বিশ্ববাজারে চীনের পণ্য রপ্তানির প্রবল গতি দেশটির বাণিজ্য উদ্বৃত্তকে নতুন রেকর্ডের কাছাকাছি নিয়ে গেছে। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসেই চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ৯৩ হাজার ৮১১ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। রপ্তানির এই ধারা অব্যাহত থাকলে টানা দ্বিতীয় বছরের মতো দেশটির বার্ষিক বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ১ লাখ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
চীনের শুল্ক কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর মাসে দেশটির রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৬ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। আগস্টে রপ্তানি বৃদ্ধির হার ছিল ২৫ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাসেও সেপ্টেম্বরের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ছিল ২৫ দশমিক ৫ শতাংশ। ফলে বাস্তব প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাসকে উল্লেখযোগ্যভাবে ছাড়িয়ে গেছে।
সেপ্টেম্বরে রপ্তানি বৃদ্ধির এই হার গত ফেব্রুয়ারির পর সর্বোচ্চ। বিশ্ববাজারে চীনা পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিনির্ভর পণ্যের রপ্তানি বাড়ায় দেশটির উৎপাদন ও বাণিজ্য কার্যক্রমে গতি এসেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
বিশেষ করে অর্ধপরিবাহী প্রযুক্তিপণ্য এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট পণ্যের বৈশ্বিক চাহিদা চীনের রপ্তানি আদেশ বাড়াতে সহায়তা করেছে। এসব পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধির ফলে দেশটির কারখানাগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রমও সচল রয়েছে।
রপ্তানির পাশাপাশি চীনের আমদানিতেও শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। সেপ্টেম্বর মাসে দেশটির আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩১ শতাংশ বেড়েছে। আগস্টে এই প্রবৃদ্ধির হার ছিল ২৮ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাস ছিল ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ।
অর্থাৎ, সেপ্টেম্বর মাসে আমদানি বৃদ্ধির হারও পূর্বাভাসকে ছাড়িয়ে গেছে। এতে বোঝা যায়, চীনের বৈদেশিক বাণিজ্যের দুই দিকেই উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণ ঘটেছে। তবে আমদানির তুলনায় রপ্তানি বেশি শক্তিশালী থাকায় দেশটির বাণিজ্য উদ্বৃত্ত উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
কোনো দেশের রপ্তানির মোট মূল্য আমদানির মোট মূল্যের চেয়ে বেশি হলে সেই পার্থক্যকে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বলা হয়। চীনের ক্ষেত্রে রপ্তানির ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি এবং আমদানি-রপ্তানির ব্যবধান দেশটির বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
২০২৫ সালে চীন ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ১ লাখ কোটি ডলারের বাণিজ্য উদ্বৃত্তের সীমা অতিক্রম করে। ওই বছরের নভেম্বরেই দেশটি এই সীমা ছাড়িয়ে যায়। বছর শেষে মোট বাণিজ্য উদ্বৃত্ত দাঁড়ায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৯০০ কোটি ডলার।
চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ৯৩ হাজার ৮১১ কোটি ডলারে পৌঁছানোয় আবারও নতুন বার্ষিক রেকর্ডের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সেপ্টেম্বরের শক্তিশালী রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এই সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করেছে।
তবে বছরের বাকি সময়েও রপ্তানির এই গতি বজায় থাকবে কি না, তা নির্ভর করবে বৈশ্বিক চাহিদা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতি এবং ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার ওপর।
চীনের শুল্ক বিভাগের উপমন্ত্রী ওয়াং জুন সতর্ক করে বলেছেন, ভূরাজনৈতিক সংঘাত ও আন্তর্জাতিক অনিশ্চয়তা দেশটির বৈদেশিক বাণিজ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে তাঁর মতে, চীনের বাণিজ্য খাতের ভিত্তি শক্তিশালী এবং বছরের চতুর্থ প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার অনুকূল পরিস্থিতিও রয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা, বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিবর্তন রপ্তানির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রপ্তানি দ্রুত বাড়লেও এই প্রবৃদ্ধি সারা বছর অব্যাহত থাকবে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ৯৩ হাজার ৮১১ কোটি ডলারে পৌঁছানো দেশটির বৈদেশিক বাণিজ্যের শক্তিশালী অবস্থান তুলে ধরছে। সেপ্টেম্বর মাসে রপ্তানি ও আমদানি—উভয় ক্ষেত্রেই প্রত্যাশার চেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। বর্তমান ধারা বজায় থাকলে চীন টানা দ্বিতীয় বছরের মতো ১ লাখ কোটি ডলারের বেশি বাণিজ্য উদ্বৃত্ত অর্জন করতে পারে।

