বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের প্ল্যাটফর্ম বাইন্যান্সে বড় ধরনের সাইবার হামলার ঘটনায় উত্তর কোরিয়াকে দায়ী করেছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই। সংস্থাটির দাবি, গত ২৯ অক্টোবর বাইন্যান্স থেকে ৬৩০ কোটি ডলারের বেশি ভার্চ্যুয়াল সম্পদ চুরি করেছে উত্তর কোরিয়াসংশ্লিষ্ট হ্যাকার গোষ্ঠী। কয়েক মিনিটের মধ্যে সংঘটিত এ ঘটনাকে ক্রিপ্টোকারেন্সির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চুরির ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
গত ৩১ অক্টোবর প্রকাশিত এক সতর্কবার্তায় এফবিআই জানায়, ‘ট্রেডারট্রেইটার’ নামে পরিচিত একটি গোষ্ঠী এই হামলা চালিয়েছে। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, চুরি করা সম্পদের বড় অংশ ইতোমধ্যে ইথেরিয়ামে রূপান্তর করা হয়েছে। এরপর বিকেন্দ্রীভূত অর্থায়ন ব্যবস্থা বা ডিফাই এবং তাৎক্ষণিকভাবে এক ক্রিপ্টোকারেন্সি থেকে অন্যটিতে রূপান্তরের সেবা ব্যবহার করে অর্থের উৎস আড়াল করার চেষ্টা হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে বিভিন্ন ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ, ব্লকচেইন বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সেবাদাতাদের সন্দেহজনক ওয়ালেট ঠিকানার সঙ্গে যুক্ত লেনদেন বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে এফবিআই।
বাইন্যান্সের নিজস্ব ঘোষণাতেও হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ২৯ অক্টোবর রাত ৮টা ৫ মিনিটের দিকে তাদের হট ওয়ালেট বা অনলাইন লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত ডিজিটাল ওয়ালেটের নিরাপত্তা ভেঙে প্রায় ৬৩০ কোটি ডলারের টোকেন চুরি হয়। প্রাথমিক তদন্তে একটি ল্যাপটপের নিরাপত্তা দুর্বলতার বিষয়টি সামনে এলেও পরবর্তী অনুসন্ধানে আরও কিছু নিরাপত্তা ভঙ্গের ঘটনা পাওয়া গেছে। তবে কীভাবে পুরো হামলাটি পরিচালিত হয়েছে, তা নিয়ে তদন্ত তখনো চলছিল। বাইন্যান্স জানিয়েছে, গ্রাহকেরা যেন এই ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির মুখে না পড়েন, সে দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানটি নিজেই নেবে।
এফবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, একই ট্রেডারট্রেইটার গোষ্ঠী গত বছর ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্ম বাইবিট থেকে প্রায় ১৫০ কোটি ডলারের সম্পদ চুরির ঘটনায়ও জড়িত ছিল। নতুন হামলার ঘটনায় চুরি হওয়া সম্পদ অন্য মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়ার আগেই লেনদেন শনাক্ত ও বন্ধ করতে চায় মার্কিন সংস্থাটি। এ কাজে যুক্তরাষ্ট্রের সিক্রেট সার্ভিস এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বিভাগের অপরাধ তদন্ত শাখাও এফবিআইয়ের সঙ্গে কাজ করছে।
এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের সম্পদের সমপরিমাণ টোকেনের জোগান দিতে বাইন্যান্স বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ করেছে। ৩১ অক্টোবরের সর্বশেষ হালনাগাদে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, চুরি হওয়া সম্পদের প্রায় ৯০ শতাংশের সমপরিমাণ টোকেনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ জন্য ৬৩৪ কোটি ডলারের বেশি অর্থ সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। এই অর্থের উৎসের মধ্যে রয়েছে ব্যবহারকারী সুরক্ষা তহবিল, ফিউচার্স ইনস্যুরেন্স ফান্ড এবং বাইন্যান্সের নিজস্ব করপোরেট তহবিল। অবশিষ্ট ১০ শতাংশ সম্পদ তুলনামূলক কম তারল্যসম্পন্ন হওয়ায় সেগুলো সংগ্রহে আরও সময় লাগতে পারে।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। বাইন্যান্সের ৯০ শতাংশ সম্পদ পূরণের অর্থ এই নয় যে হ্যাকারদের কাছ থেকে চুরি হওয়া অর্থের ৯০ শতাংশ উদ্ধার করা হয়েছে। বরং গ্রাহকদের সম্পদের বিপরীতে ঘাটতি পূরণ করতে সমপরিমাণ টোকেন নতুন করে কেনা ও সংরক্ষণের কথা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। অর্থাৎ চুরি হওয়া সম্পদ উদ্ধারের প্রক্রিয়া এবং গ্রাহকদের ক্ষতি পূরণের ব্যবস্থা দুটি আলাদা বিষয়। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলার পর বাইন্যান্স ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদের অবস্থান শনাক্ত করতে পেরেছিল।
হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টো বাজারেও চাপ তৈরি হয়। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার বিটকয়েনের দাম ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামে। ইথেরিয়ামের দামও দুই মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে পৌঁছায়। বাইন্যান্সের নিজস্ব টোকেন বিএনবির দামও এক পর্যায়ে ২৪ ঘণ্টায় ৮ শতাংশের বেশি কমে যায়। হামলার পর নিরাপত্তা পর্যালোচনার জন্য বাইন্যান্স সাময়িকভাবে গ্রাহকদের অর্থ উত্তোলন বন্ধ করে দেয় এবং ১ নভেম্বরের মধ্যে সেবা চালুর পরিকল্পনার কথা জানায়।

