ডিজিটাল মাধ্যমে বিনিয়োগের নামে প্রতারণা এখন দেশের পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া বিনিয়োগের প্রস্তাব, শেয়ারের দাম দ্রুত বাড়ার গুজব এবং অল্প সময়ে বিপুল মুনাফার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতারক চক্র। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ডিজিটাল প্রতারণার কারণে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
প্রতারণার এসব কার্যক্রম পরিচালনায় বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করা হয়েছে। ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, প্রতারকেরা মেসেঞ্জারে ৮১টি গ্রুপ, এক হাজারের বেশি পেজ এবং হোয়াটসঅ্যাপে ২৫টি গ্রুপ ব্যবহার করেছে। এসব মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালানো হয়েছে।
বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। আলোচকেরা বলেন, বিনিয়োগ সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাব, দ্রুত মুনাফা অর্জনের প্রবণতা এবং যাচাই না করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে অনেক বিনিয়োগকারী সহজেই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। এ সমস্যা মোকাবিলায় বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ও জবাবদিহি জোরদার করা জরুরি।
আলোচনায় ডিজিটাল প্রতারণার কয়েকটি প্রচলিত ধরনও তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে অল্প সময়ে বিপুল মুনাফা বা লটারি জেতার প্রলোভন দেখানো, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে নির্দিষ্ট শেয়ারের দাম বেড়ে যাওয়ার মিথ্যা তথ্য ছড়ানো এবং গোপন কোম্পানি-তথ্য থাকার দাবি করে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা। এ ছাড়া বৈধ ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান বা স্টক এক্সচেঞ্জের ওয়েবসাইটের মতো দেখতে ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরি করে বিনিয়োগকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য ও অর্থ চুরির ঘটনাও ঘটছে।
চার্টার্ড ফাইন্যান্সিয়াল সোসাইটির সভাপতি মাহতাব ওসমানী বলেন, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি ধারাবাহিকভাবে দুই অঙ্কের উচ্চ মুনাফার নিশ্চয়তা দেয় এবং কখনো লোকসান হবে না বলে দাবি করে, তাহলে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক হওয়া উচিত। পুঁজিবাজারে এ ধরনের নিশ্চয়তা বাস্তবসম্মত নয়। তাই অস্বাভাবিক মুনাফার প্রতিশ্রুতি দেওয়া ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিনিয়োগের পরামর্শ নেওয়া থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান তিনি।
ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের সহসভাপতি আসিফুর রহমান বলেন, অনেক বিনিয়োগকারী কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা যাচাই না করেই শেয়ার কিনে থাকেন। নিরীক্ষা প্রতিবেদন, আর্থিক বিবরণী এবং নিরীক্ষকের পর্যবেক্ষণ না পড়ার কারণে তাঁরা বিনিয়োগের সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা পান না।
আলোচকেরা বিশেষভাবে নিরীক্ষকের মতামত ও গুরুত্বপূর্ণ নিরীক্ষা বিষয়গুলো পর্যালোচনার ওপর গুরুত্ব দেন। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করলে একটি কোম্পানির আর্থিক অবস্থার দুর্বলতা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ফলে শেয়ার কেনার আগে বিনিয়োগকারীরা আরও সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
ডিএসইর চেয়ারম্যান মিনহাজ মান্নান ইমন জানান, ডিজিটাল প্রতারণা শনাক্ত ও প্রতিরোধে স্টক এক্সচেঞ্জের নজরদারি এবং পর্যবেক্ষণব্যবস্থা আধুনিক করার কাজ চলছে। প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড দ্রুত শনাক্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে ডিএসই।
আলোচকেরা বলেন, শুধু নজরদারি জোরদার করলেই ডিজিটাল প্রতারণা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্য যাচাই করার অভ্যাসও বিনিয়োগকারীদের গড়ে তুলতে হবে। শেয়ার কেনার আগে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি, ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগ পরামর্শদাতার পরিচয় এবং নিবন্ধন যাচাই করা জরুরি। অপরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পাঠানো লিংকে প্রবেশ করা এবং ব্যক্তিগত তথ্য, পাসওয়ার্ড বা আর্থিক বিবরণী শেয়ার করা থেকেও বিরত থাকতে হবে।
বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা বাড়াতে একটি সমন্বিত জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত যাচাইব্যবস্থা চালুর প্রস্তাবও দেন বক্তারা। এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পরিচয়, নিবন্ধন এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন সহজে যাচাই করতে পারবেন। এতে ভুয়া প্রতিষ্ঠান শনাক্ত করা এবং প্রতারণার ঝুঁকি কমানো সহজ হবে।
বক্তারা মনে করেন, পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর তদারকি, নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি এবং আর্থিক বিষয়ে সাধারণ মানুষের জ্ঞান বাড়ানোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ডিজিটাল মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব ও ভুয়া বিনিয়োগের প্রস্তাব মোকাবিলায় দ্রুত তথ্য যাচাই এবং কার্যকর সতর্কবার্তা ব্যবস্থাও গড়ে তোলার ওপর তাঁরা গুরুত্ব দেন।

