সাহিত্যে নতুন চিন্তা, ভাষার ভিন্ন ব্যবহার এবং প্রচলিত কাঠামোর বাইরে সৃজনশীল কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কানাডীয় লেখিকা অ্যান কার্সন। কবিতা, অনুবাদ ও পরীক্ষামূলক সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক সাহিত্যাঙ্গনে নিজের আলাদা অবস্থান তৈরি করেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বাংলাদেশ সময় বিকেল ৫টায় সুইডেনের রাজধানী স্টকহোম থেকে সাহিত্যে নোবেলজয়ীর নাম ঘোষণা করা হয়। নোবেল কমিটি অ্যান কার্সনের সাহসী ও নতুন ধরনের সাহিত্যিক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে এবারের পুরস্কারে ভূষিত করেছে।
১৯৫০ সালে কানাডার টরন্টোতে জন্ম নেওয়া অ্যান কার্সনের সাহিত্যজীবন শুরু হয় প্রাচীন সাহিত্য ও ভাষার গভীর অধ্যয়ন থেকে। ১৯৮১ সালে তিনি ক্লাসিকস বিষয়ে ‘ওদি এত আমো এরগো সুম’ নামে ডক্টরাল গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। ল্যাটিন এই বাক্যাংশের অর্থ হলো—‘আমি ঘৃণা করি এবং আমি ভালোবাসি, তাই আমি আছি।’ এই ভাবনাই পরবর্তী সময়ে তার সাহিত্যিক অনুসন্ধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
অ্যান কার্সনের লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ভাষার প্রতি তার গভীর মনোযোগ। তিনি শুধু শব্দ ব্যবহার করেননি, বরং শব্দের উৎপত্তি, ইতিহাস ও পরিবর্তিত অর্থ নিয়েও কাজ করেছেন। তার অনেক সাহিত্যকর্মের সূচনা হয়েছে কোনো একটি শব্দের উৎস ও ব্যুৎপত্তি অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে।
কবিতার পাশাপাশি অ্যান কার্সন অনুবাদক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। বিশেষ করে প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যকে আধুনিক পাঠকের কাছে নতুনভাবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তার কাজ ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। গ্রিক কবি স্যাফোর কবিতার খণ্ডাংশ নিয়ে তার কাজ এবং ২০০২ সালে প্রকাশিত ‘ইফ নট, উইন্টার’ সাহিত্যজগতে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
এ ছাড়া গ্রিক নাট্যকার সফোক্লিসের ‘ইলেক্ট্রা’ ও ‘অ্যান্টিগোন’ এবং ইউরিপিডিসের ‘বাক্কাই’ নাটকের তার অনুবাদও উল্লেখযোগ্য। প্রাচীন সাহিত্যকে সরাসরি অনুবাদ না করে আধুনিক অনুভূতি ও ভাষার সঙ্গে মিলিয়ে নতুন ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য তার অনুবাদ আলাদা পরিচিতি পেয়েছে।
অ্যান কার্সনের সাহিত্যচর্চার আরেকটি বিশেষ দিক হলো প্রচলিত লেখার ধরন নিয়ে তার নিরন্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা। তিনি কবিতা, প্রবন্ধ, নাটক ও গদ্যের প্রচলিত সীমারেখাকে অনেক সময় একসঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছেন।
২০১৬ সালে প্রকাশিত তার বই ‘ফ্লোট’ এই বৈচিত্র্যের একটি বড় উদাহরণ। বইটিতে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লেখা ২২টি ছোট রচনা রয়েছে, যেগুলো পাঠক ইচ্ছামতো বিভিন্ন ক্রমে পড়তে পারেন। প্রচলিত বইয়ের কাঠামোর বাইরে গিয়ে এই ধরনের উপস্থাপন তার সৃজনশীলতার পরিচয় বহন করে।
১৯৯৫ সালে প্রকাশিত ‘গ্লাস, আয়রনি অ্যান্ড গড’ কাব্যগ্রন্থের ‘দ্য গ্লাস এসে’ অ্যান কার্সনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি। দীর্ঘ এই রচনায় কবিতা, প্রবন্ধ ও অন্যান্য সাহিত্যধারার সমন্বয় দেখা যায়। এর মাধ্যমে তিনি দীর্ঘ কবিতার একটি নতুন রূপ তৈরি করেন, যেখানে সাহিত্যিক ধারাগুলোর প্রচলিত বিভাজন অনেকটাই অস্পষ্ট হয়ে যায়।
১৯৯৮ সালে প্রকাশিত ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড : আ নভেল ইন ভার্স’ বইটি অ্যান কার্সনের সবচেয়ে আলোচিত কাজগুলোর একটি। বইটিতে তিনি প্রাচীন গ্রিক পুরাণ ও আধুনিক মানুষের অভিজ্ঞতাকে একসঙ্গে যুক্ত করেছেন। এর প্রধান চরিত্র গেরিয়ন—ডানাওয়ালা এক লাল দানব—যার মাধ্যমে লেখিকা পরিচয়, ভালোবাসা, একাকিত্ব ও মানবিক অনুভূতির বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন।
এই বইয়ের ধারণা এসেছে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর গ্রিক কবি স্টেসিখোরোসের গেরিয়নকে নিয়ে লেখা একটি কবিতার খণ্ডাংশ থেকে। প্রাচীন একটি কাহিনিকে আধুনিক ভাষা ও ভাবনার সঙ্গে যুক্ত করে অ্যান কার্সন সাহিত্যে এক ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা তৈরি করেছেন।
সাহিত্য ছাড়াও অ্যান কার্সন বিভিন্ন শিল্পমাধ্যমের সঙ্গে কাজ করেছেন। দৃশ্যশিল্পী, নৃত্য পরিচালক, অপেরা ও থিয়েটার নির্মাতাদের সঙ্গে তার যৌথ প্রকল্পগুলো তার বহুমাত্রিক সৃজনশীলতার পরিচয় দেয়। ২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘রং নর্মা’ বইতেও সাহিত্য, শিল্প, শিক্ষা ও মঞ্চ পরিবেশনার বিভিন্ন উপাদানের সমন্বয় দেখা যায়।
১৯৯০-এর দশক থেকেই আন্তর্জাতিক সাহিত্য অঙ্গনে অ্যান কার্সনের প্রভাব বাড়তে থাকে। তার লেখায় একই সঙ্গে প্রাচীন জ্ঞান, আধুনিক চিন্তা, ভাষার পরীক্ষা এবং মানবিক অনুভূতির গভীর অনুসন্ধান দেখা যায়।
সাহিত্যের প্রচলিত নিয়ম অনুসরণ না করে বরং নতুন পথ তৈরি করাই অ্যান কার্সনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য। তার নোবেল পুরস্কার শুধু একজন লেখকের ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং পরীক্ষামূলক ও ভিন্নধারার সাহিত্যচর্চারও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

