কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে যে বিনিয়োগের জোয়ার তৈরি হয়েছে, তার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে সংশয় দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে এ খাতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাশিত মুনাফা পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিনিয়োগকারীরা। এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে এশিয়ার প্রধান প্রযুক্তি ও চিপ উৎপাদনকারী দেশগুলোর শিল্প খাতে।
চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানে অক্টোবরে উৎপাদন খাত সম্প্রসারিত হলেও আগের মাসের তুলনায় প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে। ফলে এআই ও সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে কেন্দ্র করে এশিয়ার অর্থনীতিতে যে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা কত দিন ধরে রাখা সম্ভব হবে, সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
সোমবার প্রকাশিত বেসরকারি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, চিপ রপ্তানিনির্ভর এশীয় অর্থনীতিগুলোর উৎপাদন কার্যক্রমে মন্থরতা দেখা যাচ্ছে। এর পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক ব্যবসায়িক আস্থার দুর্বলতাও ভূমিকা রাখছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এত দিন চিপ ও এআই-সংশ্লিষ্ট পণ্যের শক্তিশালী চাহিদা এশিয়ার অর্থনীতির অন্যান্য দুর্বলতাকে অনেকটা আড়াল করে রেখেছিল। কিন্তু জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় সেই সুবিধা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
টোকিওভিত্তিক দাই-ইচি লাইফ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের উদীয়মান বাজারবিষয়ক প্রধান অর্থনীতিবিদ তোরু নিশিহামা বলেন, চিপ ও এআইয়ের জোরালো চাহিদা এত দিন এশিয়া ও বিশ্বের অর্থনীতির দুর্বল দিকগুলোকে আড়াল করে রেখেছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া এবং জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় আগের পরিস্থিতি ধরে রাখা কঠিন হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে এশিয়ার মানুষের ভোগব্যয় কমছে। পাশাপাশি চীনের সঙ্গে মূল্য প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ায় জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো রপ্তানিনির্ভর দেশগুলোও বাড়তি চাপে পড়ছে।
চীনের উৎপাদন খাতেও কমেছে প্রবৃদ্ধির গতি
এশিয়ার বৃহত্তম উৎপাদন অর্থনীতি চীনের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানেও মন্থরতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের সংকলিত রেটিংডগ চায়না জেনারেল ম্যানুফ্যাকচারিং পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই) অনুযায়ী, অক্টোবরে চীনের উৎপাদন খাতের সূচক দাঁড়িয়েছে ৫২ পয়েন্টে। সেপ্টেম্বরে এ সূচক ছিল ৫২ দশমিক ১ পয়েন্ট।
পিএমআই সূচকের মান ৫০-এর ওপরে থাকলে উৎপাদন খাতের সম্প্রসারণ এবং ৫০-এর নিচে থাকলে সংকোচন বোঝায়। সে হিসাবে চীনের উৎপাদন খাত এখনো সম্প্রসারণের ধারায় রয়েছে। তবে আগের মাসের তুলনায় সম্প্রসারণের গতি সামান্য কমেছে।
এর আগে শনিবার প্রকাশিত চীনের সরকারি পরিসংখ্যানেও উৎপাদন খাতের দুর্বল চিত্র উঠে আসে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরে দেশটির কারখানাগুলোর কার্যক্রম সংকুচিত হয়েছে। গত চার মাসের মধ্যে তৃতীয়বারের মতো উৎপাদন খাতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের চীনবিষয়ক অর্থনীতিবিদ নগুয়েন হোয়াং নামের মতে, সেপ্টেম্বরে কিছুটা গতি ফিরে পাওয়ার পর অক্টোবরে চীনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আবার দুর্বল হয়েছে। উৎপাদন খাতের কার্যক্রম কিছুটা কমলেও বিদেশি চাহিদা এখনো মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে।
তবে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে নির্মাণ খাতের কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা নিয়ে। এ খাতে উল্লেখযোগ্য অবনতি হয়েছে। এতে বছরের বাকি সময়ে সরকারি রাজস্ব সহায়তা অর্থনীতিকে যথেষ্ট চাঙা করতে পারবে কি না, তা নিয়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আস্থা কমে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানেও মন্থরতা
চীনের বাইরে এশিয়ার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ চিপ উৎপাদনকারী দেশেও উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধি কমেছে।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের জরিপ অনুযায়ী, জাপানের উৎপাদন খাতের পিএমআই সেপ্টেম্বরে ৫৪ দশমিক ১ পয়েন্ট থাকলেও অক্টোবরে তা কমে ৫৩ দশমিক ৩ পয়েন্ট হয়েছে। উৎপাদন ও নতুন ক্রয়াদেশের গতি কমে যাওয়ায় গত সাত মাসের মধ্যে অক্টোবরে দেশটির উৎপাদন খাতের সম্প্রসারণ ছিল সবচেয়ে ধীর।
দক্ষিণ কোরিয়াতেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দেশটির কারখানাগুলোর কার্যক্রম অক্টোবরে গত আট মাসের মধ্যে সবচেয়ে ধীর গতিতে সম্প্রসারিত হয়েছে। সেপ্টেম্বরে দেশটির পিএমআই ছিল ৫৩ দশমিক ৯ পয়েন্ট। অক্টোবরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৫১ দশমিক ৩ পয়েন্টে।
তাইওয়ানের উৎপাদন খাতের সূচকও কমেছে। সেপ্টেম্বরে ৫৬ দশমিক ৭ পয়েন্ট থেকে অক্টোবরে তা নেমে এসেছে ৫৪ দশমিক ৯ পয়েন্টে।
এই তিন অর্থনীতিই বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর ও প্রযুক্তিপণ্য সরবরাহ শৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে এসব দেশের উৎপাদন কার্যক্রমে মন্থরতা দেখা দেওয়ায় প্রযুক্তি খাতের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সব দেশে একই চিত্র নয়
তবে এশিয়ার সব দেশের উৎপাদন খাতেই যে একই ধরনের মন্থরতা দেখা যাচ্ছে, তা নয়। ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়াসহ কয়েকটি দেশে অক্টোবরে কারখানার কার্যক্রম আগের মাসের তুলনায় দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে।
অন্যদিকে ভারতের উৎপাদন খাতেও প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে। দেশটিতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা দুর্বল হওয়া এবং নতুন কর্মী নিয়োগ কমে যাওয়ায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে রপ্তানি আদেশ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন খাতের মন্থরতা কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
এ থেকে বোঝা যায়, এশিয়ার অর্থনীতিতে একই সঙ্গে একাধিক প্রবণতা কাজ করছে। কোথাও রপ্তানি ও প্রযুক্তিপণ্যের চাহিদা প্রবৃদ্ধিকে সহায়তা করছে, আবার কোথাও অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয় ও ব্যবসায়িক আস্থার দুর্বলতা উৎপাদন কার্যক্রমকে সীমিত করছে।
বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফা কতটা?
এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের কারণে গত কয়েক বছরে চিপ, ডেটা সেন্টার, সার্ভার ও উন্নত কম্পিউটিং অবকাঠামোর চাহিদা বেড়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে।
কিন্তু বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়লেই যে সমান হারে মুনাফা আসবে, তার নিশ্চয়তা নেই। এআই প্রযুক্তির বাণিজ্যিক ব্যবহার কতটা বিস্তৃত হবে, প্রতিষ্ঠানগুলো কত দ্রুত বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পাবে এবং নতুন প্রযুক্তির বাজার কতটা স্থায়ী হবে—এসব প্রশ্ন এখন বিনিয়োগকারীদের ভাবাচ্ছে।
বিশেষ করে এআই অবকাঠামো নির্মাণে অতিরিক্ত বিনিয়োগ হলে ভবিষ্যতে চিপ ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিপণ্যের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় বেশি হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। সে ক্ষেত্রে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা ও শেয়ারমূল্যের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
এআই খাতের প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার তুলনায় কম হলে তার প্রভাব শুধু প্রযুক্তি কোম্পানির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। চিপ উৎপাদন, যন্ত্রপাতি সরবরাহ, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, ডেটা সেন্টার এবং সংশ্লিষ্ট রপ্তানিনির্ভর শিল্পেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
এশিয়ার প্রবৃদ্ধি কমার পূর্বাভাস আইএমএফের
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) পূর্বাভাস দিয়েছে, আগামী বছর এশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমতে পারে। সংস্থাটির মতে, ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি বাজারে সৃষ্ট অস্থিরতা এবং এআই খাতের উত্থানে সম্ভাব্য বড় ধরনের সংশোধন এ অঞ্চলের অর্থনীতির জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করছে।
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এশিয়ার অর্থনীতি ৪ দশমিক ৮ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে। গত এপ্রিলে দেওয়া পূর্বাভাসের তুলনায় এই হার বেশি হলেও ২০২৫ সালের ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির চেয়ে কম।
অর্থাৎ এশিয়ার অর্থনীতি এখনো প্রবৃদ্ধির ধারায় থাকলেও আগের বছরের তুলনায় গতি কমার আশঙ্কা রয়েছে।
এআইয়ের উত্থানই হতে পারে নতুন ঝুঁকি
এআই প্রযুক্তির বিকাশ থেকে সুবিধা পাওয়া দেশগুলোর মধ্যে জাপান অন্যতম। তবে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক সতর্ক করেছে, দীর্ঘ মেয়াদে এআইয়ের উত্থান অর্থনীতির জন্য নতুন ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আশঙ্কা, এআই নিয়ে প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা বড় ধরনের ধাক্কা খেলে বৈশ্বিক আর্থিক পরিস্থিতি কঠোর হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে শেয়ারবাজারে দ্রুত দরপতন এবং এআই উন্নয়নে বিনিয়োগের গতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এর প্রভাব প্রযুক্তি খাতের বাইরে ছড়িয়ে পড়তে পারে উৎপাদন ও রপ্তানি খাতেও। বিশেষ করে জাপানের মতো প্রযুক্তিপণ্য রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে এশিয়ার চিপশিল্প এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে এআই প্রযুক্তির বিস্তার নতুন বাজার ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করছে, অন্যদিকে বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফার অনিশ্চয়তা বাড়ছে। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং দুর্বল ভোক্তা চাহিদা যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ফলে আগামী দিনে এশিয়ার প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির সাফল্য শুধু কত বেশি চিপ উৎপাদন করা হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করবে না; বরং এআই খাতে বিনিয়োগ কতটা বাস্তব মুনাফায় রূপান্তরিত হচ্ছে, সেটিও বড় নিয়ামক হয়ে উঠবে।

