বাংলা সাহিত্যের অন্যতম আলোচিত লেখক আহমদ ছফা চিরকুমার ছিলেন—এ তথ্য প্রায় সকলেরই জানা। তবে তাঁর ব্যক্তিজীবনের এমন একটি অধ্যায় রয়েছে, যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সাহিত্যাঙ্গনে আলোচনা চলে আসছে। বহু স্মৃতিচারণ, সাক্ষাৎকার এবং আত্মজীবনীমূলক লেখায় উঠে এসেছে ভাস্কর শামীম শিকদারের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগের কথা।
আহমদ ছফার আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী’-তে এই অনুভূতির প্রতিফলন দেখা যায়। সেখানে শামীম শিকদারের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে ‘দূরদানা’ চরিত্রে। বিভিন্ন স্মৃতিচারণে উল্লেখ করা হয়েছে, শামীম শিকদার ছিলেন ছফার প্রথম প্রেমিকা। তবে এই প্রেমের বড় অংশই ছিল একতরফা।
চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসার পর জীবনযুদ্ধের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন আহমদ ছফা। স্থায়ী কোনো আশ্রয় ছিল না তাঁর। কখনো এখানে, কখনো সেখানে থেকেই দিন কাটাত তার। জীবিকা নির্বাহের জন্য বিভিন্ন পত্রিকায় অনুবাদ এবং প্রুফরিডিংয়ের কাজ করতেন। আয়ও ছিল অত্যন্ত সীমিত। তিনবার প্রুফ দেখার পর প্রতি ফর্মার জন্য পারিশ্রমিক মিলত মাত্র সাড়ে তিন আনা।
এই অনিশ্চিত ও কঠিন সময়ে ব্যক্তিগত জীবনেও এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল তাঁর মধ্যে। সমসাময়িকদের বর্ণনায় জানা যায়, যেসব নারীর সঙ্গে পরিচয় হতো, কিছুদিনের মধ্যেই তাঁদের বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসতেন তিনি। এতে অনেকেই বিব্রত ও বিরক্ত হতেন। একই সময়ে তিনি পরিচিতজনদের কাছে দাবি করতেন, বিভিন্ন নারী তাঁকে বিয়ে করতে আগ্রহী। সমালোচকদের মতে, তখন বিয়ে এবং পারিবারিক আশ্রয়ের আকাঙ্ক্ষা তাঁকে গভীরভাবে তাড়িত করছিল।
এমন পরিস্থিতিতে অনেক নারী তাঁর সঙ্গ এড়িয়ে চললেও শামীম শিকদার সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। শামীম ছিলেন প্রখ্যাত ছাত্রনেতা সিরাজ শিকদারের বোন। স্বাধীনচেতা ও বেপরোয়া স্বভাবের কারণে তিনি সমকালীন মহলে বেশ পরিচিত ছিলেন। অনেকেই তাঁকে ডাকতেন ‘পান্ডা শামীম’ নামে।
একদিন শামীম শিকদারকে নিয়ে আহমদ ছফা হাজির হন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের বাসায়। ঘরে ঢুকতেই তাঁদের দেখে অধ্যাপক জানতে চান, কেন এসেছেন।
জবাবে ছফা বলেন, “আমরা বিয়ে করবো। শামীম আমাকে বিয়ে করতে চায়; বিয়ে করার জন্য এসেছি।”
হতবাক হয়ে অধ্যাপক জানতে চান, তাঁর ভূমিকা কী।
তখন ছফা বলেন, “আপনাকে লাগবে বলেই তো এসেছি। আমার ঢাকায় থাকার জায়গা নেই। বিয়ের পরে আপনার এখানে থাকবো।”
বিষয়টি শুনে আবুল কাসেম ফজলুল হক একটি শর্তে রাজি হন। তিনি জানান, আগে বিয়ে রেজিস্ট্রি করতে হবে, কাজী আনতে হবে। তারপর থাকার ব্যবস্থা করা যাবে।
এরপর কাজী আনতে বেরিয়ে যান আহমদ ছফা। কিন্তু তাঁর অনুপস্থিতিতেই নাটকীয় মোড় নেয় ঘটনাটি।
শামীম শিকদার অধ্যাপককে জানান, পুরো বিষয়টি তিনি মজা করে করেছেন। তাঁর ভাষায়, “বিষয়টা আমি মজা করেছি। ওর সাথে স্রেফ মজা করলাম। ছফার সাথে বিয়ে করা যায় নাকি! আর ওসব বিয়ে সংসারে আমার পোষাবে না। তিনি সবাইকে বলে বেড়ান আমি নাকি তাঁকে বিয়ে করার জন্য পাগল। আদতে যতোসব ফালতু কথা। আর উনার ব্যক্তিত্ব বলতে কিছু আছে কিনা আমার সন্দেহ। যাকেই দেখেন তাঁকেই বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসেন।”
পরে ফিরে এসে শামীমকে না পেয়ে পুরো ঘটনা জানতে পারেন আহমদ ছফা। ঘনিষ্ঠজনদের বর্ণনায় জানা যায়, এই ঘটনায় তিনি গভীরভাবে আহত হয়েছিলেন। অনেকে মনে করেন, সেই আঘাত তিনি জীবনের শেষ পর্যন্ত বহন করেছেন। পরবর্তীকালে বিয়ে বা প্রেম নিয়ে আর কখনো গুরুত্বের সঙ্গে ভাবেননি বলেও বিভিন্ন স্মৃতিচারণে উল্লেখ রয়েছে। তবে ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন সত্ত্বেও তাঁদের বন্ধুত্ব দীর্ঘদিন অটুট ছিল।
কবি অসীম সাহাও তাঁর স্মৃতিকথায় এই সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন—
“একদিন সন্ধ্যায় ছফা ভাইয়ের ওখানে যেতেই তিনি আমাকে বললেন, চল অসীম, শামীমের ওখানে যাই। আন্তর্জাতিক ছাত্রাবাসের পূর্বদিক দিয়ে তখন আর্ট কলেজে যাবার রাস্তা ছিল। আমরা বেরিয়ে পড়ি। হাঁটার এক ফাঁকে ছফা ভাই আমাকে হঠাৎ করেই বলে ফেললেন, বুঝলে অসীম, আমি বোধহয় শামীমকে ভালবেসে ফেলেছি। আমি বললাম, ভাল কথা। তিনি সঙ্গে সঙ্গে বললেন, না না, কিন্তু ওকে আমি বিয়ে করব না। আমি বললাম, কেন? তিনি বললেন, ও আমাকে মেরে ফেলবে।” (ছফা, স্মা., পৃ. ৮৫)
এই স্মৃতিচারণ থেকে স্পষ্ট হয়, শামীম শিকদারের প্রতি আহমদ ছফার অনুভূতি ছিল গভীর। তবে সেই অনুভূতি কখনো পূর্ণতা পায়নি। বাংলা সাহিত্যের এই প্রভাবশালী লেখকের ব্যক্তিজীবনের অন্যতম আলোচিত এবং বেদনাময় অধ্যায় হয়ে রয়ে গেছে শামীম শিকদারকে ঘিরে তাঁর অপূর্ণ প্রেমের গল্প।
সূত্র: অসীম সাহার স্মৃতিকথা ‘ছফা, স্মা.’, আহমদ ছফার আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী’ এবং সংশ্লিষ্ট স্মৃতিচারণ।

