| • সংকটে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত |
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের চকচকে কর্পোরেট দেয়ালের আড়ালে জমে উঠছে এক নীরব সংকট। এই সংকটের নাম খেলাপি ঋণ নয়, প্রযুক্তিগত দুর্বলতাও নয়। এর নাম— অস্থির নেতৃত্ব, টিম বদলের সংস্কৃতি এবং কর্মীদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
দেশের বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বললে এখন একটি সাধারণ অনুভূতি খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে— অধিকাংশই মানসিকভাবে ক্লান্ত। কেউ হতাশ, কেউ ভীত, কেউবা প্রতিদিন অফিসে যাচ্ছেন শুধু চাকরিটা টিকিয়ে রাখার জন্য। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ কর্মীরাও আজ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। কারণ ব্যাংকিং খাতে এখন এক নতুন সংস্কৃতি দৃশ্যমান—“নতুন এমডি মানেই নতুন টিম।”
নতুন এমডির সঙ্গে আসে পুরোনো টিম
অনেক ব্যাংকে নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) যোগ দেওয়ার পর প্রথম কাজ হয়ে দাঁড়ায় নিজের বিশ্বস্ত টিমকে নতুন প্রতিষ্ঠানে নিয়ে আসা। বোর্ডের সামনে ব্যাখ্যা দাঁড় করানো হয়— বর্তমান কর্মীরা অদক্ষ, পরিবর্তন ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়, তাই প্রয়োজন “ফ্রেশ ব্লাড”। এরপর শুরু হয় অদৃশ্য চাপের খেলা। বছরের পর বছর ধরে নিষ্ঠা, অভিজ্ঞতা ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে কাজ করা কর্মকর্তারা ধীরে ধীরে কোণঠাসা হয়ে পড়েন। কারও দায়িত্ব কমিয়ে দেওয়া হয়, কাউকে মানসিক চাপে রাখা হয়, আবার কেউ নিজেই অপমান সহ্য করতে না পেরে চাকরি ছেড়ে দেন।
অথচ একটি ব্যাংক কোনো ব্যক্তির একক মঞ্চ নয়। এটি একটি ধারাবাহিক প্রতিষ্ঠান, যার ভিত দাঁড়িয়ে থাকে অভিজ্ঞতা, আস্থা ও সাংগঠনিক সংস্কৃতির ওপর। বাংলা প্রবাদে বলা হয়—“ন্যায্য দরে বিশ্বস্ত ভৃত্য, স্বর্গতুল্য গৃহ।” একজন বিশ্বস্ত কর্মী একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য কত বড় সম্পদ— এই প্রবাদ যেন সেই বাস্তবতাই মনে করিয়ে দেয়।
পরিবর্তনের নামে কি শুধু মানুষ বদল?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো— এত টিম পরিবর্তনের পর আদৌ কতটা বদল আসে? বাস্তবতা বলছে, বছর শেষে অনেক ব্যাংকের ব্যালান্স শিটে দৃশ্যমান ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায় না। তখন ব্যর্থতার দায় চাপানো হয় “সুশাসনের অভাব”, “পুরোনো সংস্কৃতি” কিংবা “অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার” ওপর। যেন “গুড গভর্নেন্স” শব্দটি অনেক ক্ষেত্রে হয়ে উঠেছে ব্যর্থতা ঢাকার নিরাপদ আশ্রয়। প্রবাদটি তাই নতুন অর্থে ফিরে আসে—“নাচতে না জানলে উঠোন বাঁকা।” অর্থাৎ নিজের অদক্ষতা স্বীকার না করে দোষ চাপানো হয় পরিবেশ বা অন্যের ওপর। তাহলে পরিবর্তনের নামে শুধু মানুষ বদল চলে।
দুই-তিন বছর পর আবারও একই গল্প। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে এখন যেন এক অদ্ভুত চক্র তৈরি হয়েছে। একজন এমডি একটি ব্যাংকে নিজের টিম বসান। কয়েক বছর পর মেয়াদ শেষ হলে তিনি আবার অন্য ব্যাংকে যোগ দেন— সঙ্গে নিয়ে যান পুরো টিম। নতুন জায়গায় গিয়ে আবারও পুরোনো কর্মীদের অযোগ্য প্রমাণের চেষ্টা শুরু হয়। এই চক্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রতিষ্ঠানগুলো। কারণ তারা হারায় সেই মানুষগুলোকে, যারা বছরের পর বছর ধরে প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করেছেন, সংকটে পাশে থেকেছেন এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা দিয়ে ব্যাংককে টিকিয়ে রেখেছেন। একজন দক্ষ ও বিশ্বস্ত কর্মী তৈরি হতে সময় লাগে। কিন্তু তাকে হারাতে লাগে মাত্র একটি সিদ্ধান্ত।
ভেঙে যাচ্ছে মানসিক নিরাপত্তা
ব্যাংকিং খাতে এই সংস্কৃতি শুধু কর্মীদের চাকরির অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে না, ধ্বংস করছে তাদের মানসিক স্থিতিও। অনেক কর্মকর্তা এখন আর দীর্ঘমেয়াদে কোনো পরিকল্পনা করতে পারেন না। পরিবার, ভবিষ্যৎ, ক্যারিয়ার— সবকিছুতেই তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তা। কারণ তারা জানেন না— পরবর্তী এমডি আসার পর তারা আদৌ “নিজের জায়গায়” থাকবেন কি না।
অথচ একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত শক্তি শুধু পুঁজি বা প্রযুক্তিতে নয়; তার মানবসম্পদেও নিহিত। বাংলা প্রবাদটি তাই অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক— “ভাত ছিটালে কাকের অভাব হয় না, কিন্তু কোকিলের অভাব ঠিকই হয়।” সাধারণ কর্মী পাওয়া যায়, কিন্তু দক্ষ ও গুণী কর্মী সবসময়ই বিরল।
তবে পুরো চিত্রটাই হতাশার নয়। এখনো বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে এমন অনেক দূরদর্শী ও দক্ষ এমডি রয়েছেন, যারা যেকোনো টিম নিয়েই সফলভাবে কাজ করতে পারেন। তারা জানেন— প্রতিষ্ঠান গড়তে হলে শুধু নিজের মানুষ বসানো যথেষ্ট নয়; বরং বিদ্যমান কর্মীদের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে একটি টেকসই সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হয়। সত্যিকারের নেতৃত্ব সেখানেই, যেখানে মানুষকে বাদ দেওয়া নয়— মানুষকে সঙ্গে নেওয়া হয়।
দোষ শুধু নতুন এমডির নয়, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোরও
ব্যাংকিং খাতের এই বাস্তবতায় শুধু নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালককে দায়ী করলে পুরো চিত্রটি বোঝা যাবে না। বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রে নতুন এমডি এমন একটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন যেখানে ব্যবসায়িক লক্ষ্য, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, কমপ্লায়েন্স কিংবা কর্মদক্ষতার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি বিদ্যমান থাকে। ফলে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একজন নতুন এমডি সাধারণত পরিচালনা পর্ষদের কাছে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মুনাফা বৃদ্ধি, সুশাসন নিশ্চিতকরণ, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েই দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
কিন্তু প্রায়ই দেখা যায়, নতুন নেতৃত্ব এবং বিদ্যমান কর্মীবাহিনীর মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয় ও আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য পর্যাপ্ত সময় ও কাঠামোগত সহায়তা দেওয়া হয় না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে নেতৃত্ব পরিবর্তনকে সাংগঠনিক রূপান্তরের পরিবর্তে জনবল পরিবর্তনের মাধ্যমে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়। অথচ সফল প্রতিষ্ঠানগুলোতে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা, জ্ঞান হস্তান্তর, টিম বিল্ডিং এবং পরিবর্তন ব্যবস্থাপনাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। একটি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করে নতুন নেতৃত্ব ও বিদ্যমান মানবসম্পদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রতিষ্ঠার ওপর।
এখন কী করা প্রয়োজন?
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে নেতৃত্ব পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে যে অনিশ্চয়তা ও সাংগঠনিক অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে, তা মোকাবিলায় কয়েকটি কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।
- ১. নেতৃত্ব পরিবর্তনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ট্রানজিশন নীতি প্রণয়নঃ নতুন এমডি যোগদানের পর নির্দিষ্ট সময়ের জন্য একটি ট্রানজিশন ফ্রেমওয়ার্ক অনুসরণ বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। এতে বিদ্যমান টিমের সক্ষমতা মূল্যায়ন, দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস এবং পরিবর্তন ব্যবস্থাপনার একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিশ্চিত হবে। প্রাতিষ্ঠানিক ট্রানজিশন নীতি হলো নেতৃত্ব পরিবর্তনের সময় দায়িত্ব হস্তান্তর, টিম সমন্বয়, কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন এবং সাংগঠনিক ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার জন্য প্রণীত একটি স্বচ্ছ ও কাঠামোবদ্ধ প্রক্রিয়া।
- ২. গুরুত্বপূর্ণ পদে মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করাঃ কৌশলগত পদগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা পূর্বপরিচয়ের পরিবর্তে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং কর্মসম্পাদনকে প্রধান বিবেচ্য করতে হবে। এতে প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক সংস্কৃতি শক্তিশালী হবে।
- ৩. বোর্ডের তদারকি ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধিঃ পরিচালনা পর্ষদকে শুধু আর্থিক ফলাফল নয়, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, কর্মী ধরে রাখার হার এবং সাংগঠনিক স্থিতিশীলতার বিষয়েও নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে।
- ৪. কর্মীদের জন্য মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাঃ একটি সুস্থ কর্মপরিবেশ গড়ে তুলতে ভয়ভীতি বা অনিশ্চয়তার সংস্কৃতির পরিবর্তে আস্থা, সম্মান এবং পেশাগত মর্যাদার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। কর্মীদের মতামত ও উদ্বেগ প্রকাশের জন্য নিরাপদ প্ল্যাটফর্ম থাকা প্রয়োজন।
- ৫. অভিজ্ঞতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতির সুরক্ষাঃ দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের জ্ঞান ও দক্ষতাকে প্রতিষ্ঠানের সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। নেতৃত্ব পরিবর্তনের সময় এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর জন্য কাঠামোগত ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
- ৬. এমডির কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের মানদণ্ড পুনর্নির্ধারণঃ শুধু স্বল্পমেয়াদি মুনাফা নয়; মানবসম্পদ উন্নয়ন, উত্তরাধিকার পরিকল্পনা (Succession Planning), সুশাসন, কর্মী সন্তুষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতাকেও মূল্যায়নের অংশ করতে হবে।
৭. টিম বিল্ডিং ও পরিবর্তন ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগঃ নতুন নেতৃত্ব এবং বিদ্যমান কর্মীদের মধ্যে আস্থা ও সহযোগিতার পরিবেশ তৈরির জন্য নিয়মিত টিম বিল্ডিং, নেতৃত্ব উন্নয়ন এবং সাংগঠনিক সংস্কৃতি উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করা উচিত।
শেষ কথা
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে শুধু আর্থিক নয়, একটি মানবসম্পদ ও নেতৃত্বসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জেরও মুখোমুখি। একটি ব্যাংকের প্রকৃত শক্তি তার ভবন, প্রযুক্তি বা মূলধনে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সেই মানুষগুলোর মধ্যে নিহিত, যারা বছরের পর বছর ধরে প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিয়ে যায়। নেতৃত্ব পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া। কিন্তু সেই পরিবর্তন যদি প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা, কর্মীদের আস্থা এবং সাংগঠনিক সংস্কৃতিকে দুর্বল করে দেয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানের জন্য সুফলের পরিবর্তে ক্ষতির কারণ হতে পারে।
টেকসই ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে প্রয়োজন ব্যক্তি-কেন্দ্রিক নয়, প্রতিষ্ঠান-কেন্দ্রিক নেতৃত্ব; প্রতিযোগিতা নয়, সহযোগিতার সংস্কৃতি; এবং সর্বোপরি এমন একটি কর্মপরিবেশ, যেখানে দক্ষতা, সততা ও অভিজ্ঞতা যথাযথ মর্যাদা পায়। অন্যথায় নেতৃত্ব বদলাবে, টিম বদলাবে, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন অধরাই থেকে যাবে।
লেখক—কাজী মাহমুদুর রহমান
চিফ লিগ্যাল অফিসার, ইউনিয়ন ব্যাংক পিএলসি

