ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সংঘাতের অবসানে কূটনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমেছে। সোমবার (২ নভেম্বর) এশিয়ার বাজারে লেনদেনের শুরুতেই অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে নেমে আসে। এতে কয়েক সপ্তাহ ধরে ঊর্ধ্বমুখী থাকা জ্বালানি বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।
সোমবার দুপুর ১২টার দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের প্রতি ব্যারেলের দাম কমে ১০৯ ডলার ৮০ সেন্টে দাঁড়ায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম নেমে আসে ১০০ ডলার ৫০ সেন্টে। অয়েলপ্রাইস ডটকম ও রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, কূটনৈতিক আলোচনায় অগ্রগতির সম্ভাবনাই এই দরপতনের অন্যতম কারণ।
ইরান ও কাতারের কর্মকর্তারা টানা তৃতীয় দিনের মতো আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কমানোর পাশাপাশি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার বিষয়ে এই আলোচনা চলছে। যুদ্ধের অবসানের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ কিছুটা কমেছে।
সাম্প্রতিক দরপতনের আগে অক্টোবর মাসজুড়েই আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছিল। মাসের শেষ কার্যদিবস ৩০ অক্টোবর ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৮ ডলারে পৌঁছায়। পুরো মাসে এই তেলের দাম বেড়েছিল ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ডব্লিউটিআইয়ের দাম অক্টোবর মাসে বেড়েছিল ১৫ দশমিক ২ শতাংশ। গত ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল আন্তর্জাতিক বাজারের জ্বালানি তেলের দাম। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা এবং সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার উদ্বেগ এই মূল্যবৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছিল।
আগামীকাল ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে, এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক তৎপরতা বাড়াতে পারে বলে ধারণা করছিলেন বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
তবে কূটনৈতিক আলোচনার খবর সামনে আসার পর পরিস্থিতিতে কিছুটা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, গত সপ্তাহে দ্রুত দাম বাড়ার পর সোমবারের দরপতনকে বাজারের স্বাভাবিক মূল্য সংশোধনের অংশ হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
বাজার বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার রয়টার্সকে বলেন, গত সপ্তাহে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার পর বাজারে কিছুটা সংশোধন হয়েছে। তবে ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আরও কঠোর হলে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের চাহিদাও দামের ওপর প্রভাব ফেলছে। বিশ্লেষকদের মতে, চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ায় দেশটির জ্বালানি তেলের চাহিদা আগের তুলনায় দুর্বল হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম বড় তেল আমদানিকারক দেশ হওয়ায় চীনের চাহিদার পরিবর্তন আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রভাব ফেলে।
এর পাশাপাশি দেশটিতে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়ছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ফলে পরিবহন খাতে প্রচলিত জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ মেয়াদে এই পরিবর্তন আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের চাহিদা বৃদ্ধির গতিকে সীমিত করতে পারে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি গত রোববার জানিয়েছেন, কাতারের সঙ্গে পরামর্শ ও যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। আলোচনায় অগ্রগতিও হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তবে একই সঙ্গে তিনি জানান, ইরান প্রতিরক্ষা এবং কূটনীতি উভয় পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে কাতার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে। দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হলেও যুদ্ধের অবসান নিয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে একদিকে কূটনৈতিক অগ্রগতির আশা, অন্যদিকে নতুন করে সংঘাত শুরুর আশঙ্কা, দুটিই বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম নির্ধারণে চাহিদার পাশাপাশি উৎপাদনের পরিমাণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সাধারণত উৎপাদন বাড়লে বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হয়, যা দামের ওপর নিম্নমুখী চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিপরীতে উৎপাদন কমলে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায় দাম বাড়তে পারে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তেল উৎপাদন বাড়ানো বা কমানোর বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে ওপেক প্লাস। ডিসেম্বর মাসের জন্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জোটটি। গত রোববার সৌদি আরব ও রাশিয়াসহ সাতটি গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদেশের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে অঞ্চলটি থেকে তেল রপ্তানি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রায় বড় পরিবর্তন না এনে বাজারের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো। আগামী ২৯ নভেম্বর ওপেক প্লাসের পরবর্তী বৈঠকে ২০২৭ সালের উৎপাদন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের ভবিষ্যৎ দাম নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনার অগ্রগতি, চীনের জ্বালানি চাহিদা এবং ওপেক প্লাসের উৎপাদননীতির ওপর। কূটনৈতিক সমঝোতা এগিয়ে গেলে তেলের বাজারে আরও স্বস্তি ফিরতে পারে। তবে সংঘাত আবারও বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম নতুন করে ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

