বুধবার প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘কমোডিটি মার্কেটস আউটলুক’ প্রতিবেদনে এসব আশঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য ও পরিবহন কার্যক্রমে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে এল নিনিওর সম্ভাব্য প্রভাব যুক্ত হলে খাদ্য ও কৃষিপণ্যের বাজারে চাপ আরও বাড়তে পারে।
জ্বালানির দাম বাড়তে পারে ৩২ শতাংশ
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ৩২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত জ্বালানি সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করায় অপরিশোধিত তেলের বাজারে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের গড় দাম ছিল ৬৯ ডলার। চলমান পরিস্থিতিতে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ তা বেড়ে ৯১ ডলারে পৌঁছাতে পারে। তবে ২০২৭ সালে তেলের গড় দাম কিছুটা কমে ৭৯ ডলারে নামার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
সংঘাতের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী তেলের সরবরাহ ৫ দশমিক ২ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কাও তুলে ধরা হয়েছে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি শুধু পরিবহন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বাড়ায় না, শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচ এবং পণ্য সরবরাহব্যবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
দুই বছরে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে পারে প্রায় ১৮ শতাংশ
জ্বালানির পাশাপাশি বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির আশঙ্কাও রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, ২০২৬ সালে খাদ্যপণ্যের দাম ১০ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে আরও ৭ শতাংশ বাড়তে পারে।
এই দুই বছরের মূল্যবৃদ্ধি সম্মিলিতভাবে প্রায় ১৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার পেছনে জ্বালানির উচ্চমূল্য, কৃষি উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক পরিবহনব্যবস্থায় বাধাকে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, খাদ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে এমন মূল্যবৃদ্ধি ঘটলে নিম্ন আয়ের ও আমদানিনির্ভর দেশগুলো বেশি চাপে পড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব দেশ খাদ্যশস্য ও কৃষি উপকরণের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে আমদানি ব্যয় বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সারের দাম বাড়ার আশঙ্কা ১৪ শতাংশ
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে কৃষি উৎপাদনের ব্যয় বৃদ্ধি নিয়েও সতর্ক করা হয়েছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম ১৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
সার উৎপাদন ও পরিবহনের সঙ্গে জ্বালানি ব্যয়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ফলে জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে সার উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহের খরচও বাড়তে পারে।
সারের মূল্যবৃদ্ধি কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি এর ব্যবহার কমিয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এর ফলে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য সরবরাহের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষ করে উন্নয়নশীল ও নিম্ন আয়ের দেশগুলোর কৃষকদের জন্য বাড়তি দামে সার সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এল নিনিও বাড়াতে পারে খাদ্যসংকটের ঝুঁকি
চলমান সংঘাতের পাশাপাশি এল নিনিওর সম্ভাব্য প্রভাবও বিশ্ববাজারের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
এল নিনিও হলো প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত অবস্থা। এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার ধরন বদলে যেতে পারে।
কোথাও খরা, কোথাও অতিবৃষ্টি কিংবা বন্যার ঝুঁকি বেড়ে কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এল নিনিওর প্রভাবে ফসলের ক্ষতি এবং সংঘাতের কারণে শস্য পরিবহনে বিঘ্ন ঘটলে খাদ্যপণ্যের দাম পূর্বাভাসের তুলনায় আরও বেশি বাড়তে পারে।
বিশেষ করে প্রধান খাদ্যশস্য উৎপাদনকারী অঞ্চলে আবহাওয়াজনিত সমস্যা দেখা দিলে আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় নতুন চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে চাপ
বিশ্বব্যাংকের উপপ্রধান অর্থনীতিবিদ আয়হান কোসে সতর্ক করে বলেছেন, জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাধা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
তাঁর মতে, এসব কারণে মূল্যস্ফীতি বাড়ার পাশাপাশি খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা গভীর হতে পারে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে সহায়তার জন্য বিশ্বব্যাংক ৫০ থেকে ৬০ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়নের সুযোগ রেখেছে।
এই অর্থায়ন খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ এবং জনগোষ্ঠীকে সহায়তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের জন্যও বাড়তে পারে আমদানি ব্যয়ের ঝুঁকি
বিশ্ববাজারে জ্বালানি, সার ও খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশ জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিভিন্ন ধরনের সার এবং কিছু খাদ্যপণ্য বিদেশ থেকে আমদানি করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের দাম বেড়ে গেলে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বিশেষ করে জ্বালানি ও সারের দাম বাড়লে কৃষি উৎপাদন, পণ্য পরিবহন এবং শিল্পকারখানার পরিচালন ব্যয় প্রভাবিত হতে পারে। এর ধারাবাহিকতায় স্থানীয় বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে বিশ্বব্যাংকের এসব হিসাব পূর্বাভাসনির্ভর। সংঘাতের গতিপ্রকৃতি, জ্বালানি সরবরাহের পরিস্থিতি এবং আবহাওয়ার পরিবর্তনের ওপর প্রকৃত মূল্যবৃদ্ধি নির্ভর করবে।
আন্তর্জাতিক বাজারের সম্ভাব্য অস্থিরতা মোকাবিলায় তাই আমদানি পরিকল্পনা, প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তাব্যবস্থা প্রস্তুত রাখার গুরুত্ব বাড়ছে।

