সি পাঠানোর ধারা বন্ধ করতে পারে।’ তাঁর ভাষায়, ‘কালোবাজারে অপরিশোধিত তেল বিক্রির অর্থ বন্ধ করা গেলে ইরানের সামরিক বাহিনী ও সন্ত্রাসীরা দুর্বল হয়ে পড়বে।’ তবে এই মামলা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। মামলাটিতে বাইন্যান্সকে আসামি করা হয়নি এবং বাইন্যান্সও কোনো অভিযোগে অভিযুক্ত হয়নি। মামলাটি আসলে ‘রিম’ বা সম্পত্তির বিরুদ্ধে, অর্থাৎ ১০টি ট্রন অ্যাড্রেসে জমা থাকা ৬১ মিলিয়ন ডলারের ইউএসডিটি। তাই চূড়ান্ত রায়ের আগে এই অর্থ বাজেয়াপ্ত হবে কিনা, তা স্পষ্ট নয়। মার্কিন বিচার বিভাগের এই পদক্ষেপ অবশ্য প্রমাণ করে, ক্রিপ্টোকারেন্সি এখন রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের আর্থিক লড়াইয়ের কেন্দ্রে চলে এসেছে।

