বিশেষ বিশ্লেষণ
অফিস থেকে বাসায় ফেরার পথে আপনার সামনে দুটো অপশন; হেঁটে গেলে বিশ মিনিট, ভাড়া দিলে পাঁচ মিনিট। বেশিরভাগ মানুষ না ভেবেই ভাড়ার রিকশায় ওঠেন, অথচ এই সিদ্ধান্তটার পেছনে আসলে একটা অর্থনৈতিক হিসাব লুকিয়ে আছে, যেটা আমরা সচেতনভাবে করি না। প্রশ্নটা তাই সহজ শোনালেও এর উত্তর মোটেও সহজ নয়, টাকা খরচ করে সময় বাঁচানো কবে সত্যিকারের লাভ, আর কবে সেটা নিছক অভ্যাস বা বিলাসিতা। আয় বাড়ার সাথে সাথে ঢাকার মতো শহরে মানুষ ক্রমাগত এই সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হচ্ছেন। রান্না করবেন নাকি অর্ডার দেবেন, বাসে ঠাসাঠাসি করে যাবেন নাকি রাইড শেয়ারিং অ্যাপ ডাকবেন। এই লেখায় অর্থনীতির একটা মৌলিক নীতির আলোকে বিষয়টা ভেঙে দেখার চেষ্টা করছি।
সময় একটা সম্পদ, কিন্তু এটা ফেরত পাওয়া যায় না
অর্থনীতিতে “সুযোগ ব্যয়” বা অপরচুনিটি কস্ট নামে একটা মৌলিক নীতি আছে। প্রতিটি সিদ্ধান্তের একটা লুকানো দাম থাকে, যেটা হলো সেই সময় বা সম্পদ দিয়ে আপনি অন্য যা করতে পারতেন, তার মূল্য। টাকা আর সময়ের মধ্যে একটা বড় পার্থক্য এখানেই; টাকা হারালে আবার আয় করা যায়, ধার করা যায়, সঞ্চয় করা যায়। কিন্তু একবার চলে যাওয়া একটা ঘণ্টা কোনোভাবেই ফেরত পাওয়া যায় না, বাজারে এটা কেনাও যায় না। ফলে যুক্তিসঙ্গতভাবে দেখলে, সময়ের প্রকৃত মূল্য প্রায়ই টাকার চেয়ে বেশি হওয়া উচিত, বিশেষ করে যাদের হাতে সময়ের চেয়ে টাকার সরবরাহ তুলনামূলক বেশি। এই সাধারণ নীতিটাই আসলে গোটা আলোচনার ভিত্তি।
হার্ভার্ডের গবেষণা যা প্রচলিত ধারণাকে উল্টে দিয়েছে
“টাকা দিয়ে সুখ কেনা যায় না” এই প্রবাদটা প্রায় সবাই শুনেছেন। কিন্তু হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল ও ব্রিটিশ কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অ্যাশলি হুইলান্সের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি গবেষণা এই ধারণাকে আংশিকভাবে চ্যালেঞ্জ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ডেনমার্ক ও নেদারল্যান্ডসের ছয় হাজারের বেশি মানুষের ওপর চালানো এই সমীক্ষায় দেখা গেছে, যারা বাসা পরিষ্কার বা রান্নার মতো কাজ টাকা দিয়ে অন্যকে দিয়ে করান, তাদের জীবন-সন্তুষ্টির মাত্রা তুলনামূলক বেশি। শুধু সহ-সম্পর্ক নয়, একটা পরীক্ষামূলক গবেষণায় প্রমাণ পাওয়া গেছে যে কার্যকারণ সম্পর্কও আছে। একই সপ্তাহান্তে যারা কোনো একটা কাজ থেকে সময় বাঁচাতে টাকা খরচ করেছেন, তারা একই পরিমাণ টাকায় জিনিস কেনা মানুষদের চেয়ে বেশি খুশি অনুভব করেছেন। গবেষকদের ব্যাখ্যা হলো, আয় বাড়ার সাথে সাথে মানুষের হাতে সময় কমে যাওয়ার একটা “টাইম ফ্যামিন” বা সময়-দুর্ভিক্ষ তৈরি হয়, আর টাকা দিয়ে সময় কেনা এই চাপ থেকে খানিকটা মুক্তি দেয়।
ঢাকার রাস্তায় লাখো মানুষ এই হিসাবটাই না বুঝে কষছেন
তত্ত্বটা বিদেশি গবেষণাগারে জন্ম নিলেও, বাস্তবে এর প্রয়োগ আমাদের চোখের সামনেই ঘটে চলেছে। বাংলাদেশে রাইড-শেয়ারিং খাতের বাজার এখন প্রায় ২৫৯ মিলিয়ন ডলারের, আর আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরে এটা বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা আছে। শুধু ঢাকা-চট্টগ্রামেই প্রতিদিন গড়ে পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশ হাজার অনলাইন ফুড অর্ডার হয়, যেখানে পুরো দেশে এই সংখ্যা প্রায় ষাট হাজার ছুঁয়ে যায়। পাঠাও একাই ঢাকায় তিন লক্ষাধিক নিবন্ধিত চালক-রাইডার নিয়ে এক কোটির বেশি ব্যবহারকারীকে সেবা দিচ্ছে। এই সংখ্যাগুলো আসলে একটা জিনিসই বলছে; মানুষ ক্রমশ বুঝতে শিখছে, রান্নাঘরে ঘণ্টাখানেক ব্যয় করার চেয়ে সেই সময়টা পরিবারকে দেওয়া বা কাজে লাগানো বেশি মূল্যবান, আর সেই মূল্যবোধের বিনিময়ে তারা টাকা খরচ করতে রাজি। অর্থনীতির ভাষায় বলতে গেলে, এটা একধরনের “সময়ের বাজার” তৈরি হওয়ার লক্ষণ, যেখানে ডেলিভারি রাইডার বা রাইড-শেয়ারিং চালকরা তাদের নিজেদের সময় বিক্রি করছেন, আর গ্রাহকরা সেই সময় কিনে নিজের সময় বাঁচাচ্ছেন।
কিন্তু প্রতিটি খরচই কি লাভজনক
এখানেই আসল সতর্কতার জায়গা। সময় বাঁচানোর জন্য টাকা খরচ করা তখনই যুক্তিসঙ্গত, যখন বাঁচানো সময়টা এমন কোনো কাজে ব্যবহৃত হয় যার মূল্য সেই খরচের চেয়ে বেশি। হতে পারে সেটা বাড়তি আয়, পরিবারের সাথে সময়, স্বাস্থ্যচর্চা বা বিশ্রাম। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় দেখা যায়, মানুষ টাকা খরচ করে সময় বাঁচাচ্ছেন ঠিকই, অথচ সেই বাঁচানো সময়টা কোনো অর্থবহ কাজে না গিয়ে অলসভাবে ফোন স্ক্রল করাতেই ব্যয় হচ্ছে। তখন এই লেনদেনটা আর লাভজনক থাকে না, বরং টাকার অপচয় হয়ে দাঁড়ায়। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্যের দিক হলো, এই “সময় কেনা”র সুযোগ সবার জন্য সমান নয়। ২০২৩ সালে সংশোধনের পরও বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি মাসে মাত্র সাড়ে বারো হাজার টাকা, যেখানে একজন ফুড ডেলিভারিম্যান মাসে পনেরো থেকে বিশ হাজার টাকা আয় করতে পারেন। যাদের আয় জীবনধারণের ন্যূনতম চাহিদা মেটাতেই শেষ হয়ে যায়, তাদের কাছে “সময় বাঁচাতে টাকা খরচ” এই বিলাসিতার প্রশ্নই ওঠে না। বরং তারাই সেই সময় বিক্রি করে অন্যের সময় বাঁচানোর কাজটা করছেন। তাই এই আলোচনা মূলত তাদের জন্য প্রাসঙ্গিক, যাদের হাতে ন্যূনতম প্রয়োজনের বাইরেও কিছু আয় উদ্বৃত্ত থাকে।
নিজের এক ঘণ্টার দাম বের করার সহজ হিসাব
তাহলে সিদ্ধান্তটা কীভাবে নেবেন? আমার পর্যবেক্ষণ হলো, একটা সহজ সূত্র এখানে কাজে লাগানো যায়, আপনার মাসিক আয়কে মাসে মোট কর্মঘণ্টা দিয়ে ভাগ করলে যে সংখ্যাটা পাওয়া যায়, সেটাই মোটামুটি আপনার এক ঘণ্টার আর্থিক মূল্য। এরপর কোনো একটা সেবা; যেমন খাবার অর্ডার, রাইড শেয়ারিং বা বাসার কাজের সাহায্য; যদি আপনার সেই হিসাব করা ঘণ্টা-মূল্যের চেয়ে কম খরচে বেশি সময় বাঁচিয়ে দেয়, এবং বাঁচানো সময়টা আপনি সচেতনভাবে অর্থবহ কোনো কাজে লাগান, তাহলে সেই খরচ যুক্তিসঙ্গত বিনিয়োগ। কিন্তু যদি সেবার খরচ আপনার ঘণ্টা-মূল্যের চেয়ে বেশি হয়ে যায়, অথবা বাঁচানো সময় কোনো কাজে না লাগিয়ে অকারণে নষ্ট হয়, তাহলে সেটা আর অর্থনৈতিক যুক্তিতে টেকে না। তখন এটা নিছক আরামের জন্য খরচ, যা করা যেতেই পারে, কিন্তু সেটাকে “লাভজনক বিনিয়োগ” বলার সুযোগ নেই। এই পার্থক্যটা বোঝাই আসলে পুরো আলোচনার মূল জায়গা।
সবশেষে বলতে চাই, সময় বাঁচাতে টাকা খরচ করাটা নিজে থেকে ভালো বা মন্দ কিছু নয়, এটা নির্ভর করে সেই বাঁচানো সময়টা আপনি কীভাবে ব্যবহার করছেন তার ওপর। যে সমাজে আয় বাড়ছে, শহুরে জীবনযাত্রা ব্যস্ত হচ্ছে, সেখানে এই হিসাবটা শেখা ক্রমশ জরুরি হয়ে উঠছে। পরের বার যখন রিকশা নেবেন নাকি হাঁটবেন, রান্না করবেন নাকি অর্ডার দেবেন; এই সিদ্ধান্তের মুহূর্তে একবার নিজের ঘণ্টার দামটা মনে করিয়ে নিলে, সিদ্ধান্তটা আর অভ্যাসের বশে নয়, সচেতন হিসাবের ফল হয়ে দাঁড়াবে।
রাকিবুল ইসলাম।
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

