যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ার পর মার্কিন শেয়ারবাজারে বড় উত্থান দেখা গেছে। প্রথম নজরে ফলাফলটি কিছুটা বিপরীতমুখী মনে হতে পারে। কারণ করছাড়, নিয়মকানুন শিথিলকরণ ও ব্যবসাবান্ধব নীতির জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দীর্ঘদিন ধরে বাজারের অনুকূল নেতা হিসেবে দেখা হয়। তবু ট্রাম্পের প্রতি ভোটারদের এই অনাস্থার পর বাজার চাঙা হয়েছে, নেমেছে তেলের দাম, আর শক্ত হয়েছে ট্রেজারি বন্ডের বাজার।
নির্বাচনের পর বুধবার ডাও জোনস ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ দেড় হাজার পয়েন্টের বেশি বেড়েছে, যা প্রায় ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির সমান। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক বেড়েছে ১ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং নাসডাক কম্পোজিট ১ দশমিক ৪৪ শতাংশ। এসঅ্যান্ডপি ৫০০-এর এ উত্থান গত তিন মাসের মধ্যে একদিনের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি। ভোটের পর প্রথমে কিছুটা শেয়ার বিক্রির চাপ থাকলেও পরে বিনিয়োগকারীরা ট্রাম্পের অর্থনৈতিক এজেন্ডায় ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের সম্ভাব্য প্রভাব নতুন করে হিসাব করেন, আর তাতেই বাজার ঘুরে দাঁড়ায়।
বিশ্লেষকদের ব্যাখ্যায়, বাজার বামপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ার কারণে খুশি নয়। বিনিয়োগকারীরা বরং আশা করছেন, বিভক্ত সরকার রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ আনবে এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা কমাবে। তাঁদের হিসাবে, ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস শুল্ক আরোপ, ঘাটতি বাজেট এবং ইরান সংঘাতের মতো ট্রাম্পের অনিশ্চিত নীতিগুলোতে লাগাম টানতে পারে। বড় আকারের কর, ব্যয় ও নীতিগত পরিবর্তন পাস করানোও ট্রাম্পের জন্য এখন কঠিন হবে। ফলে প্রশাসনের খামখেয়ালি সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বিগ্ন বিনিয়োগকারীরা কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে তেলের বাজারে। বুধবার অপরিশোধিত তেলের দাম ৮ শতাংশের বেশি কমে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯৫ ডলারে নেমে আসে। মার্কিন অপরিশোধিত তেলের দামেও বড় পতন রেকর্ড হয়েছে। এই পতনে প্রতিফলিত হয়েছে একটি আশা, ডেমোক্র্যাটদের জয় ইরান যুদ্ধ থামাতে ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়াবে। এই সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম চড়া ছিল এবং মূল্যস্ফীতি উসকে উঠছিল। ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন, রিপাবলিকানদের পরাজয়ে এই যুদ্ধ ভূমিকা রেখেছে।
তেলের দাম কমলে সাধারণ ভোক্তা ও ব্যবসায়ীরা স্বস্তি পাবেন। সস্তা জ্বালানি মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে পারে, পরিবহন খরচ কমাতে পারে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সুদের হার কমানোর কথা ভাবার সুযোগ দিতে পারে। তবে তেলনির্ভর বাজারগুলোর এই চাঙা ভাব আংশিকভাবে ভূরাজনৈতিক সমঝোতার আশার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বাড়লে এ লাভ দ্রুত হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে।
তবে সব খাতে একই চিত্র দেখা যায়নি। ডেমোক্র্যাটরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি কোম্পানি ও ডিজিটাল সম্পদের ওপর কঠোর নজরদারির জন্য চাপ দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে এআই অবকাঠামোয় শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করা কোম্পানিগুলোর পরিকল্পনা জটিল হতে পারে। বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কা, আরও কঠোর নিয়ম, ডেটা সেন্টার নির্মাণে বিধিনিষেধ কিংবা জ্বালানি ব্যবহারে কড়া নজরদারি এআই অবকাঠামোর সম্প্রসারণ ধীর করে দিতে পারে।
এর প্রতিক্রিয়া ছিল মিশ্র। মাইক্রোসফট, অ্যামাজন, অ্যালফাবেট ও মেটার মতো শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বেড়েছে। কারণ অবকাঠামো সম্প্রসারণের গতি কমলে প্রতিষ্ঠিত ক্লাউড কম্পিউটিং ব্যবসা লাভবান হতে পারে বলে বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন। অন্যদিকে ডেটা সেন্টার পরিচালনাকারী হাট এইট, আইরেন, কোর সায়েন্টিফিক ও অ্যাপ্লাইড ডিজিটালের মতো প্রতিষ্ঠান চাপে পড়েছে। সেমিকন্ডাক্টর সূচক ৩ দশমিক ১ শতাংশ কমে ছয় মাসের সর্বনিম্ন স্তরে নেমেছে। টেসলার শেয়ারের দামও কমেছে। প্রতিরক্ষা খাতের ঠিকাদারেরা এ আশঙ্কায় আছেন যে ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেট কংগ্রেসে বাধার মুখে পড়তে পারে।
এই নির্বাচন ট্রাম্পের শুল্কনীতি, প্রতিরক্ষা ব্যয় এবং ইরান সংঘাতের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন প্রশ্ন তুলেছে। হোয়াইট হাউস এই রাজনৈতিক ধাক্কায় কী প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং কংগ্রেস প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতিকে কতটা প্রভাবিত করতে পারে, তা বিনিয়োগকারীরা নিবিড়ভাবে নজরে রাখবেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখনো ওয়াল স্ট্রিটের অন্যতম বড় বিনিয়োগের খাত। ফলে এ খাতে নিয়ন্ত্রণ কড়াকড়ির যেকোনো ইঙ্গিত বাজারের গতিপথ বদলে দিতে পারে।
সব মিলিয়ে বাজারের এই উল্লাস রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও তেলের দাম কমার আশার ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে। তবে এ আশা কতটা টিকবে, তা নির্ভর করছে কংগ্রেস ও হোয়াইট হাউসের সম্পর্ক, ইরান সংঘাতের গতিপথ এবং প্রযুক্তি খাতের নিয়ন্ত্রণ-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের ওপর।

