আজকের মেকারফিল্ড উপনির্বাচনের ফলাফলের অপেক্ষায় থাকা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের মনে মিশ্র অনুভূতি থাকবে।
লেবার নেতা হিসেবে, তার দল জিতলে তিনি উদযাপন করবেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে, তার টিকে থাকা নির্ভর করে লেবারের হারের ওপর।
লেবার প্রার্থী অ্যান্ডি বার্নহামের বিজয় প্রধানমন্ত্রীর জন্য একটি ব্যক্তিগত বিপর্যয় হবে। বিজয়ী বার্নহাম স্টারমারের প্রধানমন্ত্রীত্ব ধ্বংস করার লক্ষ্যে অবিলম্বে ওয়েস্টমিনস্টারে যাবেন—যার অর্থ স্টারমারের পতন প্রায় নিশ্চিত।
ব্রিটিশ রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দুই বছরেরও কম সময় আগে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়া একজন ব্যক্তির জন্য এটি হবে এক অকল্পনীয় অপমান।
স্টারমার ক্ষমতায় থাকার জন্য লড়াই করবেন, নাকি নীরবে পদত্যাগ করবেন—তা নিয়ে আজ ব্যাপক আলোচনা চলছে। তাতে কিছু যায় আসে না। একটি খারাপ দাঁত অ্যানেস্থেটিক ব্যবহার করে অথবা আরও যন্ত্রণাদায়কভাবে তা ছাড়াই তুলে ফেলা যায়। ফলাফল একই।
ডাউনিং স্ট্রিটে বার্নহ্যাম একটি বিরাট সুবিধা নিয়ে শুরু করতেন: তিনি স্টারমার নন।
লোকেরা স্টারমারকে অপছন্দ করে। বার্নহ্যাম বন্ধুত্বপূর্ণ ও আন্তরিক এবং তার মধ্যে এমন এক মানবিক গুণ রয়েছে যা স্টারমারের মধ্যে নেই।
তিনি ম্যানচেস্টারের একজন অত্যন্ত সফল মেয়র ছিলেন। যারা অভিযোগ করে যে তার সাফল্যের অনেকটাই অন্যদের অবদান, সেই সমালোচকদের কথায় আমাদের খুব বেশি কান দেওয়া উচিত নয়। রাজনীতিবিদদের ক্ষেত্রে এটা সবসময়ই সত্য।
লড়াই করার একটি সুযোগ
উগ্র ডানপন্থীদের হারানোর কোনো আশাই স্টারমারের ছিল না। ভাগ্য ও দক্ষতা থাকলে বার্নহ্যামের একটি সুযোগ রয়েছে।
তিনি উত্তর থেকে এসেছেন, যা দক্ষিণ থেকে শাসিত একটি দেশে এক স্বস্তিদায়ক পরিবর্তন। কিন্তু বার্নহ্যামকে সমর্থন করার প্রধান কারণ হলো, তিনি তিক্ততা ও ঘৃণার রাজনীতির একটি বিকল্প প্রস্তাব করে ভোটারদের লেবার পার্টির দিকে ফিরিয়ে আনতে পারেন, যে রাজনীতি ব্রিটেনকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে।
তার বিচক্ষণ সহকর্মীরা বিষয়টি বোঝেন। জ্বালানি নিরাপত্তাবিষয়ক সচিব এবং লেবার পার্টির সাবেক নেতা এড মিলিব্যান্ড নিজেও প্রার্থী হতে পারতেন। কিন্তু এর পরিবর্তে তিনি কিংমেকারের ভূমিকা পালন করা বেছে নিয়েছেন।
মানুষ চাইবে বার্নহ্যাম সফল হোক। তার চেয়েও বড় কথা, তারা জানবে যে তার ব্যর্থতা মেনে নেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। বার্নহ্যামই লেবার পার্টির শেষ ভরসা। এর বিকল্প হলো বিস্মৃতি।
বার্নহ্যামের শুরুতেই একটি বড় অসুবিধা রয়েছে: ব্রিটেনের ৩ ট্রিলিয়ন পাউন্ড (৪ ট্রিলিয়ন ডলার) জাতীয় ঋণ। ১৯৯০-এর দশকের অনুকূল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার যেভাবে ব্যয় পরিকল্পনার মাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পেরেছিলেন, বার্নহ্যাম তা পারবেন না। পছন্দ হোক বা না হোক, বাজার তাকে তা করতে দেবে না।
কিন্তু বার্নহ্যামের করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ আছে। প্রথমত, তিনি লেবার পার্টিকে পুনর্গঠন করতে পারেন।
এটা মনে রাখা জরুরি যে, স্টারমার সত্যিকার অর্থে কখনোই লেবার পার্টির নেতা ছিলেন না। প্রকৃতপক্ষে, তিনি লেবার পার্টির একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর—আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ ও সদিচ্ছাপ্রণোদিত ‘থিঙ্ক ট্যাঙ্ক’ লেবার টুগেদার-এর—একটি কার্যকরী হাতিয়ার ছিলেন।
অনুসন্ধানী সাংবাদিক পল হোল্ডেন তার অসাধারণ গ্রন্থ ‘দ্য ফ্রড: কিয়ার স্টারমার, মরগান ম্যাকসুইনি, অ্যান্ড দ্য ক্রাইসিস অব ব্রিটিশ ডেমোক্রেসি’-তে যেমনটা দেখিয়েছেন, ‘লেবার টুগেদার’ ছিল একটি গোপন প্রকল্প, যা অবৈধভাবে অঘোষিত অর্থ দ্বারা সমর্থিত ছিল এবং এর উদ্দেশ্য ছিল একটি ডানপন্থী গোষ্ঠীর জন্য লেবার পার্টিকে দখল করা। এটিকে ‘মিলিট্যান্ট টেন্ডেন্সি’-র ডানপন্থী সংস্করণ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে, যা ১৯৮০-এর দশকে লেবার পার্টিকে দখল করতে চেয়েছিল।
পিটার ম্যান্ডেলসন ও জেফরি এপস্টাইন কেলেঙ্কারির জেরে পদচ্যুত হওয়া ডাউনিং স্ট্রিটের সাবেক চিফ অব স্টাফ ম্যাকসুইনি ছিলেন ‘লেবার টুগেদার’ গোষ্ঠীর নেতা। ম্যান্ডেলসন ছিলেন এর পৃষ্ঠপোষক; স্টারমার ছিলেন এর অজান্তের হাতিয়ার।
বছরের পর বছরের ক্ষতি পূরণ করা
লেবার টুগেদার একটি অসৎ প্রচারণার মাধ্যমে লেবার পার্টির নেতৃত্ব নির্বাচন জয় করে, যা দলের প্রধানত বামপন্থী সদস্যদের স্টারমারকে ভোট দিতে প্রতারিত করেছিল। নেতা হওয়ার পর, তিনি সেই প্রতিশ্রুতিগুলো ভঙ্গ করেন যা তাকে নেতৃত্ব এনে দিয়েছিল এবং লেবার পার্টির বামপন্থীদের ওপর হিংস্রভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েন, যার ফলে তাদের অনেকেই দল থেকে বিতাড়িত হন।
স্বল্প মেয়াদে, টোরি গণমাধ্যমের সমর্থনে পরিচালিত এই কৌশলটি স্টারমারকে তার বিপুল সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা এনে দিয়েছিল। কিন্তু এটি লেবার পার্টিকে বিভক্ত করে ফেলে, যার সরাসরি ফলস্বরূপ জ্যাক পোলানস্কির গ্রিন পার্টির উত্থান ঘটে।
এ কারণেই আজ লেবার পার্টির সমর্থন ভেঙে পড়েছে এবং স্টারমার ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত অজনপ্রিয়।
ব্রিটিশ রাজনীতির এখন একটি প্রধান প্রশ্ন হলো, বার্নহ্যাম ‘লেবার টুগেদার’-এর সৃষ্ট ক্ষতি পুষিয়ে দিয়ে লেবার পার্টিকে পুনরায় ঐক্যবদ্ধ করতে পারবেন কি না।
ইঙ্গিতগুলো মিশ্র। এমন গুঞ্জন রয়েছে যে, বার্নহ্যাম হয়তো সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড মিলিব্যান্ডকে নিউইয়র্কে তার আরামদায়ক নির্বাসন থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন। মিলিব্যান্ড বর্তমানে ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি থেকে বছরে প্রায় ১.২ মিলিয়ন ডলার আয় করা একটি দাতব্য সংস্থার উচ্চ বেতনভোগী প্রধান হিসেবে কর্মরত আছেন।
গাজায় হত্যাকাণ্ড চলতে থাকার সময়ে ব্লেয়ারের শিষ্য ডেভিড মিলিব্যান্ডকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হলে তা একটি ভুল বার্তা দেবে।
এটা উদ্বেগজনক যে, লেবার টুগেদার-এর সাবেক পরিচালক জশ সাইমন্স, যিনি সাংবাদিকদের ওপর গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে মন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন, তিনি মেকারফিল্ডে বার্নহ্যামের জন্য পথ করে দিয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত তার দলের অংশ হতে পারেন। তবে এটি আশাব্যঞ্জক যে, এমপি লুইস হাই, যিনি লেবার টুগেদার চক্রের অন্যতম বহুল আলোচিত শিকার বলে পরিচিত, তিনি বার্নহ্যামের সঙ্গে কাজ করছেন।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাবেক চিফ অব স্টাফ স্যু গ্রে, যিনি লেবার টুগেদারের শিকার হয়ে ডাউনিং স্ট্রিটের চাকরি থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন, তিনি বার্নহ্যামকে পরামর্শ দিচ্ছেন। সততার প্রতিমূর্তি হিসেবে তিনি পরিচিত।
নীতিগত বিষয়ে গোপনীয়তা বজায় রাখার জন্য বার্নহ্যাম সমালোচিত হয়েছেন। এটা বোধগম্য; তিনি একটি উপনির্বাচনে লড়ছেন, দেশ চালাচ্ছেন না। তিনি যদি ডাউনিং স্ট্রিটে পৌঁছান, তবে তিনি ব্রিটিশ রাজনীতিকে পরিশুদ্ধ করার, সামাজিক ন্যায়বিচারকে এগিয়ে নেওয়ার, ঘৃণার রাজনীতির বিরুদ্ধে লড়াই করার এবং স্টারমারের প্রত্যাখ্যাত কর্মসূচিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবেন।
যারা লেবার পার্টির টিকে থাকা, ব্রিটেনের সমৃদ্ধি এবং উগ্র ডানপন্থীদের দমন চান, তারা সবাই বার্নহ্যামের সাফল্যের জন্য আশা ও প্রার্থনা করবেন।
- পিটার ওবোর্ন: তার নতুন বই, ‘কমপ্লিসিট: ব্রিটেন’স রোল ইন দ্য ডেস্ট্রাকশন অব গাজা’, সম্প্রতি অর বুকস থেকে প্রকাশিত হয়েছে। সূত্র: মিডল ইস্ট আই

