বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে কেন্দ্র করে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির সরবরাহ ব্যবস্থায় বাধা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে এশিয়ার দেশগুলোর ওপর, যেখানে বিশ্বের অন্যতম বড় এলএনজি বাজার রয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে এশিয়ায় এলএনজির চাহিদা ৩ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। এর মাধ্যমে টানা দ্বিতীয় বছরের মতো এ অঞ্চলে এলএনজি ব্যবহারে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দিতে পারে।
তবে পরিস্থিতি স্থায়ী হবে না বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ২০২৭ সালে এশিয়ার এলএনজি বাজারে আবার চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জ্বালানি বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকট শুধু সরবরাহ ঘাটতির কারণে তৈরি হয়নি, বরং উচ্চ দাম, বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার এবং কয়েকটি দেশের নিজস্ব জ্বালানি কৌশলের পরিবর্তনও এলএনজির চাহিদা কমার পেছনে ভূমিকা রাখছে।
বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিস্ট্যাড এনার্জির বিশ্লেষক লু মিং পাং জানিয়েছেন, পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ এলএনজির ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে। যেসব দেশে সুযোগ রয়েছে, তারা কয়লা ও পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার বাড়িয়েছে। এর পাশাপাশি চলতি বছর ওই অঞ্চলের কয়েকটি দেশে গড় তাপমাত্রা তুলনামূলক কম থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের প্রয়োজনও কিছুটা কমেছে।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে চীনের বাজারে। বিশ্বের অন্যতম বড় এলএনজি আমদানিকারক দেশটি বর্তমানে উচ্চ দামের কারণে জ্বালানি ব্যবহারে চাপ অনুভব করছে।
জ্বালানি বাজারের তথ্য ও বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়ায় চীনের অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে সিরামিকস, মিথানল এবং কাচ শিল্পের মতো বেশি জ্বালানি ব্যবহারকারী খাতগুলোতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক কারখানা উৎপাদন কমিয়েছে বা সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে।
কেপলারের বিশ্লেষক নেলসন সিওং জানান, চীনের অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি, পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস আমদানি এবং মজুদ থেকে গ্যাস ব্যবহার বাড়ার কারণেও এলএনজির প্রয়োজন কমেছে।
কেপলারের হিসাবে, চীনে চলতি বছর এলএনজির চাহিদা প্রায় ৬১ লাখ টন কমতে পারে।
এর আগে বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল, ২০২৫ সালে এশিয়ায় এলএনজির চাহিদা কমার পর ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারের বাড়তি সরবরাহের কারণে দাম কমবে এবং চাহিদা আবার ৪ থেকে ৭ শতাংশ বাড়বে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত সেই পূর্বাভাস বদলে দিয়েছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতের কারণে কাতারের এলএনজি রপ্তানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে দেশটির মোট রপ্তানি সক্ষমতার প্রায় ১৭ শতাংশ ব্যাহত হয়। কাতারের প্রধান জ্বালানি প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জি জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করে সরবরাহ স্থগিত করে।
এর পরপরই এশিয়ার খোলাবাজারে এলএনজির দাম দ্রুত বেড়ে যায়। প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটের দাম ২৬ ডলারে উঠে যায়, যা ২০২২ সালের ডিসেম্বরের পর সর্বোচ্চ।
অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির পরও দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশ এলএনজি আমদানি চালিয়ে যাচ্ছে। কারণ এসব দেশের অর্থনীতি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় গ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক আর্থিক তথ্য প্রদানকারী সংস্থা এলএসইজির বিশ্লেষক শ্রুতি শাহ জানান, ভারতে সার উৎপাদন এবং শহরভিত্তিক গ্যাস সরবরাহ খাতে গ্যাসের চাহিদা অব্যাহত রয়েছে। দেশটির মোট এলএনজি আমদানির প্রায় ৭০ শতাংশই এই দুই খাতে ব্যবহৃত হয়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের প্রয়োজন থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও এলএনজি আমদানি অব্যাহত রাখতে হচ্ছে।
তবে ভবিষ্যতে বাজার কোন দিকে যাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর।
রিস্ট্যাড এনার্জি ও কেপলারের পূর্বাভাস অনুযায়ী, কাতার যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে এলএনজি সরবরাহ পুনরায় স্বাভাবিক করতে পারে এবং ২০২৭ সালের প্রথম প্রান্তিকে অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে উৎপাদন বাড়াতে পারে, তাহলে এশিয়ায় এলএনজির চাহিদা আবার প্রায় ২৮ কোটি টনে পৌঁছাতে পারে।
তবে দাম দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরে আসবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কেপলারের হিসাবে, ২০২৬ সালে এশিয়ায় এলএনজির গড় দাম প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট ১৯ ডলার ৩০ সেন্ট এবং ২০২৭ সালে তা ১৪ ডলার ৯০ সেন্ট হতে পারে।
তবে হরমুজ প্রণালিতে কোনো বড় ধরনের বাধা তৈরি হলে আগামী বছর দাম আবার ২০ ডলারের ওপরে উঠতে পারে।
এদিকে ইউরোপের দেশগুলো শীতের আগে নিজেদের গ্যাস মজুদ বাড়াতে প্রতিযোগিতায় নামলে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও চাপ তৈরি হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য শুধু একটি উৎসের ওপর নির্ভর করা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। এশিয়ার দেশগুলো এখন নিজেদের জ্বালানি পরিকল্পনায় নতুন করে ভাবতে বাধ্য হচ্ছে।
বাংলাদেশের মতো গ্যাস আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য এই পরিস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য ওঠানামা মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা, বিকল্প শক্তির উন্নয়ন এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বৈচিত্র্য তৈরি করা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

