খাবার সামনে নিয়ে মোবাইল হাতে বসা এখন অনেকের কাছেই অস্বাভাবিক কোনো দৃশ্য নয়। কিন্তু সেই মোবাইলের পর্দায় যদি নিয়মিত ভেসে ওঠে গোপাল ভাঁড়ের গল্প, তাহলে সেটিও ধীরে ধীরে আলাদা এক অভ্যাসে পরিণত হয়। অনেকের ক্ষেত্রে বিষয়টি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে গোপালের গল্প ছাড়া খাবার খাওয়াটাই যেন অসম্পূর্ণ লাগে।
প্রশ্ন হলো, গোপাল ভাঁড়ের সঙ্গে খাবারের এমন সম্পর্ক তৈরি হলো কেন?
এর পেছনে শুধু হাস্যরস বা বিনোদনের বিষয়টি কাজ করছে না। বরং এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শৈশবের স্মৃতি, পরিচিত চরিত্র, ছোট গল্পের সহজ বিন্যাস এবং মোবাইলভিত্তিক বিনোদনের অভ্যাস। সব মিলিয়ে গোপাল ভাঁড় অনেকের কাছে হয়ে উঠেছে এমন এক ধরনের বিনোদন, যা আলাদা মনোযোগ দাবি করে না কিন্তু খাওয়ার সময় একাকিত্ব বা একঘেয়েমি দূর করে।
একসময় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে গল্প করতে করতে খাবার খাওয়ার চল ছিল। খাবারের টেবিল ছিল একই সঙ্গে গল্প, হাসি-ঠাট্টা ও পারিবারিক যোগাযোগের জায়গা। জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে সেই সময় কমেছে। তার জায়গায় এসেছে স্মার্টফোন। ফলে খাবারের সময়ের সঙ্গীও বদলে গেছে।
এই পরিবর্তিত অভ্যাসে গোপাল ভাঁড়ের মতো কনটেন্ট সহজেই জায়গা করে নিয়েছে। কারণ এগুলোর গল্প বুঝতে দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখতে হয় না। একটি ছোট গল্প দেখা যায় কয়েক মিনিটে। গল্পের চরিত্রগুলো পরিচিত হওয়ায় নতুন করে কিছু বোঝার চাপও নেই। ফলে খাবারের ফাঁকে ফাঁকে দেখা যায়, আবার পরের দিন একই ধরনের আরেকটি গল্পে চলে যাওয়া যায়।

রিফাতের অভিজ্ঞতা এর একটি উদাহরণ। তিনি বলেন, ‘আমি এখনও গোপাল ভাঁড় না দেখে তিন বেলার খাবারই খেতে পারি না।’
এ ধরনের অভ্যাসকে শুধু বিনোদনের পছন্দ হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি ধরা পড়ে না। একই কাজের সঙ্গে একই ধরনের বিনোদন বারবার যুক্ত হতে থাকলে সেটি দৈনন্দিন রুটিনের অংশ হয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ খাবারের সময় মোবাইল হাতে নেওয়া এবং গোপাল ভাঁড় চালু করা- দুটি কাজ বারবার একসঙ্গে ঘটতে ঘটতে একসময় পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।
এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ- পরিচিত কনটেন্ট মানুষের কাছে এক ধরনের মানসিক স্বস্তি তৈরি করতে পারে। নতুন কোনো সিনেমা বা জটিল গল্পের ক্ষেত্রে যেমন মনোযোগ দিয়ে দেখতে হয়, গোপাল ভাঁড়ের পরিচিত গল্পে সেই চাপ তুলনামূলক কম। ফলে খাওয়ার সময় এটিকে অনেকের কাছে ‘ব্যাকগ্রাউন্ড এন্টারটেইনমেন্ট’ হিসেবেও মনে হয়।
শৈশবের স্মৃতিও এই জনপ্রিয়তার একটি বড় কারণ। গোপাল ভাঁড়ের চরিত্রের সঙ্গে পরিচয় অনেকেরই ছোটবেলা থেকে। টেলিভিশন, বই কিংবা অ্যানিমেশন- বিভিন্ন মাধ্যমে দেখা সেই চরিত্র বড় হওয়ার পরও অপরিচিত হয়ে যায়নি। বরং মোবাইলের যুগে পুরোনো সেই পরিচিত চরিত্র নতুন করে সামনে আসার সুযোগ পেয়েছে।
অনার্স প্রথম বর্ষের একজন ছাত্রী মাহি বলেন, ‘আমার বয়স যতই হোক, আমি কোনো দিন গোপাল ভাঁড় দেখা ছাড়ব না।’
অর্থাৎ এখানে বিনোদনের পাশাপাশি নস্টালজিয়াও কাজ করছে। ছোটবেলার পরিচিত একটি চরিত্র যখন বর্তমানের ব্যস্ত জীবনের মধ্যে ফিরে আসে, তখন সেটি অনেকের কাছে শুধু হাসির বিষয় থাকে না। পরিচিত সেই গল্পের সঙ্গে যুক্ত হয় পুরোনো দিনের স্মৃতি।

শীতের সময় এই অভ্যাস আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে বলে মনে করেন অনেকে। গরম খাবার, কম্বলের আরাম এবং মোবাইলের পর্দায় পরিচিত গল্প- এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে মিলে তৈরি করে আরামদায়ক একটি ব্যক্তিগত সময়। রাইসার ভাষায়, ‘কম্বল মুড়ি দিয়ে গোপাল ভাঁড়, তার সঙ্গে গরম ধোঁয়া ওঠা খাবার- আমার সবচেয়ে পছন্দের কম্বিনেশন।’
তবে এই অভ্যাসের একটি বিপরীত দিকও আছে। খাবারের সময় বিনোদনে অতিরিক্ত মনোযোগ দিলে নিজের খাওয়ার প্রতি সচেতনতা কমতে পারে। কখন কতটা খাওয়া হচ্ছে, খাবারের স্বাদ কেমন, পেট ভরেছে কি না- এসব সংকেতের প্রতি মনোযোগও কমে যেতে পারে।
অর্থাৎ সমস্যা গোপাল ভাঁড়কে ঘিরে নয়। মূল বিষয় হলো খাবারের সঙ্গে স্ক্রিনকে স্থায়ীভাবে জুড়ে দেওয়ার অভ্যাস। বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে গোপাল ভাঁড় জনপ্রিয় হতে পারে, কিন্তু সেটি যদি খাবারের সময় মোবাইল ছাড়া চলতে না পারার অভ্যাস তৈরি করে, তখন বিষয়টি নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।
গোপাল ভাঁড়ের জনপ্রিয়তার গল্প তাই শুধু একটি হাসির চরিত্রের জনপ্রিয়তার গল্প নয়। এটি একই সঙ্গে বদলে যাওয়া খাবারের সংস্কৃতি, শৈশবের স্মৃতি এবং মোবাইলনির্ভর বিনোদনের গল্প। একসময় খাবারের টেবিলে মানুষ মানুষের সঙ্গে গল্প করত। এখন অনেকের খাবারের টেবিলে সেই গল্পের জায়গা নিয়েছে একটি পর্দা। আর সেই পর্দায় বারবার ফিরে আসছে পরিচিত এক চরিত্র- গোপাল ভাঁড়।

