যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয় এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে কঠোর নিয়ন্ত্রণের আশঙ্কায় দেশটির শেয়ারবাজারে বড় দরপতন হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) প্রযুক্তিনির্ভর নাসডাক সূচক ৫ দশমিক ৫ শতাংশ কমে যায়। এতে এক দিনেই সূচকটির আওতাধীন কোম্পানিগুলোর বাজারমূল্য থেকে আনুমানিক ২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার বা ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলার কমে যায়। একই দিন ওয়াল স্ট্রিটের অন্য প্রধান সূচকগুলোতেও বড় পতন দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হওয়া এই বিক্রির চাপ পরদিন এশিয়া ও ইউরোপের বাজারেও ছড়িয়ে পড়ে।
নাসডাকের এই পতন গত বছরের এপ্রিলের পর এক দিনে সবচেয়ে বড় দরপতন। বৃহস্পতিবার সূচকটি ১ হাজার ৪২২ পয়েন্ট হারিয়ে ২৪ হাজার ৩১৫ পয়েন্টে নেমে আসে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের বড় ৫০০ কোম্পানির সূচক এসঅ্যান্ডপি ৫০০ কমে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ডাও জোন্স কমে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। বাজারের এই ধাক্কায় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত বাজারমূল্য থেকেও ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি কমেছে বলে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাজারে এই পতনের পেছনে মূল উদ্বেগ হলো, এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাশিত মুনাফা পাওয়া যাবে কি না। গত কয়েক বছরে এআই প্রযুক্তির চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চিপ নির্মাতা, ডেটা সেন্টার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এবং বিদ্যুৎ সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দামও বেড়েছে। কিন্তু এখন বিনিয়োগকারীদের একাংশ মনে করছেন, এসব অবকাঠামো তৈরিতে যে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তা থেকে আয় আসতে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সময় লাগতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয় পাওয়ার পর বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা করছেন, নতুন কংগ্রেস ডেটা সেন্টার নির্মাণ, বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার এবং এআই প্রযুক্তির ওপর কঠোর নিয়ম চালু করতে পারে। কারণ ডেটা সেন্টার পরিচালনায় বিপুল বিদ্যুৎ ও পানি প্রয়োজন হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকায় এসব স্থাপনার কারণে বিদ্যুতের দাম ও পরিবেশের ওপর চাপ বাড়ার অভিযোগও রয়েছে। নির্বাচনের আগে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের কেউ কেউ নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণে বিধিনিষেধ আরোপের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
দরপতনের ধাক্কা সবচেয়ে বেশি লেগেছে প্রযুক্তি ও চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর। এআই প্রযুক্তির অন্যতম প্রধান চিপ সরবরাহকারী এনভিডিয়ার শেয়ারদর এক দিনেই ৯ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে এএমডির শেয়ার কমেছে ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ। ডেটা সেন্টারে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান জিই ভার্নোভার শেয়ারও ৭ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে।
অ্যাপল, মাইক্রোসফট, অ্যালফাবেট, অ্যামাজন, মেটা, এনভিডিয়া ও টেসলা নিয়ে গঠিত প্রযুক্তি খাতের পরিচিত ‘ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন’ গোষ্ঠীর সম্মিলিত বাজারমূল্য থেকেও ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি কমেছে। ইলন মাস্কের টেসলার শেয়ারদর প্রায় ১১ শতাংশ এবং স্পেসএক্সের শেয়ারদর প্রায় ৮ শতাংশ কমে যায়। নির্বাচনের পর দুই দিনের দরপতনে টেসলা ও স্পেসএক্সের সম্মিলিত বাজারমূল্য প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন ডলার কমেছে বলে দ্য মটলি ফুলের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দরপতনের প্রভাব পরদিন শুক্রবার (৬ নভেম্বর) এশিয়ার শেয়ারবাজারে ছড়িয়ে পড়ে। জাপানের নিক্কেই সূচক প্রায় ৬ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কোস্পি সূচকও প্রায় ৬ শতাংশ কমে যায়। বিশেষ করে এআই ডেটা সেন্টারে ব্যবহৃত মেমোরি চিপ ও যন্ত্রপাতি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারে বড় দরপতন দেখা যায়। দক্ষিণ কোরিয়ার এসকে হাইনিক্সের শেয়ারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
ইউরোপের বাজারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। শুক্রবার লেনদেনের শুরুতে যুক্তরাজ্যের এফটিএসই ১০০ সূচক প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং জার্মানির ডিএএক্স প্রায় ১ দশমিক ৩ শতাংশ কমে যায়। ইউরোপের অন্যান্য বাজারেও দরপতন দেখা যায়। তবে শুক্রবার দিনের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার পরিস্থিতি কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায়। নাসডাক ১ দশমিক ১ শতাংশ এবং এসঅ্যান্ডপি ৫০০ দশমিক ৩১ শতাংশ বাড়লেও ডাও জোন্স ০ দশমিক ৪৬ শতাংশ কমে। অর্থাৎ আগের দিনের বড় পতনের কিছুটা পুনরুদ্ধার হলেও সপ্তাহজুড়ে তিনটি প্রধান সূচকই লোকসানে ছিল।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগ, ভবিষ্যৎ মুনাফা নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং সম্ভাব্য সরকারি নিয়ন্ত্রণের আশঙ্কা মিলেই এই দরপতনের চাপ তৈরি করেছে। তবে ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী জয় মানেই এআই শিল্পে নতুন বিধিনিষেধ কার্যকর হয়ে গেছে, বিষয়টি এমন নয়। বিনিয়োগকারীরা মূলত ভবিষ্যতে নীতিগত পরিবর্তনের সম্ভাবনা বিবেচনা করেই শেয়ার বিক্রি করেছেন।

